17/08/2026
#প্রেমরুদ্ধ
পর্ব:১৩
লেখিকা: নিপা সরকার
[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ]
ইশায়াতের লোকজন ইনায়া আর নিরবকে নিয়ে জোরে গাড়ি চালাচ্ছে।ইনায়া আর নিরব গাড়ির ব্যাক সিটে বসে আছে। ইনায়া নিরবের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে।ভয়ে রীতিমতো মেয়েটার শরীর কাঁপছে।নিরব ইনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল _____
"রিলাক্স, আমাদের এক হওয়া থেকে আর কেউ আটকাতে পারবে না"
কাঁপা কাঁপা গলায় ইনায়া বলল____
"আ... আমার অনেক ভ...ভয় করছে নিরব"
"আর কোনো ভয় নেই আমিতো আছি"
"ড্যাড যদি জানতে পারে আমি বাড়িতে নেই তখন কী হবে"
"যা হওয়ার হবে আর ইশায়াত তো আছেই ও সব সামলে নিবে তুমি টেনশন করোনা"
হঠাৎ করেই ড্রাইভার একটা কাজী অফিসের সামনে গাড়িটা থামালো। তারপর গাড়ি থেকে নেমে ইনায়া আর নিরবকে নিয়ে ইশায়াতের লোকেরা কাজী অফিসের মধ্যে প্রবেশ করল।
আগে থেকেই সবকিছু ঠিক করা আছে এখন শুধু বিয়ে পড়ানো হবে।ইনায়া আর নিরবকে কাজী সাহেবের সামনে বসানো হলো।
কাজী সাহেব বিয়ে পড়াচ্ছেন____
মোঃ আমজাদ চৌধুরীর পুত্র নিরব চৌধুরীর সাথে ১০লক্ষ ১টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া মোঃ আশিক শেহজাদের কন্যা ইনায়া শেহজাদের বিবাহের প্রস্তাব দিলাম, রাজি থাকলে বলো মা আলহামদুলিল্লাহ কবুল।
ইনায়া চুপ করে বসে রয়েছে। কাজী সাহেব তিনবার বলার পর ইনায়া বলল____
আলহামদুলিল্লাহ কবুল, কবুল, কবুল।
একইভাবে নিরবকেউ বিয়ে পড়ানো হলো। কাজী একবার বলাতেই নিরব কবুল বলে দিয়েছে।আজ আগস্টের ১৬ তারিখ ইনায়া ও নিরবের বিয়ে সম্পন্ন হলো।
______________________________
এদিকে বিয়ের মন্ডপে কাজী সাহেব ইনায়াকে নিয়ে আসার জন্য বলছেন। মাহিরা বেগম ইনায়ার রুমে গিয়ে দেখলেন রুমে কেউ নেই। মাহিরা বেগম পুরো বাড়ি খুঁজে ইনায়াকে না পেয়ে বিয়ের মন্ডপে ফিরে আসলেন। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে আশিক শেহজাদকে বললেন পুরো বাড়ি খুঁজে দেখেছি তোমার মেয়ে কোথাও নেই। আশিক শেহজাদ চিৎকার দিয়ে বললেন_____
"ওয়াট, কী বলছো তুমি এসব"
"আমি ঠিকই বলছি।"
সবাই ইনায়াকে খুঁজতে ব্যস্ত এমন সময় আয়মান এসে বললো_____
"
বড় আব্বু আমি জানি ইনায়া আপু কোথায়।"
"জানলে বলো কোথায় ইনায়া"
মাথা নিচু করে বলল আয়মান____
"ইনায়া আপু অন্য একটা ছেলের সাথে পা... পালিয়ে গিয়েছে।"
"কিহ, আমার মেয়ে হয়ে এমন কাজ করতে পারল ইনায়া, তুমি ওকে আটকালে না কেন আয়মান।"
"আমি ছাদের উপর ছিলাম কারা যেন ইনায়া আপুকে গাড়ি করে নিয়ে চলে গেল। আমি নিচে যেতে যেতেই গাড়ি গুলো অনেক দূরে চলে গেল।"
