06/08/2023
একজন শহীদ ইলমুদ্দিন
আজ থেকে ঠিক ৯৩ বছর পূর্বে ৩১ অক্টোবর, ১৯২৯ উপমহাদেশে একটা ফাঁসির আদেশ বাস্তবায়িত হয়- এক ছুতার মিস্ত্রির ১৯ বছর বয়সী অশিক্ষিত ছেলের। কিন্তু তাঁর ফাঁসি ও পূর্বাপর ও পরবর্তী ঘটনা ছিল উপমহাদেশের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত, বিক্ষোভময় ঘটনা। এমনকি এই ঘটনা হিন্দু মুসলিম সম্পর্কের অবনতি, ব্রিটিশ বিরোধিতায় অগ্রগণ্যতা এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় অগ্রগামীতা এনে দেওয়ায় অন্যতম অনুঘটকের কাজ করে।
ইলমুদ্দিন (জন্ম: ৪ঠা ডিসেম্বর, ১৯০৮ – মৃত্যু: ৩১শে অক্টোবর, ১৯২৯) ছিলেন অবিভক্ত ভারতের একজন মুসলিম যিনি রাজপাল নামক এক বই প্রকাশককে হত্যা করেন। গাজি ইলমুদ্দিন শহীদ অবিভক্ত ভারতের লাহোরে (বর্তমান পাকিস্তান) জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা একজন ছুতার মিস্ত্রী ছিলেন। বয়োপ্রাপ্ত হলে তিনি তার পিতার দোকানে কাজে যোগ দেন। আবদুল রশিদ নামে তার একজন বন্ধু ছিলেন। তাকে “শিদা” বলে ডাকা হত। শিদার বাবার দোকান ওয়াজির খান মসজিদের সামনে অবস্থিত ছিল।
১৯২৩ সালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার লাহোর থেকে একটি বই প্রকাশিত হয় 'রঙ্গিলা রসুল' নামে। কৃষ্ণ প্রসাদ প্রতাপ নামক ব্যক্তি "চামুপতি পন্ডিত" ছদ্মনামে “রঙ্গিলা রসুল” নামক বই লেখেন। এখানে 'রঙ্গিলা' অর্থ ছিল 'প্রমোদবালক' বা 'প্লে বয়' অর্থে। রাজপাল নামে লাহোরের এক হিন্দু পুস্তক ব্যবসায়ী বইটা প্রকাশ করেন, লেখকের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ না করার ঘোষণা দিয়ে। এই বইয়ে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর নামে কুৎসা রটানোয় মুসলিমরা এর প্রতিবাদ করেন। বইটি লাহোর থেকে ১৯২৩ সালে রাজপাল কর্তৃক প্রকাশিত হয়। ভারতীয় মুসলিমদের বেশ কিছু দল এই বইটি নিষিদ্ধের দাবি জানায়। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার মুসলিমদের দাবির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেনি।
এ নিয়ে বিক্ষোভ চরমে পৌঁছালে লাহোর সেশন কোর্টে মুসলিম আইনজীবীরা মামলা করেন। তাকে 'দাঙ্গা' বাঁধানোর প্রচেষ্টায় দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেয় সেশন কোর্ট। তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন। আপিল আদালতে এর শুনানি করেন জাজ দিলীপ সিং। দিলীপ সিং তার সংক্ষিপ্ত রায়ে উল্লেখ করেন, 'এটা ভারতীয় অপরাধ বিধিমালার ১৫৩ ধারা লঙ্ঘন করে না।' অর্থাৎ তাকে দাঙ্গা সৃষ্টির অভিযোগ থেকে অদ্ভুত এক রায়ের মাধ্যমে মুক্তি দেওয়া হয়।
এই পক্ষপাতপূর্ণ রায় হিসবে অভহিত হয়ে ব্যাপক সমালোচিত হয়। রাজপাল মুক্তি পান। তবে এই মুক্তির ঘটনা লাহোর থেকে ঢাকা সর্বত্রই মুসলিমদের কাছে ঘৃণ্য বলে পরিগণিত হয়। বিক্ষোভ, মিছিল, সিরাত সম্মেলন চলতে থাকে। লাহোরের মসজিদ ওয়াজির খানের সামনেও বিরাট প্রতিবাদ সমাবেশ চলছিল। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর অপমান নিয়ে বক্তারা বক্তব্য দিচ্ছিলেন। সেদিন ইলমুদ্দিন তাঁর এক বন্ধুসহ মসজিদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই সময় পথ চলা থামিয়ে বক্তব্য শুনতে থাকেন ইলমুদ্দিন। ঐ সময় মসজিদের কাছে অনেক লোকের ভিড় জমে ছিল। লোকেরা তখন রাজপালের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ্ ﷺ কে অপমানের বিভিন্ন বক্তব্য শুনে ইলমুদ্দিন আবেগমথিত হয়ে পড়েন। গাজি ইলমুদ্দিন সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি রাজপালকে তার দোকানে গিয়ে ছুরিকাঘাতে হত্যা করবেন। ইলমুদ্দিন তাঁর বন্ধুর কাছে নিজের ইচ্ছার কথা জানান। একটি সূত্র মতে, তারা দুজনেই প্রকাশককে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। ৬ই সেপ্টেম্বর, ১৯২৯ ইলমুদ্দিন হত্যার উদ্দেশ্যে বাজার থেকে এক রুপি দিয়ে একটি খঞ্জর কেনেন। খঞ্জরটি প্যান্টের ভেতর নিয়ে খুঁজে খুঁজে রাজপালের বইয়ের দোকানে যান এবং রাজপালের খোঁজে সেখানে অপেক্ষা করতে থাকেন। এসময় রাজপাল তার দোকানে ছিলেন না আর ইলমুদ্দিনও রাজপালকে চিনতেন না। দিনভর দাঁড়িয়ে থেকে লোকেদের জিগ্যেস করে অবশেষে তিনি রাজপালকে চিনে নেন। রাজপাল বইয়ের দোকানে আসার পর ইলমুদ্দিন সোজা তার বুক বরাবর দুধারি খঞ্জরটি ঢুকিয়ে দেন। রাজপালের হৃদপিন্ড বিদ্ধ করে এটি। রাজপাল মারা যায়। কিন্তু ইলমুদ্দিন পালানোর চেষ্টা করলেন না।
পুলিশ আসল, গ্রেপ্তার করা হল ইলমুদ্দিনকে। মামলা দায়ের করা হলো। ইলমুদ্দিনের পক্ষের আইনজীবী ছিলেন ফারুক হোসেন। ইলমুদ্দিন নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। বিবাদী পক্ষ তার নির্দোষিতার পক্ষে দুজন সাক্ষী উপস্থাপন করে। বাদী পক্ষের দুজন সাক্ষী তার দোষী হওয়ার বিষয়ে সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু মামলার রায়ে ইলমুদ্দিনের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে। এই রায় শুনে ফুঁসে উঠেছে ভারতের মুসলমানরা। ইলমুদ্দিনকে বাঁচাতে আল্লামা ইকবাল, ব্যারিস্টার মঈন উদ্দিন খানসহ অসংখ্য মুসলিম তাঁর পক্ষে মাঠে নামল।
সামগ্রিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রখ্যাত আইনজীবী ও পরবর্তীকালে ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ইলমুদ্দিনের পক্ষাবলম্বন করেন। ইলমুদ্দিনের ডিফেন্স ল'ইয়ার হিসেবে মামলা হাতে নিলেন। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ লাহোর হাইকোর্টে আপিলে অংশ নেন। ইলমুদ্দিনকে বাঁচাতে এমন কোন উপায় ছিল না তা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ অনুসরণ করেননি। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, "তুমি অল্পবয়সী, আদালতকে বলো- এ কাজ করার সময় আমি মানসিক স্থিরতাসম্পন্ন ছিলাম না।" কিন্তু ঈমানের বলে বলিয়ান ইলমুদ্দিন তা অস্বীকার করেন। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ বিবাদীপক্ষের সাক্ষীদের বক্তব্যের উপর পাল্টা যুক্তি ছুড়ে দেন যা আদালতে গৃহীত হয়নি। মুহাম্মদ জিন্নাহ্ এরপর পরিস্থিতির উল্লেখ করে এই বলে আবেদন করেন যে ইলমুদ্দিন একজন ১৯, ২০ বছরের ব্যক্তি যিনি তার বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠাতার প্রতি ভালবাসার কারণে উত্ত্যক্ত হয়েছিলেন। তাই তার মৃত্যুদন্ডকে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরে বদলানো যেতে পারে। কিন্তু এই যুক্তিও আদালতে গৃহীত হয়নি।
