15/08/2025
লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মতিনুর রহমান স্যারের সাথে ছাত্রশিবির নেতাদের অনভিপ্রেত ঘটনা ও প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে পর্যালোচনা
গত ১৩ আগস্ট বুধবার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের কয়েকজন দায়িত্বশীল ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য বেশ কয়েকটি বিভাগে যান। এরই ধারাবাহিকতায় তারা লোক প্রশাসন বিভাগেও যান। বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সেক্রেটারি ইউসুফ আলী ভাই এই সাক্ষাতে নেতৃত্ব দেন। বিভাগের সম্মানিত সভাপতি অধ্যাপক ডঃ ফখরুল ইসলাম স্যারের সঙ্গে কথা বলে নবীনদের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি চাইলে স্যার কয়েক মিনিটের জন্য অনুমতি দেন। এসময় নবীন শিক্ষার্থীদের ক্লাসে কোনো শিক্ষক ছিলেন না বা কাছাকাছি সময়ে কোনো শিক্ষকের ক্লাসের শিডিউল ছিল বলেও সভাপতি স্যার জানাননি।
সভাপতি স্যারের অনুমতি পেয়ে দায়িত্বশীলরা নবীনদের ক্লাসে গিয়ে নিজেদের পরিচয় দিয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে কথা শুরু করেন। কথা শুরুর ৩-৪ মিনিট হতেই বিভাগের অধ্যাপক ডঃ মতিনুর রহমান স্যার ক্লাসে প্রবেশ করেন। উনি ক্লাসে ঢুকেই রাগান্বিত স্বরে জিজ্ঞেস করেন, 'তোমরা কারা?' তখন একজন বলেন, 'স্যার, আমরা ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে এসেছি।' স্যার তখন রাগান্বিত হয়ে বললেন, 'তোমরা এখানে কেন? এটা তো এন্টারটেইনমেন্টের জায়গা না।'
তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের সেক্রেটারি ইউসুফ ভাই বারবার বলছিলেন, 'স্যার এখনই শেষ করছি।' স্যার তখনও রাগান্বিতভাবে 'বের হও, বের হও' বলতে থাকেন। তখন শিবিরের দায়িত্বশীলগণ বললেন 'স্যার চলে যাচ্ছি।' তখন স্যার রাগান্বিত হয়ে বললেন, 'গেট আউট'। স্যারের এই কথা শোনার পর শিবিরের দায়িত্বশীলগণ ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে আসেন। এসময় মতিন স্যার আবার দুই জনকে পেছন থেকে ডেকে দাঁড়াতে বলেন। তারা দাঁড়ালে জিজ্ঞেস করেন, ' তোমরা কার অনুমতি নিয়ে এখানে এসেছো?' তখন তারা বলেন, 'আমরা সভাপতি স্যারের অনুমতি নিয়ে এসেছি। স্যার তখনই সভাপতি স্যারকে কল দেন।
সভাপতি স্যার তার অফিস থেকে বের হয়ে ক্লাসের দিকে আসছিলেন, শিবিরের দায়িত্বশীলগণ সভাপতি স্যারের অফিসে যাচ্ছিলেন। এসময় মতিনুর রহমান স্যারও সম্ভবত অফিসের দিকেই যাচ্ছিলেন । মাঝখানে সবাই একত্রিত হন। তখন শিবির দায়িত্বশীলগণ খুবই নমনীয়ভাবে বলেন, 'স্যার,আমরা আপনার ছাত্র, সেই জায়গা থেকে সন্তান হিসেবে সুন্দর করে বললেই আমরা বের হয়ে যেতাম। তখন স্যার বারবার বলেন 'তোমরা ক্লাসে কেন গেলে? কার অনুমতি নিয়েছো?' তখন শিবিরের দায়িত্বশীলগণ বলেন, 'স্যার আমরা সভাপতি স্যারের অনুমতি নিয়ে গিয়েছি।' তখন মতিন স্যার বলেন, 'আমার ক্লাসে সভাপতি অনুমতি দেওয়ার কে?' তখন সভাপতি স্যারও বারবার বলছিলেন 'স্যার আমার ভুল হয়ে গেছে। আপনাকে আগে জানানো দরকার ছিল।' তখন শিবিরের কেউ একজন বলেন, 'স্যার আমরা যতটুকু জানি, সকল শিক্ষকগণ সভাপতি স্যারের অধীনে থাকেন, আর সভাপতি স্যার বিভাগের সবকিছু দেখাশোনা করেন।' মতিন স্যার তখন রেগে গিয়ে বলেন, 'সভাপতি কেন আমি ভাইস চ্যান্সেলরেরও অধীনে না।' এসময় আরও বেশকিছু কথাবার্তা হয়।
সেখানে মতিনুর রহমান স্যার ছাত্রদলের নেতাদের ফোন দেন। শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতিও ওই ভবনে আসেন। শিবির সভাপতি উপস্থিত হয়ে স্যারের সাথে সালাম বিনিময় করে স্যারের রুমে যান। কিছু সময়ের মধ্যে ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কও আসেন। পরে সম্মানিত প্রক্টর স্যার, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ডঃ রোকসানা মিলি ম্যাডাম ও বিভাগের সভাপতি স্যারের উপস্থিতিতে মতিন স্যারের অফিসে আলোচনা হয়।
