Nazaratul Maarif Al Islamia নাযারাতুল মা'আরিফ আল ইসলামিয়া

  • Home
  • Bangladesh
  • Sylhet
  • Nazaratul Maarif Al Islamia নাযারাতুল মা'আরিফ আল ইসলামিয়া

Nazaratul Maarif Al Islamia নাযারাতুল মা'আরিফ আল ইসলামিয়া Educational Institute

উপমহাদেশের মুফতি-ই-আজম হযরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ কিফায়াতুল্লাহ দেহলভী (রহ.)কেবল ভারতীয় উপমহাদেশই নয়; বরং সমকালীন মুসল...
18/08/2026

উপমহাদেশের মুফতি-ই-আজম হযরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ কিফায়াতুল্লাহ দেহলভী (রহ.)

কেবল ভারতীয় উপমহাদেশই নয়; বরং সমকালীন মুসলিম বিশ্বের মুফতি-ই-আজম, হযরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ কিফায়াতুল্লাহ দেহলভী (রহ.)—আল্লাহ তাঁর কবরকে নূরে আলোকিত করুন। তিনি ছিলেন তাঁর যুগের বিশিষ্ট মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকিহ, সাহিত্যিক, কবি, ‘ফকীহুল উম্মাহ’, ‘আবু হানিফা-ই-যামান’, বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ এবং বিশেষত সর্বসম্মতিক্রমে হিন্দুস্তানের মুফতি-ই-আজম।

তিনি ছিলেন তৎকালীন আলেমসমাজের অন্যতম উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। জ্ঞান-প্রজ্ঞা, তাকওয়া-পরহেজগারি, পবিত্রতা, উত্তম চরিত্র ও নানাবিধ গুণে তিনি ছিলেন অনন্য। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং দীর্ঘদিন এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

জন্ম ও বংশপরিচয়

মুফতি কিফায়াতুল্লাহ (রহ.) ১২৯২ হিজরি, মোতাবেক ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে শাহজাহানপুরের ‘মহল্লা সানজাই’-এ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল শেখ ইনায়াতুল্লাহ (রহ.) এবং পিতামহের নাম ফয়জুল্লাহ (রহ.)।

শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি হাফেজ বরকতুল্লাহ (রহ.)-এর মক্তবে ভর্তি হন এবং সেখানেই পবিত্র কুরআন মাজিদ সম্পূর্ণরূপে অধ্যয়ন করেন। এরপর নিজ শহরে বিভিন্ন শিক্ষকের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরে মাদরাসা আজিজিয়াহ শাহজাহানপুরে কিছু কিতাব পড়েন।

এরপর তিনি মাদরাসা শাহি, মুরাদাবাদে ভর্তি হন। সেখানে হযরত মাওলানা আবদুল আলী মীরঠী (রহ.), যিনি হযরত মাওলানা কাসেম নানুতভী (রহ.)-এর বিশিষ্ট ছাত্র ছিলেন, এবং অন্যান্য উস্তাদের কাছে শিক্ষা লাভ করেন।

পরবর্তীতে ১৩১২ হিজরিতে তিনি দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তি হন। ১৩১৫ হিজরি, মোতাবেক ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ২২ বছর বয়সে হযরত শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী (রহ.)-এর কাছে হাদিসের শিক্ষা সম্পন্ন করে দাওরায়ে হাদিসের সনদ লাভ করেন।

তাঁর বিশিষ্ট উস্তাদদের মধ্যে ছিলেন—হযরত শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী (রহ.), হযরত মাওলানা খলিল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.) এবং হযরত মাওলানা গোলাম রাসুল খান (রহ.)।

শিক্ষকতা ও ইফতা

শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার পর তিনি শাহজাহানপুরের মাদরাসা আইনুল উলূমে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। এ সময় থেকেই তিনি ফতোয়া লেখার কাজ শুরু করেন। কাদিয়ানিয়াতের খণ্ডনের উদ্দেশ্যে ১৩২১ হিজরি/১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘আল-বুরহান’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন।

এরপর ১৩২১ হিজরির শাওয়াল মাসের শেষদিকে মাদরাসা আমিনিয়াহ দিল্লির প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা আমিনুদ্দিন দেহলভী (রহ.)-এর বিশেষ অনুরোধে তিনি দিল্লিতে আগমন করেন। সেখানে মাদরাসা আমিনিয়াহর প্রধান শিক্ষক ও মুফতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

জীবনের শেষ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশ বছর তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের সদরুল মুদাররিসীন ও শায়খুল হাদিসের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর জীবনের একটি বড় অংশ এই মাদরাসার উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য ব্যয় করেন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় মাদরাসা আমিনিয়াহ দিল্লি অসাধারণ উন্নতি লাভ করে এবং ভারতের প্রসিদ্ধ দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম হয়ে ওঠে।

১৩৫৫ হিজরি/১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের মজলিসে শূরার সদস্য নির্বাচিত হন। জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর গভীর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার মাধ্যমে দারুল উলূম দেওবন্দের পরিচালকদের উপকৃত করতে থাকেন।

আধ্যাত্মিক জীবন

তিনি ইমামুর রব্বানী হযরত মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গোহী (রহ.)-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করেছিলেন। তবে তিনি নিজে কাউকে বাইআত করতেন না। কোনো ভক্ত তাঁর কাছে বাইআতের আবেদন করলে তিনি তাঁকে হযরত থানভী (রহ.), হযরত শাহ আবদুল কাদির রায়পুরী (রহ.), হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) অথবা হযরত মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভী (রহ.)-এর কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিতেন। একসময় তিনি একাকীত্ব গ্রহণ করেন এবং জীবনের শেষ দিকের অংশটা তিনি শুধু আধ্যাত্মিক সাধনা ও তপস্যায় নিয়োজিত রাখেন।

বৈশ্বিক, জাতীয় ও রাজনৈতিক খিদমত

হযরত মুফতি সাহেব (রহ.) তাঁর উস্তাদ হযরত শায়খুল হিন্দ (রহ.)-এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পোষণ করতেন। তাই জীবনের শুরু থেকেই তিনি দেশের রাজনৈতিক ও স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তাঁর জাতীয় ও মিল্লাতি খিদমতের পরিধি ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। তৎকালীন সময়ে তার একাধিক ফতোয়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আলোচিত হয় এবং যা লঙ্ঘনের খেসারত আজো ফিলিস্তিনের জনগণকে দিয়ে যেতে হচ্ছে। ১৯১৯ সালে তিনি অন্যান্য বিশিষ্ট আলেমের সঙ্গে মিলে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯১৯ সাল থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত তিনি বারবার জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ সময় এই সংগঠনের নেতৃত্ব দেন।

সর্বোপরি তাঁর ইলমি ও ফতোয়ার প্রভাব শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; মুসলিম উম্মাহ তথা সমগ্র উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাঁর ফতোয়া ও ইফতার ব্যবস্থা কার্যকর ছিল। তাঁর ফতোয়ার বৈশিষ্ট্য ছিল—সেগুলো মূলনীতি ও সামগ্রিক বিধানের ওপর ভিত্তি করে রচিত, সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট ও সহজবোধ্য।

তাঁর ফতোয়ার প্রতি মানুষের এমন আস্থা ছিল যে, বহু মানুষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর ফতোয়ার অপেক্ষা করতেন এবং তাঁর ফতোয়াকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করতেন। ফিলিস্তিনে জমি-বাড়ি ক্রয়-বিক্রয়ের বিষয়ে তার ঐতিহাসিক ফতোয়া মূল্যায়ন না করায় চলমান সময়েও মানবতাবাদী বিশ্বকে আফসোস করতে হচ্ছে।

ইন্তেকাল

হযরত মুফতি-ই-আজম মাওলানা কিফায়াতুল্লাহ দেহলভী (রহ.) ১৩ রবিউস সানি ১৩৭২ হিজরি, মোতাবেক ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন এবং মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান।

আল্লাহ তাআলা তাঁর কবরকে নূরে ভরিয়ে দিন, তাঁর ইলমি ও দ্বীনি খিদমতকে কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ স্থান দান করুন। আ মিন। (ঈষৎ সংযোজিত)

মওলুদখানীহক্ব আদায়ের না-হক পন্থা: ইতিহাস ও বর্ণনার সঠিক পর্যালোচনা----------------------------------------------মাওলানা...
17/08/2026

মওলুদখানী
হক্ব আদায়ের না-হক পন্থা: ইতিহাস ও বর্ণনার সঠিক পর্যালোচনা
----------------------------------------------
মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মালেক
---------------------------------------------
রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৌলিক হক্বসমূহ

উম্মতের প্রতি আল্লাহর প্রিয়তম বান্দা, সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক হক্ব রয়েছে, যথা-

ক. সবচেয়ে বড় হক্ব হল তাঁর প্রতি ঈমান আনা। এই হক্ব আদায়ের মাধ্যমে মানুষ তাঁর উম্মতের অন্তভুর্ক্ত হয়।১

তাঁর প্রতি ঈমান আনতে হবে যেভাবে ঈমান আনতে কুরআনে আল্লাহ বলেছেন। যেমন তিনি আল্লাহর নবী এই বিশ্বাসের সঙ্গে এ কথাও বিশ্বাস করা যে, তিনি খাতামুন্নাবিয়ীন। তাঁর পরে আর কোনো নবী নেই। তাঁর পরে আর কোনো নবী আল্লাহ পাঠাবেন না। তাঁর পর নবুওয়ত, রিসালাত ও ওহীর দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।

খ. তাঁর প্রতি অবতীর্ণ কিতাবই হল হিদায়াতের সর্বশেষ কিতাব এবং তাঁর আনীত শরীয়তই হল সর্বশেষ শরীয়ত। এরপর না আসবে আর কোনো কিতাব, না আসবে নতুন কোনো শরীয়ত। পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব এবং আসমানী শরীয়তগুলো অবিকৃতরূপে বিদ্যমানও নেই, আর সেগুলোর বিধিবিধান এখন আর অনুসরণীয়ও নয়। এখন হিদায়াত লাভের এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একমাত্র পথ হল কুরআনের প্রতি ঈমান আনা এবং শরীয়তে মুহাম্মাদীর অনুগত হওয়া।

গ. আল্লাহ তাআলা তাঁকে প্রেরণ করেছেন দাওয়াত, তাবলীগ, তা’লীম, তাযকিয়া ও জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ ইত্যাদি কাজের দায়িত্ব দিয়ে এবং তিনি তা পূর্ণরূপে পালনও করেছেন। সৃষ্টির কল্যাণকামিতার চেষ্টায় তিনি কোনো ত্রুটি করেননি। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাঁকে সান্তনা দিয়ে বলেছেন,

فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ عَلٰۤی اٰثَارِهِمْ اِنْ لَّمْ یُؤْمِنُوْا بِهٰذَا الْحَدِیْثِ اَسَفًا.

তো এমন যেন না হয় যে, যদি তারা এই বক্তব্যে ঈমান না আনে তাহলে আপনি (মনের) কষ্টে তাদের পিছনে নিজের জান দিয়ে দিলেন। -সূরা কাহাফ ৬

ঘ. তিনি সম্পূর্ণ মাসুম ও নিষ্পাপ ছিলেন। এ জন্য আল্লাহ তাআলা উম্মতকে তাঁর শর্তহীন আনুগত্যের আদেশ করেছেন এবং তাঁর পবিত্র জীবনকে উম্মতের জন্য উত্তম আদর্শ সাব্যস্ত করেছেন।

ঙ. কুরআন-হাদীসে তাঁর যত গুণ ও বৈশিষ্ট্য এসেছে অন্তরের অন্তস্থল থেকে সেগুলো বিশ্বাস করা এবং স্বীকার করে নেওয়া। অন্যদিকে ওইসব অতিরঞ্জন ও সীমালংঘন থেকেও দূরে থাকা যা খৃস্টান জাতি ও অন্যান্য জাতি তাদের পূজনীয় ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে করেছে।

২. মোটকথা, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যথাযথভাবে ঈমান আনা হল তাঁর প্রথম হক্ব এবং তাঁর প্রতি যথাযোগ্য তাজীম ও মহব্বত পোষণ করা হল দ্বিতীয় হক। এই তাজীম ও মহব্বত ছাড়া তো কারো মুমিন হওয়াই প্রমাণিত হয় না। হাদীস শরীফে এসেছে,

لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلَدِهِ، وَوَالِدَيْهِ، وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ.

তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হবে না যতক্ষণ আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও অন্য সকল মানুষ থেকে প্রিয় না হব।

৩. তৃতীয় হক্ব হল জান-মাল কোরবান করে তাঁর নুসরত করা এবং শরীয়তে মুহাম্মাদীর প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করা।২

৪. চতুর্থ হক্ব হল জীবনের ভিতর-বাহির সকল ক্ষেত্রকে সুন্নতের ছাঁচে গড়ে তোলার প্রয়াস গ্রহণ করা।

৫. পঞ্চম হক্ব হল তার পথভিন্ন কোনো নতুন বা পুরাতন পথ, যাকে পরিভাষায় বিদআত বলা হয় এবং যা বিভিন্ন ধরনের ও বিভিন্ন পর্যায়ের হয়ে থাকে, সেগুলোকে অন্তর থেকে ঘৃণা করা। বিশ্বাস ও কর্ম উভয় ক্ষেত্রেই এগুলো থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা এবং সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন বিদআত নির্মূল করে মানুষকে সু্ন্নতের অনুসারী বানাতে চেষ্টা করা।

৬. তাঁর পবিত্র জীবন, গুণ ও চরিত্র সম্পর্কে বেশি বেশি আলোচনা করা। অধ্যয়ন, অধ্যাপনা, ওয়াজ-নসীহত, কথা ও কাজ তথা দ্বীন প্রচারের সকল বৈধ পন্থায় এই বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে চর্চা করা।

৭. হাদীস শরীফ, যা সুন্নতের সবচেয়ে বড় উৎস, তার প্রচার ও প্রসার এবং তার পঠন-পাঠনের বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান করা। হাদীস শরীফ যথাযথ সংরক্ষিত আছে এবং তা দ্বীনের উৎস ও শরীয়তের দলীল, এ কথার বিশ্বাস রাখা।

৮. তাঁর প্রতি, তাঁর শরীয়ত ও সুন্নতের প্রতি, কিংবা শরীয়তের কোনো নিদর্শন বা সামান্য কোনো আদেশের প্রতিও কটাক্ষকারীকে অন্তর থেকে ঘৃণা করা এবং মুখে প্রতিবাদ করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের ভণ্ড বক্তব্য খণ্ডন করা।

৯. তাঁর আহলে বাইত ও আসহাবের প্রতি ভক্তি, মহব্বত পোষণ করা। তাঁদের হক্বসমূহ আদায় করা এবং তাঁদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে, শরীয়ত তাদেরকে যে মাকাম দান করেছে তার প্রতি লক্ষ রাখা।

১০. তাঁর জন্য সর্বদা আল্লাহর দরবারে দুআ করা। কুরআন-হাদীসে এর যে পন্থা নির্দেশিত হয়েছে তা হল তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ করা এবং নিয়মিত ওযীফার মাধ্যমে মনোযোগ ও নিবিষ্টতার সঙ্গে দরূদ শরীফ পাঠ করা।

১১. তাঁর উম্মতের দরদে দরদী হওয়া এবং উম্মতের যাবতীয় হক্ব আদায় করা।

এগুলো হল উম্মতের উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিছু মৌলিক হক্ব। অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সবগুলোই ফরযে আইন। কিছু হক্ব রয়েছে যা শুধু বিজ্ঞ আলেমগণের দায়িত্ব। এগুলো ফরযে কিফায়ার অন্তভুর্ক্ত।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যাবতীয় হক্ব সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন হওয়া এবং অব্যাহত প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাঁর উম্মতকে এসম্পর্কে সচেতন করা যাতে তারা নবীর হক্ব আদায়ে আগ্রহী ও তৎপর হয় -এটাও আমাদের দায়িত্ব।

সীরাতের দু’টি অংশ এবং সীরাত-চর্চার কয়েকটি পন্থা

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাতে পাকের দুটি অংশ রয়েছে। এক. জন্ম থেকে নবুওয়ত লাভের পূর্ব পর্যন্ত। দুই. নবুওয়ত লাভ থেকে রাব্বুল আলামীনের সঙ্গে মিলিত হওয়া পর্যন্ত। ‘সীরাতুন্নবী’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিরোনামটি ব্যাপক অর্থবোধক। নবী-জীবনের উভয় অংশই এই শিরোনামের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে ‘মীলাদুন্নবী’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিরোনামটি অর্থের দিক থেকে সংকুচিত ও খণ্ডিত। কেননা, তাঁর জীবনের দ্বিতীয় অংশ, যাকে কুরআনে কারীম উম্মতের জন্য উসওয়াতুন হাসানা বলেছে, তা এই শিরোনামের অন্তর্ভুক্ত হয় না।

