27/09/2026
হুমায়ূন ফরীদিকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আপনি এত অসাধারণ একজন অভিনেতা। সিনেমায় ভিলেনের এসব ভাঁড়ামি কেন করেন?”
ফরীদি খুব সহজভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, “পেটের দায়ে করি।”
তিনি আরও বলেছিলেন, থিয়েটারে কাজ করার সময় রিকশায় যাতায়াত করতেন। টেলিভিশনে কাজ শুরু করার পর ট্যাক্সিতে যাতায়াত করেছেন। আর সিনেমায় কাজ শুরু করার পর নিজের গাড়িতে যাতায়াত শুরু করেছেন।
এই কথার ভেতরেই আমাদের দেশের শিল্পীদের বাস্তবতার একটা নির্মম ছবি লুকিয়ে আছে।
আমাদের দেশে যারা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করেন, তারা অনেকটা জেনেবুঝেই এমন একটি পথে হাঁটেন, যেখানে অর্থের নিশ্চয়তা নেই, সামাজিক নিরাপত্তা নেই, অনেক সময় প্রাপ্য সম্মানটুকুও নেই। তবুও মানুষ তার জীবনের একটা বড় সময় এখানে ব্যয় করেন। নিজের মেধা, শ্রম, স্বপ্ন এবং সৃষ্টিশীলতার সবটুকু ঢেলে দেন।
কিন্তু কেন?
কবি রিফাত চৌধুরীর কথাই ধরা যাক। আজকের মিডিয়া তাকে মূলত অভিনেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। অথচ আশির দশকের অন্যতম শক্তিমান কবি রিফাত চৌধুরী। সময়ের সঙ্গে মানুষ কবিকে ভুলে গেছে, অভিনেতাকে মনে রেখেছে।
এমনকি প্রথম আলোর মতো পত্রিকাকেও শিরোনাম করতে হয়েছে, “অভিনেতা রিফাত চৌধুরী এখন কেমন আছেন?”
অথচ এই মানুষটি কত অসাধারণ, কত শক্তিশালী কবিতা লিখেছেন, তা নিয়ে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিসরে কতটা আলোচনা হয়েছে? রাষ্ট্রই বা তাঁর মতো একজন কবির পাশে কতটা দাঁড়িয়েছে?
মারজুক রাসেলের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা।
যারা তাঁর কবিতা পড়েছেন, তাঁর লেখা গান শুনেছেন, তারা জানেন তিনি কতটা শক্তিমান একজন কবি ও গীতিকার। অথচ জীবিকার প্রয়োজনে তাঁকে নিয়মিত টেলিভিশনে অভিনয় করতে হয়। জনপ্রিয় ধারাবাহিকেও কাজ করতে হয়।
ফলে একটি প্রজন্ম মারজুক রাসেলকে তাঁর কবিতা কিংবা গীতিকবিতার জন্য নয়, একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবেই বেশি চেনে। তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়, তাঁর কাব্যিক শক্তি অনেকটাই আড়ালে পড়ে গেছে।
সমস্যাটা শুধু শিল্পীদের নয়। সমস্যাটা আমাদেরও।
আমরা শিল্পীর সবচেয়ে সহজলভ্য পরিচয়টাকেই মনে রাখি। যে পরিচয়টি আমাদের বিনোদন দেয়, সেটিই সামনে রাখি। কিন্তু সেই মানুষটির দীর্ঘদিনের সাধনা, সাহিত্য, মেধা ও সৃষ্টিশীলতার জায়গাগুলো নিয়ে খুব কমই কথা বলি।
হুমায়ূন ফরীদিকে দিয়েই শেষ করি।
ফরীদি কত বড় মাপের অভিনেতা ছিলেন, সেটা হয়তো বাংলাদেশে জন্ম না নিলে পৃথিবী আরও ভালোভাবে দেখতে পেত। আমরা ইরফান খান, নাসিরুদ্দিন শাহদের অভিনয় প্রতিভার প্রশংসা করি। অথচ হুমায়ূন ফরীদি তাঁদের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলেন না।
কিন্তু আমাদের প্রজন্মের বড় একটি অংশ তাঁকে চেনে বাংলা সিনেমার ভিলেন কিংবা হাস্যরসাত্মক চরিত্রের অভিনেতা হিসেবে। মঞ্চের সেই শক্তিমান ফরীদি, কিংবা টেলিভিশনের কানকাটা রমজান, তাঁর অভিনয়ের গভীরতা এবং ব্যাপ্তি অনেকের কাছেই অচেনা।
একজন শিল্পী যখন জীবিকার প্রয়োজনে এমন কিছু কাজ করেন, যা তাঁর প্রকৃত শিল্পীসত্তাকে আড়াল করে দেয়, তখন শুধু শিল্পী নন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ।
কারণ একজন কবিকে শুধু অভিনেতা হিসেবে মনে রাখা, একজন গীতিকারকে শুধু অভিনয়শিল্পী হিসেবে চেনা কিংবা একজন অসাধারণ অভিনেতাকে শুধু ভিলেন হিসেবে মনে রাখা মানে তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের একটি বড় অংশকে হারিয়ে ফেলা।
শিল্পীদের শুধু হাততালি নয়, প্রয়োজন সম্মান, পৃষ্ঠপোষকতা এবং বেঁচে থাকার নিরাপত্তা।
কবি রিফাত চৌধুরীর দ্রুত সুস্থতা কামনা করি।
রাষ্ট্র এবং সমাজ যেন তাঁর মতো একজন শক্তিমান কবির প্রতি যথাযথ দায়িত্ব ও সম্মান দেখায়। তাঁর সাহিত্যকর্ম যেন নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছায়। কারণ একজন কবিকে বাঁচিয়ে রাখা মানে শুধু একজন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা নয়, আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে বাঁচিয়ে রাখা।