এসময় শিবির সভাপতি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো একজন কর্মী যদি কোনো ভুল করে এর দায়ভার আমার।' এসময় তিনি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য সবার পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চান। বিভাগের সভাপতি স্যারও মতিন স্যারের ক্লাসের শিডিউল সম্পর্কে না জেনে অনুমতি দেওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেন। পরে উপস্থিত শিবিরের দায়িত্বশীলরা স্যারের সঙ্গে দেখা করেন। মতিনুর রহমান স্যার বলেন, 'তোমরা যেহেতু স্যরি বলেছো আমার আর কিছু বলার নেই। আমি মানুষ হিসেবে অনেক শক্ত, কিন্তু শক্ত মানুষের মন অনেক নরম হয়।' বিষয়টি সেখানেই সৌহার্দপূর্ণ ও আন্তরিক পরিবেশে সমাধান হয়।
ঘটনাটি সেখানে যেভাবে সমাধান হয়েছে এরপর এ নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা না হওয়াটা ছিল প্রত্যাশিত। শিক্ষক-ছাত্রদের মাঝে একটি মিস-আন্ডারস্ট্যান্ডিং হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের ক্ষমা প্রার্থনা ও শিক্ষকের ক্ষমা প্রদর্শনের চিত্রটাই থাকা দরকার ছিল শেষ বাক্য। কিন্তু দেখতে পেলাম এটাকে নিয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন আঙ্গিকে রাজনীতি ও কূটচাল চালা হচ্ছে। ছাত্রশিবিরকে নিয়ে বাজেভাবে প্রচারণা চালানো হলো, গণমাধ্যমগুলোতে শিবিরকে জড়িয়ে সারাদিন সংবাদ পরিবেশন হলো, যে ঘটনা ঘটেনি সেগুলোও এলো অনেকের আলোচনায়। সমালোচনা করতে গিয়ে অনেকেই যে ইনসাফ করতে পারেননি এটি স্পষ্ট।
এরপর দেখা গেলো এটিকে ইস্যু হিসেবে তৈরির চেষ্টা। বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের দুটি সংগঠন এ নিয়ে নিন্দা জানালো। সাবেক শিক্ষার্থীদের একটি প্লাটফর্ম থেকে ঘোষণা দিয়ে প্রতিবাদ জানানো হলো। অনেকেই মীমাংসিত ইস্যুতে জড়িতদের শাস্তি চাইতেও ভাবলো না। শুধু শিবির বিদ্বেষ থেকে যেভাবে বিষয়টি নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা করা হয়েছে তা রাজনৈতিক বিরোধীতা ছাড়া কিছু নয়।
অবাক করা বিষয় হচ্ছে দুপুরে মতিনুর স্যার বললেন তার মন অনেক নরম, আন্তরিক সমাধান হলো কিন্তু রাতে দেখলাম শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন মেসেঞ্জার গ্রুপে এই ঘটনায় মানববন্ধনের ডাক দেওয়া হচ্ছে। নিচে লেখা 'আদেশক্রমে- মতিন স্যার'। আজ মতিন স্যার একটা শিক্ষক সংগঠনের প্রতিবাদলিপিও পোস্ট করলেন।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক শাহেদ আহমদ ভাই নিজেও পোস্ট করে আন্দোলনের হুঁশিয়ারী দিলেন বিচার চেয়ে। অথচ যখন সমাধান হলো তখন উনি সেখানেই ছিলেন। পরে হয়তো প্রেসক্রিপশন পেয়েছেন বা সহসা বুঝতে পেরেছেন এটাকে দারুণ শিবির বিরোধী ইস্যু বানানো যায়। তাই অবস্থান বদলেছেন।
আমি মনে করি, শিবিরের নেতাকর্মীরা মানুষ ও শিক্ষার্থী হিসেবে ভুল করতে পারে, ইনসাফপূর্ণ আলোচনাকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এটি যখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ইনসাফবহির্ভুত হয় তখন এটি নোংরামির পর্যায়ে চলে যায়। এটি কাম্য নয়।
একইভাবে বিভিন্ন জনের আইডিতে-পেজে দেখলাম মতিন স্যারের বিষয়ে মদ্যাপান, নারী কেলেঙ্কারী, বিএপিপন্থিদের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি ইত্যাদি অভিযোগ নিয়ে পূর্বে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের অংশ তুলে ধরেছেন। ঘটনা সত্য-মিথ্যা যাইহোক কালকের ঘটনার আলোচনায় তার পূর্বের অভিযোগ টেনে আনা ব্যক্তিগত আক্রমন মনে করি। যারা এটি করেছেন তারা কাজটি ঠিক করেননি। শেষ কথায় বলি, একসঙ্গে চলতে গেলে ভুল হবে সেই ভুলের সমালোচনা হোক সমাধানের জন্য ও ইনসাফপূর্ণ। ধন্যবাদ।
হাসানুল বান্না অলি
DIS
১৮-১৯