07/05/2026
( লেখাটা আমার ফিন্যান্সের বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে)
"ক্যাডার হলে রাশমিকা, না হলে?"....
বিসিএস ক্যাডার — স্বপ্নটা সত্যিই খুবই লোভনীয়।
বিসিএস ক্যাডার মানে আপনি হঠাৎ হয়ে গেলেন ব্রিটিশ বনেদি সাদা চামড়ার কুলীন, আর বাকি সবাই নিচু জাত, মাইনর। বিসিএস ক্যাডারের বিয়ের বাজারেও সেই demand। চেহারা যাই হোক — সাদা, ধলা, কালা! কোনো সমস্যা নেই। ভুঁড়িটা হয়তো মাটির টানে নিম্নগামী, তবুও সমস্যা নেই। বিয়ের বাজারে minimum requirement ক্যাটরিনা কাইফ, অবশ্য মন চায় রাশমিকা।
আমার বিভাগের এক ছাত্র পুলিশ ক্যাডার। তার প্রতি শিক্ষকদের যে প্রেম, সেটা আমাকে মুগ্ধ করে। অথচ যে ছাত্রটি আমাদের বিভাগ থেকে পাশ করে কোনো বিদেশি ডিগ্রি ছাড়াই আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে fully funded পিএইচডি করছে, তার প্রতি সেই উচ্ছ্বাস অনুপস্থিত। কারণটা সহজ — বিপদে পড়লে ঐ পুলিশকে লাগবে। পিএইচডি-ওয়ালা ছাত্রের পিএইচডি দিয়ে কি মুড়ি ভিজিয়ে খাবে!
কিন্তু বিষয়টা হচ্ছে, যে বিসিএস ক্যাডার হয়ে গেল, সে তো হয়েই গেল — পুলসিরাত পার। যারা পার হতে পারল না, তাদের জীবনটা কেমন?
তাদের জীবন সত্যিই নিদারুণ কষ্টের। কারণ এই প্রস্তুতিটা ভীষণ কষ্টের। চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ হয় ছয় বছরে। তারপর আবার মিনিমাম চার বছর শুধু বিসিএসের জন্য পড়াশোনা। সারা জীবনে যা পড়া হয়েছে, সবকিছু নতুন করে recap করতে হয়। ণত্ব বিধান, ষত্ব বিধান থেকে শুরু করে লসাগু-গসাগু — কী নেই তাতে। তারপরও একদিন দেখা গেল সংখ্যাটা মেলেনি। প্রিলি পাশ, রিটেন পাশ, ভাইভাতে আটকে গেছে। অথবা ভাইভাও পাশ, কিন্তু ক্যাডার আসেনি।
সেই মানুষটা তখন কোথায় দাঁড়িয়ে?
বয়স ত্রিশ ছুঁয়েছে। সরকারি চাকরির বয়সসীমা পেরিয়ে গেছে নিঃশব্দে। বেসরকারি কোম্পানি জিজ্ঞেস করছে — "আপনি এত বছর কী করলেন?" উত্তরটা মুখে আটকে যায়। পরিবার সান্ত্বনা দেয়, কিন্তু চোখের ভাষা আলাদা কথা বলে- You are a looser!