মামলার রায় ঘোষণা করা হলো, মামলার শুনানিতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ পরাজিত হলেন। সেশন কোর্ট ফাঁসির আদেশ দিলে- উচ্চ আদালতে তা বহাল থাকে। অর্থাৎ রাজপালকে হত্যার অভিযোগে উচ্চ আদালতের বিচারক শাদিলাল ইলমুদ্দিনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত।
প্রথম ও শেষ বারের মত মামলার শুনানিতে পরাজিত হন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্। যদিও মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ইতোপূর্বে কখনো মামলায় হারেন নি- তিনি জানতেন এটা সম্ভবত তাঁর প্রথম হার। এই জন্য এই মামলা 'জিন্নাহ'স অনলি লস্ট কেইস' নামেও পরিচিত।
হিন্দু পত্রিকা “প্রতাপ” এসময় জিন্নাহর সমালোচনা করে। পত্রিকা মতে এ ঘটনা হিন্দুদের মধ্যে জিন্নাহর সম্মানের জন্য হানিকর হবে। এটি স্মরণ রাখতে হবে যে ভারতীয় দন্ডবিধির ২৯৫-ক ধারার সংযোজনের সময় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ নির্বাচন কমিটিতে ছিলেন এবং তিনি তখন সতর্ক বার্তা উচ্চারণ করে বলেন যে এই আইন ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ ও ধর্মের সমালোচনার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে।
৪ অক্টোবর, ১৯২৯ তারিখে ইলমুদ্দিনকে পাঞ্জাবের মিয়ানওয়ালি কারাগারে প্রেরণ করা হয়। ভারতীয় দন্ডবিধি অনুসারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ইলমুদ্দিনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। ব্রিটিশ সরকার কোনও জানাজা ছাড়াই তাকে দাফন করে। আল্লামা ইকবাল, মঈন আব্দুল আজীজ প্রমুখ সর্বজনমান্য মুসলিম নেতারা প্রতিবাদ শুরু করেন। করাচির লোকেরাও তাকে করাচিতে ফেরত চাইতে থাকে। অবস্থা অবনতির দিকে গেলে ব্রিটশ সরকার লাশ উত্তোলনের অনুমতি দেয়।
অবস্থার অবনতি হলে ১৫ দিন পর ১৪ নভেম্বর লাশ উত্তোলন করা হয়- অথচ বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল তাঁর দেহ না পচন ধরেছিল, না দুর্গন্ধ ছিল, না তাঁর কাপড়েও কোনও পরিবর্তন ঘটেছিল। দুই দিন পরে লাশ লাহোর পৌঁছায়। পথে লাখ লাখ লোক তাকে শ্রদ্ধা জানায়। লাহোরে দুই লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে জানাজা হয়। ইলমুদ্দিনের বাবা ইকবালকে জানাজা পড়ানোর অনুরোধ করলে তিনি জবাব দেন, ‘আমার মত গোনাহগার গাজী ইলমুদ্দিন শহীদের জানাজা পড়ানোর যোগ্য নয়।’
ইলমুদ্দিনের জানাজা পড়ান মসজিদ ওয়াজির আলি খানের ইমাম মাওলানা জাফর আলি খান। ইলমুদ্দিনের শেষ ইচ্ছে জানতে চাইলে তিনি দু’রাকাত নামাজ পড়ার সুযোগ চেয়েছিলেন। ইলমুদ্দিনকে প্রথমে গাজী (বীর) এবং মৃত্যুর পর শহীদ উপাধি দেওয়া হয়। পাকিস্তান জুড়ে অসংখ্য স্থাপনা, পার্ক, রাস্তা, হাসপাতাল, প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে তাঁর নামে। তাঁর মাজার জিয়ারত লাহোরজুড়ে এখনো অন্যতম আকর্ষণ।
আল্লামা ইকবালসহ অসংখ্য কবি তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখেন। পুস্তকও লেখা হয়েছে তাঁকে নিয়ে। এই ঘটনার পরের বছরই ইকবাল ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্রতত্ত্ব দেন। এইসব নানাবিধ ঘটনায় পৃথক আবাসভূমির দাবি চূড়ান্ত হতে থাকে। জীবিত ইলমুদ্দিনের চেয়ে শহীদ ইলমুদ্দিন রাজনীতিতে এখনো পর্যন্ত পাকিস্তানের অন্যতম প্রভাবশালী স্বত্ত্বা।