20/03/2017
ইবিতে প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন
স্টারমেইল টােয়েন্টিফোর ডটকম: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ফলিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদভূক্ত ‘এফ’ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। কতিপয় শিক্ষকের প্রভাব রক্ষার্থে এমন ঘটনাে ঘটছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এতে নতুন প্রশাসনের অধীনেও ফের শিক্ষকদের মধ্যে গ্রুপিং প্রকাশ্যে রূপনিতে যাচ্ছে।
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, ‘এফ’ ইউনিটের প্রশ্ন ফঁসের ঘটনা তদন্তে ভিসি প্রফেসর ড. হারুন উর রশিদ আসকারী গত ২৫ ডিসেম্বর ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন। এতে গণিত বিভাগের প্রফেসর ড. মোস্তফা কামালকে আহবায়ক এবং প্রক্টর প্রফেসর ড. মো মাহবুবর রহমান ও কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. আহসানুল আম্বিয়াকে সদস্য করা হয়।
তদন্ত কমিটি গঠনের শুরু থেকেই শিক্ষকদের মধ্যে নানা গুঞ্জন শুরু হয়। গণিত বিভাগের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাবেক প্রো-ভিসি প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিনের গ্রুপ করায় ওই বিভাগের প্রফেসর ও তদন্ত কমিটির আহবায়ক ড. মোস্তফা কামালের মধ্যে অর্ন্তদ্বন্দ্ব বিদ্যমান ছিল।
এদিকে অর্ন্তদ্বন্দ্ব কেন্দ্র করে মোস্তফা কামাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর প্রফেসর ড. মাহবুবর রহমান গ্রুপের হওয়ায় তদন্ত কমিটিতে থেকে যোগসাজস করে নুরুল ইসলামকে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
গত ৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩৩তম সিন্ডিকেট সভা ‘এফ’ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁসে জড়িতদের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এতে ওই ইউনিটের সমন্বয়কারী ও গণিত বিভাগের সভাপতি নুরুল ইসলামসহ ২কর্মচারীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয় এবং ওই ইউনিটভূক্ত অপর দুইসদস্যকে পরবর্তী ২ বছরের জন্য সকল ভর্তি কার্যক্রম থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়। এছাড়া ওই ইউনিটের ১০০শিক্ষার্থীর ভর্তি বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা কমিটির সিদ্ধান্তে গত ১৬ মার্চ পুন:ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
তবে যে তদন্ত রিপোর্টের আলোকে এ সিদ্ধান্ত দিয়েছে সিন্ডিকেট সে তদন্ত কমিটির আহবায়ক নিজেই সিন্ডিকেট সদস্য হওয়ায় বিচার কার্যের সাথেও সংযুক্ত ছিলেন। বিষয়টি নিয়েও শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে, যা এখনও চলমান রয়েছে।
এদিকে সিন্ডিকেটের এমন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক সমালোচনা লক্ষ্য করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ বিষয়টি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা জামাল সিন্ডিকেটের এমন সিদ্ধান্তকে অমানবিক ও ইমম্যাচিউরড বলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। এঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর প্রফেসর ড. মাহবুবর রহমান স্বীয় স্বার্থ সিদ্ধির জন্য কৌশলে ভিসিকে দিয়ে তাকে শোকজ করান এবং বিভিন্নভাবে চাপে রাখেন।
অন্যদিকে, ওই শিক্ষককে ফেসবুকে স্ট্যাটাসের মাধ্যমে তুমুলভাবে সমালোচনা করেন প্রক্টর প্রফেসর ড. মো মাহবুবর রহমানের একনিষ্ট সহকর্মী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জসীম উদ্দিন। কিন্তু, প্রক্টরের অনুসারী হওয়ায় তার ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এসব কর্মকাণ্ডে ক্যাম্পাস জুড়ে শিক্ষকদের মধ্যে কখনো প্রকাশ্যে আবার কখনো আড়ালে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হচ্ছে। এদিকে সকল দায়ভারের তীর প্রক্টর মাহবুব গ্রুপের দিকেই যাচ্ছে। কেননা, তিনি স্বীয় প্রভাবকে বিস্তর রাখতে জোর যার মুল্লুক তার নীতি গ্রহণ করে সামনে অগ্রসর হচ্ছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবীণ শিক্ষক জানান। তিনি আরও বলেন, বর্তমান ভিসি স্যারকে আমরা সবাই সহযোগিতা করতে চাই। কেননা, তিনি অত্যান্ত সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ। কিন্তু, তিনি যদি এভাবে প্রক্টরের কথা মতো সিদ্ধান্ত নিতেই থাকেন তবে একটা সময় তার সাথে থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না।
ওই ইউনিটের সদস্যরাও ফেসবুকে তাদের দুঃখের কথা শেয়ার করছেন। তাদের উপরে এমন শাস্তি তারা কোনভাবেই মেনে নিতে পারেন নি। ওই ইউনিটের সদস্য আলতাফ হোসেনও ফেসবুকে বিভিন্ন সমালোচনা করলেও প্রক্টর তাকে বিভিন্নভাবে চাপে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। আলতাফ ভিসি গ্রুপের হওয়ার পরেও প্রক্টর তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সুযোগ গ্রহণ করে চলেছেন বলে দাবি শিক্ষকদের।
এদিকে ‘এফ’ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি তদন্ত নিয়ে শিক্ষকরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। বর্তমান ভিসি প্রফেসর ড. হারুন উর রশিদ আসকারী দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে শিক্ষকদের এক কাতারে নিয়ে আসতে পারলেও কতিপয় শিক্ষকের কারণে তা ফের ভাঙন ধরতে শুরু করেছে। শিক্ষকদের মাঝে সম্পর্কের টানাপোড়েন, অন্তর্দ্বন্দ্ব, বিভেদ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।
এবিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক স্টারমেইল টােয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় এখন চলছে সাপলুডুর খেলা। একজন আরকেজনকে সাপের গালে ফেলতে তৎপর রয়েছে। বিশেষ করে এফ ইউনিটের প্রশ্নপত্রের উত্তর ফাঁসকে কাজে লাগিয়ে একটি গ্রুপ অপর একটি গ্রুপকে অব্যহত ভাবে চাপে রেখেছে। এভাবে চলতে থাকলে যে কোন সময় আবারও ক্যাম্পাসে আন্দোলনের দানা বাধতে পারে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ফলিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদভূক্ত ‘এফ’ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে।