19/05/2026
সুরা আল ফাতিহাকে যদি আমরা কুরআনের ভূমিকা হিশেবে ধরি, তাহলে কুরআনের মূল কনটেক্সট শুরু হয় মূলত সুরা আল বাকারাহ থেকে।
সুরা আল বাকারার একেবারে শুরুটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা করেছেন সফলতা আর ব্যর্থতার উদাহরণ দিয়ে। কারা সফল এটা জানাতে গিয়ে তিন নাম্বার আয়াতেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলছেন—
‘যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, সালাত প্রতিষ্ঠা করে এবং আমার দেওয়া রিযিক থেকে খরচ করে।’
অদৃশ্যে বিশ্বাস মানে তো সহজেই বোঝা যায়—আল্লাহ, ফেরেশতা, আখিরাত, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদিতে বিশ্বাস স্থাপন। সালাত প্রতিষ্ঠা করাও সহজে বোধগম্য। কুরআনে অসংখ্য অসংখ্যবার এই শব্দটার পুনরাবৃত্তি আছে৷ কিন্তু, আমার সবসময় একটা কৌতূহল ছিল আয়াতের শেষের অংশটি নিয়ে। আল্লাহ কেন বললেন যে—‘আমার দেওয়া রিযিক থেকে খরচ করে?’ তিনি তো বলতে পারতেন ‘যারা যাকাত দেয়’, অথবা ’যারা দান সাদাকা করে’, কিংবা ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে।’
এইসব না বলে, তিনি কেন বললেন যে—‘যারা আমার দেওয়া রিযিক থেকে খরচ করে?’
এখানে একটা অসাধারণ ব্যাপার আছে বোঝার মতো।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই আয়াতে সেই সকল বিশ্বাসী মানুষদের প্রশংসা করছেন এবং সফলকাম বলে উল্লেখ করছেন যারা খরচ করে। এই খরচটা কি কেবলই দান সাদাকা যেভাবে আমরা গরিব অসহায়দের দান করে থাকি? এটা কি কেবলই যাকাত যেটা সাধারণত রামাদান মাস এলে আমরা পরিশোধ করে থাকি?
একদম তা নয়৷ এটা তারচেয়েও বেশি কিছু। আমি যতগুলো ক্ল্যাসিক্যাল তাফসির পড়েছি, প্রায় সকল তাফসিরেই আমি দেখেছি, আয়াতের এই অংশে ‘খরচ করা’ বলতে সকল তাফসিরকারক যাকাত দেওয়া, সাধারণ দান সাদাকা করার পাশাপাশি খুবই জোরালোভাবে উল্লেখ করেছেন নিজ পরিবারের সদস্যদের জন্য খরচ করার ব্যাপারটি।
অর্থাৎ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যখন ‘যারা আমার দেওয়া রিযিক হতে খরচ করে’ বলছেন, এই খরচ করার মানে কেবল দান করা, যাকাত দেওয়ার মাঝে সীমাবদ্ধ নয়৷ নিজের বাবা-মা’র জন্য, স্ত্রীর জন্য, সন্তানদের জন্য, ভাই-বোনদের জন্য যে খরচাগুলো একজন সাধারণ মানুষ করে থাকেন জীবনে, সেই খরচটাও এখানে অন্তর্ভুক্ত।
আমি কিছু মানুষকে চিনি যাদের আয় উপার্জন খুব বেশি নয়৷ পরিবারের জন্য খরচ করার পরে তাদের হাতে কোনোরকম বাড়তি টাকা অবশিষ্ট থাকে না দান সাদাকা করার মতো। এমনকি, রাস্তাঘাটে একজন সাধারণ ভিক্ষুককেও ১০/২০ টাকা দিতে তাদের অনেক হিশেবনিকেষ করতে হয়।
তারা হয়তো এক ধরণের আত্মপীড়ায় ভুগেন৷ হয়তো ভাবেন, ‘চারপাশে কতো মানুষ কতো কতো সাদাকা করে, অথচ আমি কিছুই করতে পারি না।’
এধরণের মর্মপীড়ায় পীড়িত বিশ্বাসী মানুষদের জন্য এই আয়াতে রয়েছে দারুন সু-সংবাদ। অন্যদের মতো দুহাত ভরে দান সাদাকা করতে না পারলেও কোনো অসুবিধা নেই।
বাবা-মা’র দেখভালের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন?
সঠিকভাবে স্ত্রী, সন্তানদের ভরণপোষণ সামলাচ্ছেন?
ভাই-বোনদের জন্যেও খরচা করছেন সাধ্যমতো?
যথেষ্ট!
এসব সামলিয়ে যদি কূলোতে না পারেন, যদি সাধারণ দান সাদাকা করার মতো আপনার সামনে আর সুযোগ না থাকে, তাহলে দুঃখ নেই৷ কারণ, যারা হালাল উপার্জন থেকে নিজের ঘরের, বাবা-মা’র, স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ বহন করে, তাদের জন্য খরচ করে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইতোমধ্যেই তাদের জন্য সু-সংবাদ জানিয়ে রেখেছেন৷ তা-ও কোথায় সেই সু-সংবাদ জানেন? কুরআনের একেবারে শুরুতে। প্রথম তিন আয়াতের একটিতে।
তার মানে এই না যে, টাকাপয়সা থাকলে সাধারণ দান সাদাকা থেকে হাত গুটিয়ে রাখতে হবে৷ তা তো কোনোভাবেই করা যাবে না। এখানে বরং তাদের কথাই আলোচ্য যারা সীমিত উপার্জন দিয়ে কেবল নিজের আপন মানুষগুলোর ভরণপোষণ সামলান।
নিঃসন্দেহে, এইটাই তো সবচেয়ে বড় সাদাকাহ 💚