নবীজির সীরাতের প্রথম অংশের অনেক ঘটনা, হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থে রয়েছে। আর সীরাতের দ্বিতীয় অংশ, যা শরীয়তের ভিত্তি ও সুন্নতের উৎস এবং প্রত্যেক মুমিনের জন্য উসওয়াতুন হাসানা, তার সম্পূর্ণ বিবরণ হাদীস ও সীরাতগ্রন্থে সুসংরক্ষিত রয়েছে এবং সেগুলোর সনদ এমনই সহীহ, নির্ভরযোগ্য ও সন্দেহাতীত যে, মনে হয় যেন সমগ্র নবী-জীবন তার সকল সৌন্দয্যর্ ও পবিত্রতা নিয়ে আমাদের সামনে জীবন্ত।

নিঃসন্দেহে এটা ইসলামের এক অদ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য এবং মুসলিম উম্মাহর অত্যুচ্চ সৌভাগ্য যে, তাদের নিকট তাদের প্রিয়তম নবীর পবিত্র জীবনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র ও বিবরণ অবিকল বিদ্যমান রয়েছে। অথচ পৃথিবীর অন্য কোনো জাতি ও ধর্মের হাদী ও রাহবারের তেমন কোনো জীবনবৃত্তান্ত সংরক্ষিত নেই।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সীরাতের চর্চার বিভিন্ন পন্থা রয়েছে।

এক. নিজের জীবন ও কর্ম, কথা ও কাজ, চরিত্র ও আচরণ, মোটকথা, জীবনের প্রতিটি অংশকে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শে গড়ে তোলা এবং চিন্তা ও অনুভূতিকে তাঁর সুন্নতের আলোকে আলোকিত করা।

দুই. তাঁর শিক্ষা ও তাঁর সুন্নতের পঠন-পাঠন ও প্রচার-প্রসারের প্রতি মনোযোগী হওয়া। এর একটি ধারা হল কুরআন ও হাদীসের শিক্ষাকে সমাজে ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা এবং দ্বীনী গ্রন্থাদির শিক্ষাদানের ব্যবস্থা অবলম্বন করা, যেগুলো কুরআন সুন্নাহর আদেশ-নিষেধ, বিধিবিধান ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে রচিত ও সংকলিত হয়েছে। আর দ্বিতীয় ধারা হল, দাওয়াত-তাবলীগ, ওয়াজ-নসীহত এবং এ জাতীয় অন্যান্য পন্থায় এগুলোকে ব্যাপকতর করার চেষ্টা করা।

তিন. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুণ ও বৈশিষ্ট্য এবং জীবন ও চরিত্র অধিক পরিমাণে আলোচনা করা। তা হতে পারে ব্যক্তি পর্যায়ে, ঘরোয়া পর্যায়ে এবং সামজিক পর্যায়ে। মোটকথা, নিজের ও অন্যের অন্তরে তাঁকে সমুজ্জ্বল করে তোলার জন্য তাঁর আলোচনার বারংবার পুনরাবৃত্তি জরুরি।

সীরাতচর্চার এই সবগুলো পন্থাই অনুসরণীয়। সালাফে সালেহীন-সাহাবা, তাবেয়ীন, তাবেতাবেয়ীন, আইম্মায়ে হুদা এবং পরবর্তী যুগের আকাবির ও মাশাইখ সবাই উপরোক্ত সকল পন্থা অবলম্বন করেছেন। এজন্য তাঁদের প্রতিটি মজলিস ও মাহফিল ছিল কোনো না কোনো পর্বে নবী জীবনের চরিত্রের নূরানী আলোচনায় নূরান্বিত। এবং তাঁদের প্রতিটি আচরণ ও উচ্চারণ ছিল সীরাতের জ্ঞান ও অন্তর্জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে নিবেদিত।

সময়ের বিবর্তন ও সীরাত চর্চার নবরূপ

নবী-যুগ থেকে সময়ের দূরত্ব যতই দীর্ঘ হতে লাগল এবং ঈমানী দুর্বলতা বেড়ে যেতে লাগল, সীরাতের আলোচনা, সীরাতের শিক্ষাদান এবং সীরাতকে জীবনাদর্শরূপে গ্রহণের প্রেরণা ততই শিথিল হতে লাগল। এমনকি নবী আলাইহিস সালামের হক্বসমূহের মধ্যে যে দু’টি বিষয় সবচেয়ে আসান ছিল অর্থাৎ সীরাতচর্চা ও দরূদ পাঠ-এই দু’টি বিষয়েও আনুষ্ঠানিকতা এসে স্থান দখল করল। মীলাদ পড়া ও পড়ানোকে দরূদ শরীফের বিকল্প ধরে নেওয়া হল, আর তাও হতে লাগল কোনো না কোনো দুনিয়াবী গরজে এবং বিশেষ বিশেষ দিন ও অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। তদ্রƒপ প্রচলিত জলসাজুলুস, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’, তাকেই সীরাত আলোচনার স্থলবর্তী করা হল। একটু হিম্মতওয়ালা যারা, তারা এই মাহফিলকে শুধু ১২ রবিউল আউয়ালে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রায় মাসের শেষ পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করল। কেউ আরও আগে বেড়ে বছরের অন্য কোনো মাসেও সীরাতুন্নবী-নামে সভা-সেমিনার কিংবা বিভিন্ন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করল। মোটামুটি এই হল প্রচলিত মীলাদুন্নবী ও সীরাতুন্নবীর হালহাকীকত। এভাবে দরূদ পাঠ ও সীরাত চর্চার বিষয়টি নিছক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ মুহূর্তে এ পদ্ধতিটির সমস্যা ও প্রচলিত মীলাদুন্নবীর প্রতিকারের উপায় সম্পর্কে আলোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়, শুধু এটুকু বলাই উদ্দেশ্য যে, নবীর জন্মদিবসের নামে অনুষ্ঠান করা নবীর সুন্নত নয়; বরং সুন্নতের বিরুদ্ধাচারণ যা খৃস্টানদের ক্রিসমাস ডে-এর অনুকরণে মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে।