এটুকু শুনেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল মাহিরা বেগম। ইশায়াত দৌড়ে গিয়ে মাহিরা বেগমকে কোলে তুলে নিলো। তারপর ড্রয়িং রুমে গিয়ে সোফার উপর শুইয়ে দিলো। সবাই মাহিরা বেগমকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ইশায়াত ডক্টরকে কল করল। ডক্টর এসে ট্রিটমেন্ট করার পর মাহিরা বেগম একটু সুস্থ হয়ে উঠলেন।
আশিক শেহজাদ সবার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলেন____
"ইনায়া কীভাবে পালালো "
আয়মান বলে উঠল____
"ইশায়াত ভাইয়া ইনায়া আপুকে হেল্প করেছে বড় আব্বু।
"ওয়াট...এসব কী শুনছি আমি ইশায়াত," ইশায়াতকে জিজ্ঞেস করলেন।
"হ্যাঁ, আমি হেল্প করেছি আমার মনে হয়েছে আমার বোন নিরবের সাথেই ভালো থাকবে।"
"ছিঃ ইশায়াত তুমি এমন একটা জঘন্য কাজ করবে তা আমি কখনোই ভাবিনি।এখন আমি ঈশান আর তার বাবাকে কি জবাব দিবো।"
সাইফ খান আশিক শেহজাদের কাছে এসে বললেন____
" আমাকে কিছু বলতে হবে না ভাই আমি জানি আপনি কেমন মানুষ, তবে আপনার মেয়ের থেকে আমি এমনটা আশা করিনি ভালো থাকবেন।" বলেই সাইফ খান তার ছেলে ঈশান ও লোকজনদের নিয়ে চলে গেলেন।সকল আত্মীয়-স্বজন ফিসফিস করছে আশিক শেহজাদের মেয়ে এমন কাজ করেছে। আশিক শেহজাদ সোফার উপর বসে কান্না করতে শুরু করলেন কান্না করতে করতে বললেন_____
"কোন ইচ্ছেটা অপূর্ণ রেখেছিলাম যে আমার ছেলে মেয়ে আমার মান সম্মান ধূলোয় মিশিয়ে দিলো।"
ইশায়াত এসে বাবার সামনে ফ্লোরে বসল। তারপর আশিক শেহজাদকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল____
"ইনায়া ওখানে ভালো থাকবে ড্যাড তুমি দেখো ," বলেই আশিক শেহজাদের হাত দুটো ধরতে গেল ইশায়াত।
কিন্তু আশিক শেহজাদ ইশায়াতের হাত দুটো ছুড়ে ফেলে দিয়ে উঠে দাড়িয়ে বললো_____
"আজ থেকে তুমি আমার ছেলে না। আর ইনায়াকে বলে দিও ওকেও আমি ত্যায্যকন্যা করলাম। আজ থেকে আমার একটাই মেয়ে আরিবা। শাহিদ শেহজাদ ও নিয়াজ শেহজাদ অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন আশিক শেহজাদকে । কিন্তু তিনি কারো কথা শুনলেন না। রাগান্বিত হয়ে বললেন _____
"আজ থেকে তুমি আর কখনো আমার সামনে আসবেনা ইশায়াত ।" বলেই আশিক শেহজাদ নিজের রুমে চলে গেলেন।
শাহিদ শেহজাদ ও নিয়াজ শেহজাদ মেহমানদেরকে বুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। বাড়ির ছোট বড় সবাই ড্রয়িং রুমে দাড়িয়ে রয়েছে। সুবহা মনে মনে ভাবছে_____
"আমিও তো ইনায়া আপুকে পালাতে হেল্প করেছি তাহলে আয়মান আমার নামটা কেন বড় আব্বুকে বলল না, হয়তো আয়মান আমাকে দেখতে পায়নি যাক আলহামদুলিল্লাহ।"
ইশায়াত ফ্লোর থেকে উঠে সোফায় বসল। দুই হাত থুতনি আর হাঁটুর সাথে লাগিয়ে রেখেছে।
বাড়ির সবাই নিস্তব্ধ কেউ কোনো কথা বলছে না। সবারই মনের অবস্থা খারাপ। এমন সময় ইশায়াতের ফোন বেজে উঠল......
