16/07/2026
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভাঙন শুরু হয় সৃজনশীল প্রশ্ন চালু হওয়ার সময় থেকেই। এরপর মূল ভাঙন আসে অটোপাশের ব্যাচ থেকে।
যখন থেকেই সৃজনশীল চালু হয়, স্টুডেন্টরা ফেইল করার কথা আস্তে আস্তে ভুলে যেতে শুরু করে। উদ্দীপক লিখে দিলেও নাকি পাশ হয়ে যায়। কথাটা আসলেও মিথ্যা না, প্রশ্ন সম্পর্কিত জ্ঞান ২ লাইন থাকলেও উদ্দীপক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আরও ১০ লাইন লিখে ফেলা যেতো। শিক্ষকরাও বাধ্য হয়ে মার্ক্স দিয়ে দিতো। কারণ, সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর ফিক্সড নয়, ঠিক কতটুকু লিখলে উত্তর সঠিক আর কতটুকু লিখলে ভুল— এমন কোনো পরিমাপক ছিলো না।
যদি প্রশ্ন কমন নাও পড়তো, তাও স্টুডেন্টরা খাতা ভর্তি লেখা দিতে পারতো। ইভেন সাইন্সের সাবজেক্টেও এই ধারা অব্যাহত ছিলো। হাইয়ার ম্যাথ, একাউন্টিং, ফাইন্যান্সে 'গ' না পারলে 'ঘ' পারা যেতো না, তবুও দেখেছি প্রশ্নে যা দেয়া আছে তা লিখে, পাশের জনের থেকে সূত্র দেখে অংক ভুল ভাবে করতে করতে লাস্টে আবার পাশের জনের উত্তর দেখে মান বসিয়ে দিতে।
সরকার যেহেতু নিরক্ষতার হার শুণ্যে নামিয়ে আনতে চায়, তাই শিক্ষা খাতে প্রচুর বাজেট ধরা হচ্ছিলো। কিন্ত পরিকল্পনা ফলপ্রসূ হচ্ছে বোঝাতে পাশের হারও ক্রমান্বয়ে বাড়াতে হতো— কিছুটা বাধ্য হয়েই বাড়ানো লাগতো। জিপিএ ফাইভের সংখ্যাও ভুরি ভুরি বাড়তে লাগলো। পুরো ঘটনাটা এমন যেনো— রঙিন, চকচকে, দামী কফিনে শিক্ষা ব্যবস্থার কবর রচনা।
অটোপাশ ছিলো বিগত সরকারের অন্যতম বড় ভুল। এক এক ব্যাচে ১২-১৪ লাখ স্টুডেন্টের সবাই পাশ! অথচ দেশের পাবলিক, প্রাইভেট, ন্যাশনাল, মেডিক্যাল, ডেন্টাল, কৃষি, সব মিলিয়ে ৮-৯ লাখের বেশী স্টুডেন্ট পড়ানোর সক্ষমতা নেই। ধারণ ক্ষমতার বেশি স্টুডেন্ট নিতে যেয়ে শিক্ষার কোয়ালিটি ড্রপ করে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলো যেহেতু টিউশন ফি নির্ভর, তারাও যত বেশি সম্ভব স্টুডেন্ট নেয়ার চেষ্টা করে। ফলে গুনগত শিক্ষা সরকারী বেসরকারী কোনো ইউনিভার্সিটি ই শতভাগ নিশ্চিত করতে পারেনি।
পরের বছর আবারো অটো পাশ, হাফ সিলেবাসে পাশ, সাবজেক্ট কমিয়ে এনে পাস। এই যে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী প্রোপার এসেসমেন্ট ছাড়া পাশ করে গেছে। যাদের এইচএসসিতে ফেইল করার কথা ছিলো তারাও ব্যাচেলর পড়ার সুযোগ পেয়েছে। তারাও গ্রাজুয়েট হয়েছে। এটার ইমপ্যাক্ট ৫-৭ বছর পর, অর্থাৎ ২০২০ সালের পর ২০২৬ সালে এসে সরাসরি জব মার্কেটে পড়েছে।
এমপ্লয়াররা দেখলো চাকুরির বিজ্ঞাপন দিলেই শ'য়ে শ'য়ে সিভি জমা পড়ে। লেবার সাপ্লাই বেশি হলে কাজের মূল্য কমে যায়; একটা কাজ ২০ হাজারে আপনি করতে রাজি না হলেও ১০ হাজারেই সেই কাজ করার মতো মানুষ অলরেডি মার্কেটে আছে। এমপ্লয়াররা দেখলো, এই দেশে সার্টিফিকেট আর জিপিএ ফাইভ শোপিসের মতোই। ৮-১০ হাজারেই সারা মাস খাটানোর মতো গ্রাজুয়েট লেবার পাওয়া যাচ্ছে। ইভেন, ফুল টাইম জব কে ইন্টার্নশিপ হিসেবে সার্কুলার দিয়েও খাটানোর মতো লেবার পাওয়া খুব ই সহজ। একজন এমপ্লয়ার এর পার্স্পেক্টিভে একজন ফ্রেশার যত স্কিল্ড ই হোক, সে ফ্রেশার।
অটো পাশ আর জিপিএ ফাইভ এভাবেই সাময়িক তৃপ্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ।
বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর সিদ্ধান্তগত ভুল আছে এটা সত্য। বেশি কঠোরতা দেখিয়ে ফেলেছেন, এটাও সত্য। তবে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরণের পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রতি ঘরে ঘরে বেকার গ্রাজুয়েট তৈরির কারখানা এবার বন্ধ হওয়া উচিত। এই দেশে সবাই শিক্ষিত, কিন্ত এমনভাবে শিক্ষিত যে শিক্ষার মূল্য তেমন একটা নাই।
আর যারা আন্দোলন করছো, ফ্রি মার্ক্স, অটোপাশ, এক্সাম হলে দেখে লেখার সুযোগ, কলেজ ভর্তি অটো পাশ— সব ই সম্ভব, সরকারকে চাপে রেখে বাধ্য করতেই পারো। কিন্ত, যে কঠিন বাস্তবতা তোমাদের ফেইস করতে হতে পারে, তার জন্য তোমরা প্রস্তুও নও।
আর হ্যাঁ, সরকার কিন্ত সবাইকে উচ্চশিক্ষা দিতে বাধ্য নয়। শিক্ষা মৌলিক অধিকার, উচ্চশিক্ষা কিন্ত নয়। আর, উচ্চশিক্ষার পর সরকার সবাইকে চাকুরি দিতেও বাধ্য নয়। দিনশেষে মনে হবে কোয়ালিটি ওভার কোয়ান্টিটিই খুব বেশি প্রয়োজন।
এখনো সময় আছে জিপিএ ফাইভের বাম্পার ফলন রোধ করতে হবে, নাহলে এই সার্টিফিকেট দিয়ে দেশে তো কিছু করা যাবে ই না, বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগও দিন দিন কমতে থাকবে।