এটা শুরু হয়েছে সপ্তম শতাব্দীতে। প্রচলিত মীলাদের সমর্থকরাও স্বীকার করে যে, ইরবিল অঞ্চলের শাসক আবু সাঈদ মুযাফফারুদ্দীন (৫৪৯-৬৩০ হি.) হচ্ছে মীলাদের প্রবর্তক। এ জন্যই হুঁশ-জ্ঞান আছে এমন ব্যক্তিমাত্রই মীলাদের পক্ষে লিখতে গিয়ে প্রথমেই এটি বিদআত হওয়া স্বীকার করে নেয়। এরপর একে বিদআতে হাসানা বলে জান বাঁচানোর চেষ্টা করে। মোটকথা বিষয়টি বিদআত ও নব উদ্ভাবিত হওয়ার ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই।

মীলাদের প্রচলনকালে এর সমর্থকরা এমন একটি কথা চালু করেছিল যার দ্বারা এর হাকীকত একদম স্পষ্ট হয়ে যায়। কথাটি হল, ‘যখন ক্রশধারীগণ অর্থাৎ খৃস্টান জাতি তাদের নবীর জন্ম-রজনীকে বড় ঈদ সাব্যস্ত করেছে তখন মুসলিম জাতি তো তাদের নবীর সম্মানের অধিক হক্বদার’। -আততিবরুল মাসবুক, সাখাভী পৃ. ১৪; আননি’মাতুল কুবরা (মাখতুত)

হিন্দুস্তানের মশহুর মৌলভী আব্দুছ ছামী রামপুরী ‘আনওয়ারে ছাতিআ’ নামক ‘কেতাবের’ ১৭০ নং পৃষ্ঠায় স্বীকার করেছেন যে, ভারত উপমহাদেশে খৃষ্টান ইংরেজরাই ১২ই রবীউল আউয়ালকে মীলাদুন্নবী নির্ধারণ করেছিল এবং ওই দিনে তারা ছুটি ঘোষণা করেছিল।

মীলাদ অনুষ্ঠানের ইতিহাস প্রসঙ্গে উপরোক্ত দু’টি স্বীকারোক্তির পর এ বিষয়ে আর কী বলার থাকে? তবু জেনে রাখা দরকার যে, মীলাদ পন্থীদের সমর্থিত অনুষ্ঠানের আদিরূপ ছিল এই-

১. মীলাদের তারিখে একস্থানে সমবেত হওয়া

২. কুরআনে কারীম থেকে তেলাওয়াত করা

৩. বিশুদ্ধ বর্ণনার ভিত্তিতে নবীর জন্মবৃত্তান্ত আলোচনা করা

৪. তবারক ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা। -আলহাভী লিলফাতাওয়া; সুয়ূতী ১/২৫১

বলাবাহুল্য যে, এখানে প্রথমটিকে বাদ দিলে, অন্য তিনটাতে আপত্তির কিছু ছিল না, কিন্তুু বর্তমানে তা বাড়াবাড়ির এমন পর্যায়ে পেঁৗছেছে যা চক্ষুষ্মান সকলেই দেখতে পাচ্ছেন। এ অবস্থায় এটি অবশ্য বর্জনীয় হওয়ার ব্যাপারে মীলাদ প্রেমিকদের পক্ষেও দ্বিমত প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

কিছু ভিত্তিহীন ও জাল বর্ণনা

আলোচনা অন্যদিকে চলে গেল। মীলাদ ও তার বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা হচ্ছে সপ্তম হিজরীর উদ্ভাবন, কিন্তু আমাদের সমাজের পরিভাষায় যাকে মীলাদ পড়া বা মীলাদ পড়ানো বলা হয় এবং যা কোনো মকসুদ হাসিলের জন্য বা খায়ের-বরকত লাভের জন্য কিংবা কোনো সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কিংবা মৃত ব্যক্তির ঈসালে ছওয়াবের জন্য বিভিন্ন সময়ে এবং বিশেষ ফযীলতের দিনে-রাতে হয়ে থাকে তা আরও পরের প্রচলন। মীলাদের সঙ্গে “পড়া” শব্দটির সংযুক্তি থেকেও তা বোঝা যায়। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্মবৃত্তান্ত তো বলার বিষয়, পড়ার বিষয় নয়। তবে এমন হতে পারে যে, এ বিষয়ের উপর কোনো কিতাব থেকে কেউ পড়বে আর অন্যরা শুনবে। ‘মীলাদের শৈশবে’ এমন প্রচলনও কোথাও ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এটাকেও মুশকিল মনে করার কারণে কতিপয় বে-ইলম মৌলভী কিছু ‘মীলাদনামা’ তৈরি করল, যা লোকেরা মুখস্থ আওড়াতো এবং আগে পিছে সালাত-সালাম এবং আয়াত-কালাম যোগ করে নিতো। এর নাম হল মওলুদখানী বা মীলাদ পড়া। আমাদের দেশের অনেক অঞ্চলে

وَلَمَّا تَمَّ مِنْ حَمْلِهِ صلى الله عليه وسلم شَهْرَانِ...

-এই মীলাদনামাটি প্রচলিত রয়েছে। এটি বা এ জাতীয় আরও যেসব মীলাদনামা মওলুদখানীর মজলিসগুলোতে পড়া হয় এগুলো হাদীস ও সীরাতের কিতাবাদি তো দূরের কথা, খাইরুল কুরূনও বহুদূর, পরবর্তী শত বছরেও এসবের নাম নিশানাও ছিল না।

এই ইতিহাসটি স্মরণ রাখুন এরপর দিল্লুর রহমানের মাসিক ‘আলবাইয়িনাত’ যার উদ্দেশ্যই হল হককে বাতিল এবং বাতিলকে হক্ব সাজানো তার জুন ২০০০ ইং সংখ্যায় প্রকাশিত এই প্রলাপগুলো ‘লা হাওলা’ সহযোগে পড়–ন।

১. আবু বকর সিদ্দীক রা. বলেন, যে ব্যক্তি মওলুদখানীর জন্য একটি দিরহাম খরচ করবে সে জান্নাতে আমার সঙ্গী হবে।

২. উসমান রা. বলেন, যে ব্যক্তি মওলুদখানীর জন্য একটি দিরহাম খরচ করবে সে যেন বদর ও হুনাইন যুদ্ধে অংশ নিল!

