09/12/2024
একটি ছবি হাজারটি শব্দ
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মুহূর্ত আছে যা শব্দ বা ভাষণের মাধ্যমে নয়, বরং একটি ছবির অসাধারণ শক্তির মাধ্যমে সময় এবং ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করেছে। এই ছবিগুলি অপরিবর্তিত, নগ্ন ও অকৃত্রিম সত্যকে ধারণ করে এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠে যে তা প্রায়শই মানুষ-যোদ্ধা-নেতা যেখানে ব্যর্থ সেখানে সাফল্য অর্জন করে। ছবিগুলো মানবতার বিবেককে নাড়া দিয়ে অভাবনীয় দৃশ্যমান পরিবর্তন প্রতিষ্ঠা করে।
উদাহরণস্বরূপ, ১৯৬৩ সালের ১১ জুন ভিয়েতনামের সাইগনে মালকম ব্রাউন কর্তৃক ধারণ করা ভয়াবহ ছবিটির কথা ভাবুন। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী থিচ কুয়াং ডুকের আত্মাহুতির ঘটনা শুধু ডিয়েম শাসনের অধীনে ধর্মীয় স্বাধীনতার দমন বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ ছিল না, বরং এটি লেন্সের মাধ্যমে অমর হয়ে ওঠা একটি মুহূর্ত। এই ছবির আবেদন এতটাই জোরালো ছিল যে সারা বিশ্ব ভিয়েতনামীদের করুণ দুর্দশা ও জিয়েম সরকারের দুর্নীতি, অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে এবং নভেম্বরে জিয়েম রেজিমের চূড়ান্ত পতন ঘটে।
১৯৭২ সালের ৮ জুন ন্যাপাম বোমায় আহত উলঙ্গ ৯ বছর বয়সী ফান থি কিম ফুক নামের মেয়েটির প্রাণভয়ে “খুব গরম, খুব গরম” বলে ছুটতে থাকা ছবিটি নিক উতের ক্যামেরাবন্দী হওয়ার পর বিশ্বকে এতটাই হতবাক করে যে অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ভিয়েতনাম যুদ্ধের ইতি ঘটে।
সম্প্রতি, ২০১৫ সালে গ্রিক উপকূলে দুই বছরের শিশু আলান কুর্দির নিথর দেহের ছবি তুলে ধরেন নিলুফার দেমির। এই ছবিটি সিরিয়ান শরণার্থী সংকটের মানবিক মূল্য উন্মোচিত করেছিল। ছবিটি ইউরোপ এবং পশ্চিমা দেশগুলিতে আশ্রয় নীতির পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করেছিল এবং শরণার্থীদের প্রতি সেসব জাতির দায়িত্ব নিয়ে একটি বৈশ্বিক আলোচনা সৃষ্টি করেছিল। একইভাবে, ১৯৭৫ সালে বোস্টনের “ফায়ার এস্কেপ কলাপস” এর ছবিটি গোটা ব্রিটেনে ফায়ার এস্কেপ সুরক্ষা বিধি পুনর্গঠনে ভূমিকা রেখেছিল এবং অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করেছিল।
বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাসেও কিছু ছবি জনমত গঠনে এবং দমনমূলক শক্তির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। একটি ভাষণ যেমন করে একজন নেতাকে তৈরি করতে পারে এবং তাকে ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারে, তেমন করেই ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় একটি বিলাসবহুল খাবার টেবিলের ছবি তাকে “মধ্যযুগীয় বর্বর” (গওহর রিজভীর ভাষায়) বলে চিহ্নিত করতে পারে।
একইভাবে ১৯৮৭ সালে ‘পল্লীবন্ধু’ খ্যাত রাষ্ট্রপতিকে নগ্ন শরীরে স্লোগান- “স্বৈরাচার নিপাত যাক” লিখে রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো নূর হোসেনদের ছবিগুলো এক লহমায় ‘স্বৈরাচার’ উপাধি উপহার দিয়েছে এবং টেনে ধরাধামে ধূলিসাৎ করেছে। আশ্চর্য এই ছবির ক্ষমতা। সেই ক্ষমতা এমন যে জুলাই’ ২৪ অভ্যুত্থানে সাঈদ নামক অজপাড়াগাঁয়ের এক তরুণ সমগ্র বাংলার রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল—“বুকের ভিতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।” মুগ্ধের ‘পানি লাগবে পানি?’ নামক ছবি সম্ভবত সকল বিবেকবানের চোখে নোনা পানির বহর বইয়ে দিয়েছে। কথিত উন্নয়নের আইকন ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে ফ্যাসিস্টের কুমিরের কান্নার ছবি একদিকে যেমন তার দোসরদের গর্ত থেকে বের করে জাতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে ফ্যাসিস্টবিরোধীদের প্রতিশোধস্পৃহা শতগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় কতিপয় উগ্রবাদীদের প্রোপাগাণ্ডা কিংবা দেশি-বিদেশি নানান চক্রান্তে কিছু সংখ্যক বৈষম্যবিরোধীদের মনোবলে হয়তো কিছুটা ফাটল ধরাতে পেরেছে, কিন্তু একটি সুযোগ্য নেতৃত্ব সেই ফাটল সীসা ঢালাই হয়ে অযুতগুণে শক্তিশালী করে তুলেছে। কোনো মানুষের প্রয়োজন নেই, নেই কোন শব্দ প্রয়োগ, ছবিই সব না কথাগুলো বলে দিচ্ছে—“ইনকিলাব জিন্দাবাদ!”-বিপ্লব চিরজীবী হোক।