22/09/2026
গত শুক্রবার রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামনগর মসজিদগলি এলাকায় চুয়াডাঙ্গার ছেলে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমুলকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার পর থেকেই ঘটনাটি নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে।
শুরুতে আমি শুনেছিলাম, আজমুল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পরে সহকর্মী সিনিয়র ভিডিও জার্নালিস্ট মিলন ভাই ওইদিন সকালেই টেক্সট করে জানান, আজমুল নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ছাত্র।
এরপর হত্যার কারণ হিসেবে একে একে তিনটি বিষয় সামনে আসে-খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খান জাহান আলী হলে গিয়ে চুরি, ইসলামনগরের ওই মেসে টাকা-পয়সা চুরি এবং মেসে মিল না দিয়েই ভাত খাওয়া। সংবাদ মাধ্যম গুলো শুরুতে এই তিনটা কারণের একটা উল্লেখ করে প্রচার করছিল, শনিবার দিনের মাঝামাঝি সময়ে এসে না বলে ভাত খাওয়ার বিষয়টি উপরে উঠে আসে।
এখানেই খটকা লাগে।
রবিবার সমকালে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনের একটি অংশে চোখ আটকে যায়। আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দীন সেখানে এমন একটি তথ্য দিয়েছেন, যা পুরো ঘটনাটাকেই নতুন করে দেখার সুযোগ তৈরি করে। বিষয়টি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভুয়া ভর্তি নিয়ে।
আমি পরে কুতুব উদ্দীনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করি। তাঁর কাছ থেকে একই ধরনের তথ্য সহ অতিরিক্ত বেশ কিছু জানতে পারি।
কুতুব উদ্দীন জানান, ২০২৪ সালে চুয়াডাঙ্গা থেকে এইচএসসি পাস করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিং করতে আজমুল ঢাকায় যায়। পরে খুলনায় আসে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েও কোথাও সুযোগ পায়নি।
এরপর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের ওই মেসে মেহেদী নামে একজনের সাথে তার পরিচয় হয়। ওই মেসের ম্যানেজার। সেখানে উঠে পড়ে আজমুল।
আজমুলের বাবা বলেন, মেহেদী তার ছেলেকে জানিয়েছিল, চার বছর পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাল সার্টিফিকেট দেওয়া হবে। এ নিয়ে এক লাখ ২০ হাজার টাকার চুক্তিও হয়।
কুতুব উদ্দীনের ভাষ্য, ছেলে আজমুল ফোন করে তাকে জানায়, সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। ছেলের কথা বিশ্বাস করে তিনি ভর্তির টাকা দেন।
চুয়াডাঙ্গার একজন সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তার সহায়তায় এক বছর পর হঠাৎ জানতে পারেন, আজমুল আসলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়নি। অনেক চাপাচাপির পর আজমুলও বিষয়টি স্বীকার করে এবং বিদেশে চলে যাওয়ার কথা বলে IELTS করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। ছেলেকে বুঝিয়ে শুনিয়ে গত ১০ই সেপ্টেম্বর খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করা হয়। বাবা কুতুব উদ্দিনই ভর্তি করে দিয়ে আসেন।
কুতুব উদ্দীন আরও বলেন, নর্থ ওয়েস্টার্নে ভর্তির বিষয়টি মেহেদী জানতে পারে। প্রতারণার টাকা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় পড়ে সে। আজমুল গত বৃহস্পতিবার বাড়িতে এসেছিল। ওই দিন দুপুর ১২টার দিকে মেহেদী ফোন করে তার কাছে ৫৮ হাজার টাকা চায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় বাবদ। আজমুল বলে , তার কাছে ২৩ হাজার টাকা আছে। তখন ওই টাকা মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে পাঠিয়ে তাকে দ্রুত খুলনায় ফিরে আসতে বলা হয়। আজমুল সেই কাজই করে। জানা গেছে, মেহেদী আজমুলকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নকল আইডি কার্ড বানিয়ে দেয়। যে আইডি কার্ডটি এখন পুলিশের হাতে।
আজমুলের বাবা দাবি করেন, মেহেদীই তাকে চুয়াডাঙ্গা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। ভর্তি জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ। আজমুলকে যখন পিটানো হচ্ছিল তখন তার ফোন থেকে মেহেদি কথা বলে বাবা কুতুব উদ্দিনের সাথে। তাকে এক লাখ টাকা নিয়ে দ্রুত খুলনায় যেতে বলা হয়। আজমুলের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ঘটনার সময় মেস ম্যানেজার মেহেদী নিয়ে নেয়। পরে সেটি পুলিশ জব্দ করেছে। কুতুবউদ্দিন বলেছেন, ফোন থেকে সম্ভবত আলামত মুছে দিয়েছে ওই মেহেদী।
আজমুলকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় শনিবার রাতে নগরীর হরিণটানা থানায় মামলা করেন তার বাবা কুতুব উদ্দীন। মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। দুই দিন পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
মামলায় নাম রয়েছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফএমআরটি ডিসিপ্লিনের ১৭ ও ১৯ ব্যাচের রবিন ও মবিন, গণিত ডিসিপ্লিনের ১৯ ব্যাচের সাগর এবং এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের ২৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী ওবায়দুলের। ওবায়দুল ছাড়া বাকিরা সাবেক শিক্ষার্থী।
রোববার সন্ধ্যায় আজমুলের বাবা দাবি করেন, হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেসের ম্যানেজার মেহেদী। তবে মামলার এজাহারে মেহেদীর নাম নেই।
এদিকে আজমুল হত্যার বিচার ও জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আজ সোমবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খুলনায় সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে বলে জানা গেছে।
এসব বিষয়গুলো শুরু থেকেই তদন্ত হওয়া উচিত, আজমুলকে কেন শুক্রবার বিকেলের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা থেকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল? একটা পরিবারের সাথে এক বছরেরও বেশি সময় প্রতারণা করা, টাকা পয়সা হাতানো, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি জালিয়াতির মত কাজে সম্পৃক্ততার অভিযোগ যে মেহেদীর বিরুদ্ধে, সে কিভাবে পার পেয়ে গেল? এজাহারে মেসের ম্যানেজার মেহেদীর নাম কেন নেই? আমি আজমুলের বাবার কাছে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এতসব অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, মামলায় কেন সেই মেহেদির নাম দিলেন না? তিনি বলেছেন, ছেলে মারা যাওয়ার পর, ছোট ছেলের কাছ থেকে গতকাল রবিবার দুপুরের পর ওই ছেলের বিষয়ে সব কিছু জানতে পেরেছি। হাউ মাউ করে কেঁদে উঠে বললেন, ওরা কয়েকজন সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে আমার ছেলেকে মেরেছে - এর যেন সুষ্ঠু বিচার হয়, দেখবেন ভাই। -
ফাইজার চৌধুরী, চুয়াডাঙ্গা, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সোমবার।
#আজমুল
মেহেদীকে পুলিশ কেন এখনো গ্রে/প্তার করছে না? পালিয়ে যাবার পরে করবে?