৩. হাসান বসরী রহ. বলেন, হায়! আমার যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকত, তাহলে আমি তা মওলুদখানীর জন্য খরচ করতাম?

৪. ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, যে ব্যক্তি মওলুদখানীর জন্য তার বন্ধুবর্গকে একত্র করে, খাবারের আয়োজন করে, একটি স্থান শূন্য রাখে, ইহসানের সঙ্গে আমল করে এবং এই মওলুদখানীর ব্যবস্থা করে, তাকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন সিদ্দীকীন, শুহাদা ও ছালেহীনদের সঙ্গে হাশর করাবেন এবং তাকে জান্নাতুন নায়ীমে অবস্থান করাবেন।

৫. জালালুদ্দীন সুয়ূতী তার রচিত আলওয়াসাইল ফী শরহিশ শামাইল গ্রন্থে লিখেন, যে গৃহ, মসজিদ বা মহল্লায় মওলুদখানী হয় সেই গৃহ, মসজিদ ও মহল্লাকে ফেরেশতাগণ ঘিরে ফেলে এবং তাদের জন্য দু্আ করে, আর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে মাফ করে দেন। আর যারা নূর দ্বারা পরিবেষ্টিত অর্থাৎ জিব্রাইল মীকাইল, ইসরাফীল ও আজরাইল, তাঁরা ওইসব মওলুদখানীর ব্যবস্থাকারীদের জন্য দুআ করতে থাকেন।

এগুলো একেবারেই ভিত্তিহীন বর্ণনা। যাদের নামে এগুলো চালানো হয়েছে তাদের সঙ্গে এগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই।

এগুলোর ভিত্তিহীনতা তো একেবারেই স্পষ্ট। কারণ যদি এগুলোর কোনো ভিত্তি থাকত, তাহলে তো মীলাদকে পরবর্তীকালে উদ্ভাবিত বিদআত বলে স্বীকার করার প্রয়োজন হত না। বরং সহজেই মীলাদকে সাহাবাদের আমল বলে প্রমাণ করা যেত। আসলে মওলুদখানীর প্রচলনের আরও অনেক পরে কোনো বে-ইলম ব্যক্তি এগুলোকে ঘরে বসে তৈরি করেছে।

রাজারবাগীরা এই জাল বর্ণনাগুলোর সমর্থনে আননি’মাতুল কুবরা আলাল আলম-এর উদ্ধৃতি দিয়েছে। অথচ তাতে এগুলোর চিহ্নমাত্র নেই। এই কিতাবটির মাখতুতাহ (পাণ্ডুলিপি) দারুল কুতুবিল মিছরিয়্যা কায়রোতে (ইতিহাস ২৫০৮/১৯২১) সংরক্ষিত রয়েছে এবং আমাদের কাছে তার ফটোকপি রয়েছে। আমরা তা আদ্যোপান্ত পড়েছি।

এর বিপরীতে আন্নি’মাতুল কুবরা কিতাবে ইবনে হাজার মক্কী রহ. মীলাদ কে ইসলামের প্রথম তিন শতাব্দীর অনেক পরের উদ্ভাবিত বিষয় বলেছেন এবং মীলাদের তথাকথিত বর্ণনাগুলো খণ্ডন করে বলেছেন যে, মানুষকে এগুলো থেকে দূরে রাখা ওয়াজিব। -আননি’মাতুল কুবরা ২-৩ (পাণ্ডুলিপি)

রাজারবাগীরা মানুষকে ধোকা দেওয়ার জন্য একটি নকল আননিমাতুল কুবরা’র হাওলা দিয়েছে, যা ইস্তাম্বুলের মাকতাবাতুল হাকীকাহ, (দারুশ শাফকাহ ফাতিহ, ইস্তাম্বুল, তুরস্ক)-এর ছাপা। তুরস্কের এই প্রকাশনীটি কট্টর বিদআতপন্থীদের। এরা বিভিন্ন প্রচলিত শিরক ও বিদআতের সমর্থনে কিতাবপত্র প্রকাশ করে থাকে। এমনকি কখনো কখনো কোনো বিদআতপন্থী লেখকের বাজে কিতাব হাজির করে কিতাবের বা লেখকের নাম পরিবর্তন করে পূর্ববর্তী কোনো সর্বজনস্বীকৃত আলিমের নামে চালিয়ে দেয়। এরপর কিতাবটির এমন একটি নাম নির্বাচন করে, যে নামে উক্ত মনীষীর কোনো কিতাব ছিল, কিন্তু বর্তমানে তা মুদ্রিত নেই। এখানেও মাকতাবাতুল হাকীকাহ ওয়ালারা এ কারসাজিই করেছে। ইবনে হাজার মক্কী রাহ.-এর নাম ও তাঁর কিতাব আননি’মাতুল কুবরার নাম এমন একটি কিতাবের উপর লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে যা কোনো বে-দ্বীন ও নির্বোধ বিদআতীর রচনা, যার কিছুটা বুদ্ধি খরচ করে জাল বর্ণনা তৈরি করারও যোগ্যতা নেই। যাতে কিছু সময়ের জন্য হলেও, কিংবা কিছু মানুষের কাছে হলেও তা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে। বেচারা তো এতই সফেদ মিথ্যা বলে যে শোনামাত্র ধরা পড়ে যায়। সে এটুকু চিন্তা করেনি যে, আট-নয়শ বছর পরের উদ্ভাবিত মওলুদখানীর ফযীলত যদি হযরত আবু বকর রা. ও উসমান রা.-এর নামে চালানো হয় তবে কে তা বিশ্বাস করবে? তদ্রƒপ হাসান বসরী (২১-১১১ হি.) ও ইমাম শাফেয়ী রহ. (১৫০-২০৪ হি.) -এর নামে এমন প্রলাপ চালু করা হলে তা কি বাজারে চলবে? তদ্রƒপ বেচারা এটাও চিন্তা করেনি যে, জালালুদ্দীন সুয়ূতী তো আমাদের নিকটবর্তী সময়ের। তাঁর নামে কোনো বানোয়াট কি গোপন থাকবে? অথচ বেচারা সেটাই করেছে এবং সুয়ূতী রহ.-এর নামে এমন কিতাব জুড়ে দিয়েছে যে নামে তার কোনো রচনাই নেই! সুয়ূতী রহ. নিজে তাঁর রচনাবলীর তালিকা লিখে গেছেন এবং তার পরের আলেমগণও তাঁর রচনাগুলো গণনা করেছেন, যা মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ‘আলওয়াসাইল ফী শরহিশ শামাইল’ নামে তাতে কিছু নেই।

