14/06/2025
আবুল হোসেন স্যার ; এক প্রষ্ফুটিত গোলাপের চির বিদায়
৫ জুন ২০২৫, জামালপুর।
আধার কেটেছে মাত্র। সকাল বেলা। জাতীয় পাখি দোয়েলের মিষ্টি কোলাহল তখনও থামেনি । রাস্তা দিয়ে মানুষের আনাগোনা নেই । দু'একটা রিকসায় টুন টান ক্রিং ক্রিং আওয়াজ সবে শুরু। একটু পরেই কোলাহল বেড়ে যাবে, শুরু হবে মানুষের মিছিল, ব্যস্ত হবে গোটা বসুন্ধরা....
গত রাত ছিল আনন্দ, আর কেনাকাটার রাত
। সবার জন্য? না, মোটেই না। জামালপুরের প্রাণকেন্দ্র কথাকলি মাকেট উপচে পড়া ভীড়। কেনাকাটায় ব্যস্ত অনেকেই। ছেলেকে সাথে নিয়ে বাবা গো-হাটে রওয়ানা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা বেলায় লাল টুকটুকে গরু কিনে হাসি মুখে ফিরছে বাসায়। পথিক দল মজা করে বলছে, ভাই দাম কত? কত পড়লো, কত দিয়ে কিনলেন - নানাভাবে জানার ইচ্ছে মনের কোণে আনন্দ নিয়ে। কচিকাঁচা, ফুটফুটে শিশুর দল মায়ের আচল আর বাবার হাত ধরে কেনাকাটা করছে। রেশমি
চুড়ি, ক্লিপ, বেন, রঙিন চশমা আরও কত কী!
মাঝে বুঝতেই পারছেন কাল ' ঈদ'। ঈদুল আজহা। ছেলেমেয়েরা, মুরুব্বিরা বলে বড় ঈদ। কেউ বলে কুরবানির ঈদ। যেটাই বলি না কেন? ঈদ মানে আনন্দ, খুশি, মজা। কারো কাছে ঈদ মানেই নতুন জামা। বাহ, কী চমৎকার আইডিয়া, তাই না! হ্যা তাই।
৪ তারিখ দিবাগত রাত
একমাত্র আদুরে মেয়ে আনিকাকে বুকে আগলে রেখে স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে বলছে, মা আনিকা আজকের রাত শেষে কালকের দিন। তার পরের দিন কী বলতো? এক গাল হাসি দিয়ে আনিকা বলে, বাহ, ঈদের দিন, কুরবানির দিন, মজার দিন। আমরা সবাই মিলে একসাথে ঘুরবো, খেলবো। বাবা, তুমি আমাকে গোলাপি জামা কিনে দেবে। আর শোন, একটা মেহেদি লাগবেই। ঠিক আছে মা মনি, ঠিক আছে । সব হবে ইনশাআল্লাহ। বাবা থেমে গেলেন। আম্মু ডাকছে এখন যাই- নাবা? বাবা মৃদুস্বরে- আচ্ছা, আচ্ছা..... যা ছিল জীবন সায়াহ্নে আনিকার সাথে বাবার শেষ আলাপন।
শরীরটা হয়তোবা তখন থেকেই খারাপ লাগছিলো, মালুম করেনি। কারণ মনোবল ছিল শক্ত। তাই, বলেনি। ডায়াবেটিস হালত তার জানা ছিল না। ভাবনা ছিল, বিশ্রাম নিলেই হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। সারাদিনের ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিলেন।
রাত পেরিয়ে সকাল হলো। পশুপাখি, গাছপালা সবাই জেগে গেছে। দোয়েল খুব ভোর থেকেই ডাকাডাকি করছে। নেচে নেচে এডাল থেকে ও ডালে, এখান থেকে সেখানে। দুনিয়ায় মানুষ বোঝার আগেই প্রকৃতিপ্রেমী দোয়েল হয়তো বোঝে ফেলেছে। সবার আনাগোনা বেড়ে গেলেও দোয়েল প্রেমিক আবুল হোসেনকে দেখা যাচ্ছে না, তাই এতো ডাকাডাকি!!
হ্যা, তাই। দোয়েল বন্ধু টের পেয়েছে। অনেকে এসে ডাকলো, ঘুম ভাংলো না। একমাত্র মেয়ে আনিকা ডাকলো.. বাবা, সকাল হয়েছে, উঠো। বেলা উঠে গেছে নামাজ পড়বে না? তুমি না প্রতিদিন মসজিদে যাও- আজ গেলে না? বাবা ওঠে না। মা, বাবা ওঠে না কেন? মেয়ের গলা ধরে মা'র কান্না.....ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন। মানে বাবা আর নেই!
সকালে নামাজ পড়ে দিনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। লাইটহাউস স্কুলের আশির্বাদ আব্দুল কদ্দুস স্যার( প্রিন্সিপাল) ভাংগা কন্ঠে বললেন, স্যার খবর শুনছেন? কি খবর? আমাদের আবুল হোসেন স্যার মারা গেছেন। ফোন রেখে দিলাম। নিশ্চিত হলাম। সংবাদ ঠিক। মাথার উপর দিয়ে যেনো ১২০ কি মি বেগে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেল। আহ হা! আল্লাহ ভালো মানুষগুলোকে এভাবে বেছে বেছে দুনিয়া থেকে নিয়ে যাচ্ছে। হৃদয় থেকে আবেগ ধরে রাখতে পারলাম না। কয়েক ফোঁটা নোনা জল বিড়বিড় করে বেরিয়ে আসলো। ওগো আরশের মালিক -
বলছি তিনি ভালো ছিলেন
তোমার কাছে টেনে নাও
ছোটো খাটো গুনাহ খাতা
ক্ষমা সবি করে দাও।
সহজ করো হিসাব নিকাশ
করব করো দীপ্তিময়
দোয়েল কোয়েল পাখির মতো
উড়াও তাকে জগৎময়।
(চলবে)