ইশায়াত ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ইশায়াতের লোক বলল____
" স্যার আপনার বোন ও দুলাভাইকে বিয়ে করিয়ে হোটেলে পৌঁছে দিয়েছি।"
"ঠিক আছে খেয়াল রেখো কখন কী লাগে।"
"ওকে স্যার"
৩ দিন পর
তিন দিন হয়ে গেছে ইনায়ার পালিয়ে যাওয়া। শেহজাদ বাড়ি এখনো ওরকম নিরব স্তব্ধ। সবাই খুব কম কথা বলছে। সবার মুখে যেন এক আকাশ পরিমাণ কালো মেঘ জড়ো হয়ে আছে। না জানি কখন ঝড়ো বাতাসে এই মেঘ সরে স্বচ্ছ আকাশের দেখা মিলবে। ইশায়াত অনেকবার তার বাবা আশিক শেহজাদের সাথে কথা বলার ট্রাই করেছে । কিন্তু আশিক শেহজাদ ক্রমশ ইশায়াতকে ইগনোর করে চলেছে।
মাহিরা বেগম অবশ্য মনে মনে চাইতেন ইনায়া যাকে পছন্দ করে বিয়েটা যেন তার সাথেই হয়। তাই তিনি একরকম মেনেই নিয়েছেন সবটা।
অফিসে কাজের চাপ বেড়েছে । বিয়ের জন্য কিছুদিন ঠিকমতো অফিসের কাজ হ্যান্ডেল করতে পারেনি। তাই আজ সকালেই অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে ইশায়াত।
ইশায়াত অফিস শেষ করে বিকেলে রাফসান আর সাকিবের সাথে একটা রেস্টুরেন্টে মিট করতে গেল।
রাফসান আর সাকিব রেস্টুরেন্টের বাইরে ইশায়াতের জন্য ওয়েট করছে। ইশায়াতকে বাইক নিয়ে আসতে দেখে সাকিব বলল ব্রো চলে এসেছে। ইশায়াত বাইক থামিয়ে মাথার হেলমেট খুলে বাইক থেকে নামল। তারপর তিনজন হ্যান্ডসেক করে রেস্টুরেন্টের ভিতরে ঢুকল। তিনজন একটা টেবিলে বসল ইশায়াত জিজ্ঞেস করল_____
"কী খাবি তোরা বল।"
রাফসান বলল_____
"কিছু একটা অর্ডার দে।"
ইশায়াত তিনটা কোল্ড কফি ও তিনটা চাউমিন অর্ডার করলো।
কফি খেতে খেতে রাফসান জিজ্ঞেস করল_____
"বাড়ির অবস্থা এখন কেমন ইশায়াত??"
ইশায়াতের মুখটা ভীষণ গম্ভীর হয়ে আছে। যেন অজস্র কালো মেঘ ছেয়ে আছে। মাথা নিচু করে উত্তর দিলো_____
"বাড়ির কন্ডিশন ভালো না,সবার মন খারাপ আর ড্যাড তো আমার সাথে কথাই বলছে না।"
"তাহলে এখন কী করবি??"
"কি আর করব দেখি কবে সিচুয়েশন নরমাল হয়"
মাঝখানে হাত থেকে কফি রেখে সাকিব বলল_____
" আমার মনে হয় তুই একবার আঙ্কেলের সাথে কথা বলে দেখ , বুঝিয়ে বল সবটা।"
"ট্রাই করেছি অনেকবার, তোরা তো জানিস ড্যাড কেমন রাগি, আর দেখলি তো বিয়ের দিন কত রেগে গেছিলো"
"তা তো দেখলামই"
"বাট একটা চিন্তা আমার মাথায় ঘুরছে"
"কী চিন্তা??"