দেখুন ড. আব্দুল হালীম চিশতী কৃত তাযকিরায়ে জালালুদ্দীন সুয়ূতী ১১৭-৩৮০

তদুপরি সুয়ূতী রহ. নিজে তার কিতাব আলহাভী ১/২৫১-২৫২ তে মীলাদ অনুষ্ঠানকে নব উদ্ভাবিত বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাহলে তিনি কীভাবে এর উক্ত ফযীলত বয়ান করতে পারেন?

ওই লোকটি যেমন মিথ্যাচারে বুদ্ধি খরচ করেনি তেমনি ইস্তাম্বুলের ‘মাকতাবাতুল হাকীকাহ’র লোকেরাও এই মিথ্যুকের কিতাবে ইবনে হাজার মক্কী এর কিতাব ‘আননি’মাতুল কুবরা’র নাম ব্যবহারের প্রতারণাটিও কুশলীভাবে করতে পারেনি। তাদের ভাবা উচিত ছিল যে, ইবনে হাজার মক্কী (মৃত্যু ৯৭৪ হি.) একজন প্রসিদ্ধ আলেম এবং তার কিতাব আননি’মাতুল কুবরাও একটি প্রসিদ্ধ রচনা, যার পাণ্ডুলিপি বিভিন্ন গ্রন্থাগারে বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং সেসব পাণ্ডুলিপির সাথে এই প্রকাশিত কিতাবটি মিলিয়ে দেখলেই তাদের প্রতারণা ফাঁস হয়ে যাবে; বরং বিজ্ঞ আলেমগণ এই কিতাব পড়ামাত্রই বলে দিবেন যে, তা ইবনে হাজার মক্কী রহ.-এর রচনা হতেই পারে না। একে তার নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে মাত্র।

রাজারবাগীরা যদি এই সব ইতিহাস জানা সত্ত্বেও সাধারণ মুসলিম জনগণকে ধেঁাকা দেওয়ার জন্য এই সকল জাল ও ভিত্তিহীন বর্ণনার উপর ‘আননি’মাতুল কুবরা’র উদ্ধৃতি ব্যবহার করে থাকে তাহলে এটি হবে তাদের পক্ষ থেকে অন্যকে বিপথগামী করার একটি নতুন দৃষ্টান্ত। অবশ্য এমন নজির তাদের আরও আছে। আর যদি অজ্ঞতাবশত তারা এরূপ করে থাকে -এই সম্ভাবনা অবশ্য খুবই ক্ষীণ, তাহলে বাস্তব বিষয়টি জানার পর এখন তাদের তওবা করা উচিত এবং সাধারণ মানুষকে প্রকৃত বিষয়ে অবগত করার জন্য সংশোধনী প্রকাশ করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা তাদের হিদায়াত দান করুন। আ মীন।

# লেখক: সম্মানিত খতীব, বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদ, বাংলাদেশ।

মধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কওমি শিক্ষার্থীর বিদ্যুৎ উৎপাদনকওমি মাদরাসার একজন শিক্ষার্থী। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞান প...
13/08/2026

মধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কওমি শিক্ষার্থীর বিদ্যুৎ উৎপাদন

কওমি মাদরাসার একজন শিক্ষার্থী। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞান পড়ার সুযোগ খুব বেশি ছিল না, কিন্তু কৌতূহল, স্বশিক্ষা আর গবেষণার আগ্রহ তাকে থামিয়ে রাখেনি।

দেশে যখন বিদ্যুতের প্রবল সংকট চলছে, এমন মুহূর্তে কওমি শিক্ষার্থীদের এই আবিষ্কার আমাদের আশা জাগায়।

কুমিল্লার আব্দুর রহমান সোহাইল বলেছেন, কুরআনে মধ্যাকর্ষণের ব্যাপারে অনেক আয়াত আছে। সেখান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে মধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইঞ্জিন তৈরিতে তিনি সফল হয়েছেন। এই প্রযুক্তিতে কোনো তেল, গ্যাস বা কয়লা পোড়ানোর প্রয়োজন নেই, এই প্রযুক্তিতে বস্তুর ওজন ও মহাকর্ষীয় শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেষ্টা করা হয়েছে।

আব্দুর রহমান সোহাইলের গবেষণার অনুপ্রেরণার একটি বড় জায়গা পবিত্র কুরআন। মহাকাশ, সৃষ্টি ও প্রকৃতি নিয়ে কুরআনের আয়াতগুলো পড়তে পড়তেই তার মধ্যে বিজ্ঞান ও গবেষণার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। সেই আগ্রহ থেকেই পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে স্বশিক্ষা এবং পরবর্তীতে গবেষণায় প্রবেশ।

