18/07/2026
লেখাটা শেয়ার করার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। এই পোস্টটির লেখক জামায়াত নেতা মরহুম আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ সাহেবের ছেলে। মানুষের অবস্থার পরিবর্তন হয়, পরবর্তিত অবস্থারও আবার পরিবর্তন হয়। এজন্য কোনো কিছুই নিশ্চয়তার সঙ্গে বলা কঠিন। কিন্তু এখানে যাকে নিয়ে লেখা হয়েছে, যে বিষয়ে লেখা হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাই অনেক বড় শিক্ষা, আমাদের সবার জন্য।
সংসদের গত অধিবেশন চলাকালীন একটি স্মৃতি। সংসদ ভবনের মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় করতে গিয়েছি। ফরজ ও সুন্নাত পড়ে আর সবার মতো আমিও বের হচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়লো একজন মানুষ সিজদা দিয়ে রয়েছেন। ২-৩ মিনিট তো হবেই। উনি নফল পড়ছেন আর টানা সিজদা দিচ্ছেন। তাকিয়ে দেখি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর সাহেব। আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। ওনাকে ওখানে পাবো এমন কোনো ধারনা ছিল না। তাই কথা বলার প্ল্যানও ছিল না।
কিন্তু এভাবে কয়েক মিনিট ধরে সিজদা দেয়ার দৃশ্য দেখে হুট করেই কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলাম। বারবার সালাম ফিরিয়ে তিনি আবার নামাজে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলেন। তাই যখন বুঝলাম, নামাজ শেষ করেছেন। তখন আস্তে গিয়ে পাশে বসলাম। বললাম, একটু কথা বলতে চাই। তিনি বললেন, “বলেন না, কী বলবেন।”
আমি বললাম, আমি আপনাকে বহুদিন ধরে দেখেছি কোর্টে আনা নেয়া করতে। আপনার কী আমার চেহারা মনে পড়ে। তিনি বললেন, চেনা তো মনে হয়। তখন আমি আব্বার কথা বললাম। জানালাম, আপনি ও আব্বা দুজনেই ২১ আগষ্ট মামলার কো-একিউজড ছিলেন। আমি সারাদিন কোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতাম, আদালত যেদিন অনুমতি দিত, সেদিন ভেতরে গিয়ে সাক্ষাত করতাম। কতবার সাক্ষাত হয়েছে আপনার সাথে। সবাই মিলে খাবার শেয়ার করেছি।
উনি বসা অবস্থাতেই আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তুমি মুজাহিদ সাহেবের ছেলে। তোমরা কেমন আছো? আমি তোমার বাবার খুব ক্লোজ ছিলাম..এভাবে অনেক কথা বললেন। ইমোশনাল হয়ে গেলেন রীতিমতো।
আমিও স্মৃতি শেয়ার করলাম। ওনার একবার জামার বোতাম ছিড়ে পড়ে গিয়েছিল- তা নিয়ে সাংবাদিকদের হাসাহাসির কথা মনে পড়লো। আরেকবার আদালত থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার সময় তার জুতোর নীচের সাইডটা খুলে পড়ে গিয়েছিল। ওনার ছেলেদের সাথে দেখা হয়েছিল একাধিক জায়গায়- সব বললাম।
তিনি আবেগতাড়িত হয়ে গেলেন। আমি তাকে দীর্ঘ সিজদা নিয়েও জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, আংকেল, যদি পারতাম সারাদিন সিজদা দিয়ে থাকতাম। আমার তো ইচ্ছে করে সিজদা থেকে মাথা না তুলি। আমার আল্লাহ আমাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে এসেছেন। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। অপমানের জীবন থেকে আজকের জায়গায় এনেছেন। ১৭ বছর কারাগার আর কনডেম সেলের জীবন থেকে আবার সংসদে এনেছেন। আমি যদি সারাদিন সিজদা দিয়ে তাকি তাহলেও তো আল্লাহর শুকরিয়ার কিছুই অদায় করা হবে না।
বাবর সাহেব নিয়ে আমার কষ্ট আছে। বিশেষ করে ২৮ অক্টোবরের ঘটনা নিয়ে, তার ভূমিকা নিয়ে। তবে সেদিন তার সিজদা দেখে, তার শুকরিয়া আদায়ের ভঙ্গিমা দেখে এবং তার বিনয় দেখে ভালো লাগলো। আল্লাহ আরো অনেককেই অনেক খারাপ অবস্থা থেকে ভালো অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। তবে সবাই এভাবে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে পারে না। অনেকে এরই মধ্যে অতীত ভুলেও গিয়েছেন।
মসজিদ থেকে বেরিয়ে অনেকেই দেখলাম তার সাথে ছবি তুলছে। আমার এসব জায়গায় বরাবরই আড়ষ্টতা কাজ করে। কিন্তু সেদিন যেন কী হলো। নিজেই বললাম, আপনার সাথে একটি স্মৃতি ধরে রাখি। তিনি বললেন, আমার আংকেলের সাথে তো আমিই ছবি তুলবো। মজলুম পরিবার তোমরা। ভালো থেকো। তার শেষ কথা আর দোয়া নিয়ে এরপর চলে আসলাম।