অথচ এই মানুষটা কম মেধাবী ছিল না। শুধু একটা নির্দিষ্ট পরীক্ষার ছাঁচে নিজেকে ঢালাই করতে পারেনি। জীবনটা তাই আর এগোয়নি — আটকে গেছে একটা না-পাওয়ার গল্পে।
বিসিএস স্বপ্ন দেখতে বারণ নেই। কিন্তু শুধু এক দরজার দিকে তাকিয়ে থাকলে, পাশের খোলা জানালাগুলো চোখেই পড়ে না।
ব্যাংক অনেকের কাছে second choice — এটা সত্যি। বিসিএসের মতো এখানে একটাই দরজা নয়। প্রতিযোগিতা আছে, চাপ আছে — কিন্তু সুযোগও একটা নয়। সরকারি, বেসরকারি, সুদি, বেসুদি — তাই বিকল্প ও market size মন্দ নয়।
স্বপ্ন ভাঙার বেদনাটাও একটু কম তীক্ষ্ণ। বিসিএসে না হলে মনে হয় পুরো পৃথিবীটা বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যাংকে না হলে মনে হয় — "ঠিক আছে, দেখা যাক।" স্বপ্ন আর প্রাপ্তির মাঝের ফাঁকটা এখানে একটু কম নিষ্ঠুর। মানুষ সামলে নিতে পারে।
তবে এই দুটোর বাইরেও কিছু পথ আছে। এক্ষেত্রে আমার নিজের naive মতামত দিচ্ছি -
একটা হলো GMAT বা GRE-র প্রস্তুতি নেওয়া। বিসিএস প্রেপের চেয়ে কম সাধনা, কিন্তু ফজিলত অনেক বেশি। এখানে একটা স্থায়ী self-development হয়, আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। ইন্টারভিউ বোর্ডে দুটো ভারী ইংরেজি শব্দ জুড়ে দিলেই কেল্লা ফতে।
"কালো মুখে সাদা চামড়ার" ভাষা শুনলে সবাই ভাবে — ওরে বাবা, ছেলের তো সেই জ্ঞান! তোমাকেই তো আমরা হারিকেন দিয়ে খুজছিলাম বাবা! তুমি জয়েন করো।
দ্বিতীয় ফজিলত — বাইরের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম খরচে একটা ডিগ্রি নিয়ে ফিরে আসতে পারলে বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো বেতনে চাকরি সহজেই হয়ে যায়। তাই আমার কাছে এটাকে মনে হয় একটা safe bet। এক টিকিটে দুই ছবি
আরেকটা পথ হলো আইটি — এক্ষেত্রে ফিন্যান্সের ছাত্রদের জন্য সবচেয়ে সহজ শুরু হলো Financial Reporting, SQL ও Power BI। তারপর Microsoft Fabric। Fabric-এর বাজার এখন দারুণ গরম — সবাই end-to-end সার্ভিস চায়। আশার কথা হলো এটা যেকোনো বয়সে, যেকোনো সময় শেখা সম্ভব। ভারী কোড জানার কোনো দরকার নেই।
আমেরিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে যারা এই আইটি কাজগুলো করছে, তাদের বড় একটা অংশ ভারতীয় — এবং তাদের বেশিরভাগেরই আইটি ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। নিয়োগকর্তারা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটের চেয়ে Microsoft, Google বা Amazon-এর সার্টিফিকেটকে অনেক বেশি দাম দেন। একটু YouTube ঘাঁটলেই ধারণা হয়ে যাবে।বিসিএসের জন্য আমরা যে পরিমাণ পরিশ্রম করি, তার অর্ধেক যদি আইটিতে দেওয়া যায় — দেশের বাইরে ভালো চাকরির সম্ভাবনা উজ্জ্বল।
তবে একটা কথা বলে রাখতে চাই,
কোনটা করলে চাকরি মিলবে, কোনটা করলে জীবনে সফল হওয়া যাবে — এটা আমি জানি না। সত্যি বলতে, আমরা কেউই জানি না।
কিন্তু তবুও অন্য বিকল্পগুলোর কথা একটুখানি ভেবে দেখতে দোষ কী?
আর সবশেষে আমার কাছে শুধু এটুকুই মনে হয় — জীবনের গন্তব্য আসলে অনেকটাই ঠিক করা থাকে। আমরা শুধু চেষ্টাটুকুই করতে পারি। তবে অন্তত যদি সেই চেষ্টাটা সঠিকভাবে করা যায় — তাহলে দিন শেষে এই আক্ষেপটা থাকবে না যে, আমি তো কখনো চেষ্টাই করলাম না। আমরা শুধু আমাদের চেষ্টাটাই করতে পারি ফলাফলটা না হয় প্রভুর হাতেই তুলে দেই।
সুফিরা বলেন — পথ হারানো মানে শেষ হয়ে যাওয়া নয়। পথ হারানো মানে নতুন পথ খোঁজার শুরু।বিসিএস যাদের হয়নি, ব্যাংক যাদের হয়নি — তারা পথ হারায়নি। তারা শুধু এখনো "তাদের" পথটা খুঁজে পায়নি।
তফাৎটা বিস্তর।
জুবায়ের আহমেদ সিমন স্যার
মে ২৫, ২০২৬
From USA