01/10/2025
রসূল প্রেমের কবি: শায়খ মানযূর আহমাদ
- অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ুম (র.)
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ধর্মচিন্তা, ইত্তেফাক
চাঁদপুর জেলার ফরাযীকান্দি এক ঐতিহ্যবাহী জনপদ। শায়খ বোরহানুদ্দীন (র.) এর স্মৃতি বিজড়িত এই জনপদের কৃতী সন্তান শায়খ মানযূর আহমাদ (র.)। তিনি শুভ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর কলকাতায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সূচনাকালে বারুদের মুখে গন্ধ নিয়ে তাঁর শুভাগমন। পঞ্চাশের মনন্তর কালে তিনি শৈশবের দিনগুলো অতিবাহিত করেন। পিতা শায়খ বোরহানুদ্দীন (র.) ছিলেন একজন কামেল ও মুকাম্মেল পীর। তিনি ফুরফুরা সিলসিলাভুক্ত পীর প্রফেসর আব্দুল খালেক (র.) এর কাছ থেকে কাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া, মোজাদ্দেদিয়া ও মুহাম্মাদিয়া ত্বরীকায় খেলাফত লাভ করেন।
স্বভাবতই শায়খ মানযূর আহমাদ ইলমে তাসাউফের পরিবেশে বেড়ে উঠেন। তাঁর পিতার খানকাতে মুরিদগণের মধ্যে তালিম-তালকীন বিতরণের অভিজ্ঞতা তিনি কৈশোরেই অর্জন করেন। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের একনিষ্ঠ অনুসারী তিনি তখন থেকেই হয়ে উঠেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। প্রতিটি পরীক্ষায় তিনি ভালো রেজাল্ট করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতেন। ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালে বর্তমান লেখকের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত্-পরিচয় ঘটে। বর্তমান লেখকের ছোট ভাই মরহুম আবু সাঈদ মুহাম্মাদ আবদুল হান্নানও তখন আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র। সম্ভবত দু’জনে একই জামায়াতে পড়াশুনা করতেন। দু’জনের বেশভুষায় ফুরফুরা শরীফের আদর্শ পরিলক্ষিত হতো। শায়খ মানযূর আহমাদ পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স ও আইনে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ‘হযরত খাজা বাহাউদ্দীন নাকশবন্দ ও নাকশবন্দি ত্বরীকা’ শীর্ষক গবেষক ছিলেন।
তিনি ইলমে মারিফাতের সমস্ত স্তর অতিক্রম করে কামালিয়াত হাসিল করেন। পিতার কাছ থেকে কাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া, মোজাদ্দেদিয়া, মুহাম্মাদিয়া, উয়েসীয়া, সোহরাওয়ার্দিয়া, আহমাদীয়া ত্বরীকাগুলো ছাড়াও তিনি শাযুলিয়া, জাযুলিয়া, সাম্মানিয়া, তিজানীয়া, উসমানীয়া ও রিফাইয়া ত্বরীকার সনদ লাভ করেন। রিফাই ত্বরীকার বিশিষ্ট শায়খ, কুয়েতের সাবেক মন্ত্রী এবং বিশিষ্ট দানবীর হযরত ইউসুফ হাশেম রিফায়ী (র.) দাস্তে তিনি বায়াত হয়ে খেলাফত প্রাপ্ত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। দানবীর হযরত রেফায়ী (র.) বাংলাদেশে বিভিন্ন ইসলামি প্রতিষ্ঠানে প্রচুর আর্থিক অনুদান দিতেন। শায়খ মানযূর আহমাদের প্রতিষ্ঠান নেদায়ে ইসলামের কর্মকাণ্ডে মুগ্ধ হয়ে তিনি এই সেবা সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্যেও আর্থিক অনুদান দিয়েছিলেন।
ফুরফুরা শরীফের বড় হুজুর ক্বিবলা কাইয়ূমে জামান হযরত মাওলানা শাহ্ সুফি আবু নগর মুহাম্মাদ আবদুল হাই সিদ্দিকী (র.) কলকাতা থেকে নেদায়ে ইসলাম নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করেন। এই নেদায়ে ইসলাম নামের মাহাত্ম্যের প্রভাব দেখা যায় শায়খ মানযূর আহমাদের পিতা শায়খ বোরহানুদ্দীন (র.) প্রতিষ্ঠিত সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান নেদায়ে ইসলামের নামকরণে।
১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে ৯ই মে শায়খ বোরহানুদ্দীন (র.) ইন্তেকাল করেন। শায়খ মানযূর আহমাদ নেদায়ে ইসলামের চেয়ারম্যান হিসেবে এবং পিতার সাজ্জাদানসীন পীর সাহেব হিসেবে দায়িত্ব ভারপ্রাপ্ত হন। নেদায়ে ইসলামের দায়িত্ব ভার গ্রহণের পরপরই তিনি পিতার নামে ঢাকায় নাজিমুদ্দিন রোডে একটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই কলেজের নাম শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ। এই কলেজ ঢাকা মহানগরীর প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। এছাড়া নেদায়ে ইসলামের আওতায় গড়ে উঠেছে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইয়াতিমখানা, হিফযখানা, মসজিদ, যুবপ্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মহিলা মাদ্রাসা, পাঠাগার, বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র, কিন্টারগার্ডেন স্কুল, চিকিত্সাসেবা কেন্দ্র প্রভৃতি।
শায়খ মানযূর আহমাদ (র.) স্বরচিত ক্বাসীদাগুলোতে রসূলপ্রেমের এমন স্ফুরণ ঘটেছে যা রসূলপ্রেমিকদের অন্তরে প্রেমের জোয়ার ও স্পন্দন এনে দেয়। তিনি চাইতেন যেন তাঁর কবর মাদীনা মুনাওয়ারায় জান্নাতুল বাক্বীতে হয়। বাস্তবেও তাই ঘটলো। ২০১২ সালে তিনি হজ করতে যান এবং অক্টোবর মাসের ১ তারিখে মাদীনা মুনাওয়ারায় ইন্তেকাল করেন। জান্নাতুল বাক্বীতে তাকে কবরস্থ করা হয়।
লেখক: পীরসাহেব-দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা- ইনস্টিটিউট অফ হযরত মুহাম্মাদ (দ:) ও সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।