"ইনায়া বাইরের ছেলের সাথে পালিয়ে যাওয়াতে ড্যাড আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে আর সুবহাকে আমি বিয়ে করতে চাইলে তখন কী হবে !!"
সবটা শুনে রাফসান আর সাকিব একসাথে বলল____
"এটা কিন্তু ঠিক বলেছিস"
রাফসান জিজ্ঞেস করল_____
"তোর ফ্যামিলি মেনে না নিলে কি করবি ব্রো তুই কি সুবহাকে ভুলে যাবি"
"প্রশ্নই আসে না, পুরো পৃথিবীর সাথে লড়াই করে হলেও আমার সুবহাকেই চাই"
"কিন্তু সুবহাকে কবে বলবি যে তুই ওকে ভালোবাসিস!?"
"বলবো বলবো, সময় হলে সব বলবো আগে সুবহা একটু ম্যাচিউর হোক নাহলে এতো বড় ধাক্কা সামলাতে পারবে না , ওকেও তো আমার জন্য ফাইট করতে হবে"
"হুম তা ঠিক "
"এখন তোদের খবর কী বল??"
সাকিব চাউমিন খেতে খেতে বলল_____
"দারুণ প্রশ্ন করেছিস রাফসান তো একটা মেয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে মেয়েটা সুবহার সাথেই পড়ে"
"তাই নাকি দোস্ত "ইশায়াত রাফসানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
রাফসান একটু লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে বলল____
"হ্যাঁ,ব্রো মেয়েটা সুবহারই বেস্ট ফ্রেন্ড"
"তাই নাকি নাম কি??
"মেহেরিন শেখ"
"তা প্রেমটা কীভাবে হলো , হাসি হাসি মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করল ইশায়াত।
"শালা তুই তো মাঝে মাঝে সুবহার ওপর নজর রাখতে বলিস, আর ও তো সবসময় সুবহার সাথেই থাকে কখন যে আমার নজর ওর ওপর আটকে গেছে আমি নিজেও বুঝতে পারিনি।"
"ওহ আচ্ছা প্রেমে পড়েছো তুমি আর এখন দোষ আমার " এটা শুনে সবাই হা হা হিহি করে হাসতে শুরু করল।
"ব্রো যেভাবেই হোক আমার ওই মেয়েকে চাই"
"ঠিক আছে টেনশন করিস না আমি আছি"
"ওকে ব্রো"
ইশায়াত সাকিবের দিকে তাকিয়ে বললো_____
" আর তুই কবে খুঁজে পাবি তোর প্রেয়সীকে নাকি সিঙ্গেলই থেকে যাবি শালা" বলে হাসতে থাকে ইশায়াত।
সাকিব মুখটা একটু ছোট করে উত্তর দিলো_____
"তিন মাস পর আমি বিদেশ চলে যাব কোম্পানির কিছু কাজ আছে সেগুলো শেষ করে এসে বিয়ে করব।"
"ওওও শালা একদম ডিরেক্ট বিয়ে"বলেই ইশায়াত আর রাফসান হাসতে থাকে।
কিছুক্ষণ পর খাবার গুলো শেষ করে ইশায়াত বললো_____
" ঠিক আছে দোস্ত আবার অন্যদিন দেখা হবে"বলেই ইশায়াত টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ালো।
রাফসান আর সাকিব বলে উঠলো ____
"দাঁড়া আমরাও যাবো চল "
তারপর তিনজন একসাথে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে এসে মাঝরাস্তা পর্যন্ত একসাথে আসল। তারপর যে যার মতো বাড়ি চলে গেল।
চলবে
[ কেমন লেগেছে কমেন্ট করে জানাবেন। আপনাদের লাইক কমেন্ট আমাদের আগ্ৰহ বাড়ায় ]
#প্রেমরুদ্ধ