শুধু বিদ্যুৎ নয়, আব্দুর রহমান সোহাইল ইতিমধ্যে দুর্ঘটনায় মানুষের জীবন রক্ষাকারী ‘সেফটি গ্যাজেট’ এবং পানিতে হাঁটার জন্য ‘ওয়াটার বুট’ প্রকল্প তৈরি করছে। যদিও এগুলো এখনো তাত্ত্বিক পর্যায়ে রয়েছে এবং পরীক্ষামূলকভাবে যাচাই করা হয়নি।

একজন মাদরাসা শিক্ষার্থীর এমন বিজ্ঞানমনস্কতা, স্বশিক্ষার আগ্রহ এবং গবেষণার সাহস নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

দেশের কওমি মেধাবীদের এমন উদ্যোগকে উপহাস নয়, সঠিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, গবেষণাগার, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে যাচাই করার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

মাদরাসার শিক্ষার্থীর হাতে কিতাবের পাশাপাশি গবেষণার যন্ত্রও উঠুক। আলেম সমাজ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মানবকল্যাণের প্রতিটা অঙ্গনে এগিয়ে আসুক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

জাতীয় মসজিদে জুমার বয়ানে দেওবন্দের মুহতামিমের পাঁচ নসিহত উপমহাদেশের শীর্ষ দীনি বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম...
08/08/2026

জাতীয় মসজিদে জুমার বয়ানে দেওবন্দের মুহতামিমের পাঁচ নসিহত

উপমহাদেশের শীর্ষ দীনি বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস আল্লামা মুফতি আবুল কাসেম নোমানী বলেছেন, হারাম থেকে বেঁচে থাকা, আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা, প্রতিবেশীর হক আদায় করা, নিজের জন্য যা পছন্দ অন্যের জন্যও তা পছন্দ করা এবং অপ্রয়োজনীয় হাসি-তামাশা পরিহার—এই পাঁচটি গুণ একজন মানুষকে প্রকৃত মুমিন ও আদর্শ মুসলমান হিসেবে গড়ে তোলে।

আজ শুক্রবার (৭ আগস্ট) জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে জুমার পূর্ব বয়ানে তিনি এসব কথা বলেন। পরে তিনি জুমার খুতবা প্রদান ও ইমামতি করেন।

বয়ানের শুরুতে তিনি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত একটি হাদিস তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘কে আমার কাছ থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা গ্রহণ করবে এবং সে অনুযায়ী আমল করবে কিংবা অন্যদের তা শিক্ষা দেবে?’ তখন হযরত আবু হুরায়রা (রা.) আগ্রহভরে সাড়া দিলে নবী করিম (সা.) তাঁর হাত ধরে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নসিহত প্রদান করেন।

আল্লামা নোমানী বলেন, প্রথম নসিহত ছিল—সব ধরনের হারাম থেকে বিরত থাকা। তিনি বলেন, শুধু ইবাদত বেশি করাই বড় বিষয় নয়; বরং হারাম থেকে নিজেকে রক্ষা করাই প্রকৃত ইবাদতের ভিত্তি। কারণ কোনো কাজ করা সহজ হলেও হারাম থেকে নিজেকে সংযত রাখা অনেক বেশি কঠিন। যে ব্যক্তি হারাম বর্জন করে, তার জন্য ইবাদত সহজ হয়ে যায় এবং সে আল্লাহর নিকট অধিক ইবাদতগুজার হিসেবে গণ্য হয়।

দ্বিতীয় নসিহত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আল্লাহ মানুষের জন্য যে রিজিক নির্ধারণ করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকাই প্রকৃত সম্পদ। বাহ্যিক ধন-সম্পদের চেয়ে অন্তরের প্রাচুর্যই আসল ধন। অল্পতুষ্টি ও কানাআতের গুণ অর্জন করলে মানুষ প্রকৃত অর্থে ধনী হয়ে ওঠে।

তৃতীয় নসিহতে তিনি প্রতিবেশীর অধিকার আদায়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যে ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না, সে পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারে না।

চতুর্থ নসিহতে তিনি বলেন, নিজের জন্য যা ভালোবাসা হয়, অন্যের জন্যও তা-ই ভালোবাসতে হবে। একজন প্রকৃত মুসলমান এমন ব্যক্তি, যার কথা ও কাজে অন্য মানুষ কষ্ট পায় না এবং যার হাত ও জিহ্বা থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে।

পঞ্চম নসিহত হিসেবে তিনি অতিরিক্ত হাসি-তামাশা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অযথা ও অতিরিক্ত হাসি মানুষের অন্তরকে কঠিন করে দেয় এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো অট্টহাসি দিতেন না; বরং তিনি সংযত ও মৃদু হাসিতেই অভ্যস্ত ছিলেন। তাই মুসলমানদের উচিত সময়কে হাসি-তামাশায় নষ্ট না করে আল্লাহর জিকির, ইবাদত এবং আত্মশুদ্ধিতে ব্যয় করা।

তিনি বলেন, উল্লিখিত পাঁচটি গুণ জীবনে ধারণ করতে পারলে একজন মানুষ প্রকৃত মুমিন, প্রকৃত মুসলিম এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দা হিসেবে গড়ে উঠতে পারবেন।

বয়ান শেষে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব ফকিহ মাওলানা আবদুল মালিক উর্দু বয়ানের সারাংশ বাংলায় অনুবাদ করে শোনান। পরে আল্লামা মুফতি আবুল কাসেম নোমানীর ইমামতিতে জুমার নামাজ আদায় করা হয়। নামাজ শেষে দেশ, জাতি ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

06/08/2026

প্রহার ও বেত্রাঘাত নয়,
অনুসৃত হোক নববী তারবিয়াহ

​আমার শিক্ষা ও শিক্ষকতা জীবনে বহু বৈচিত্র্যময় মেজাজের উস্তায ও সহকর্মীকে দেখেছি। এক উস্তাযকে পেয়েছি, যিনি জীবনে কাউকে কোনোদিন ধমকও দেননি, প্রহারও করেননি; অথচ তালেবে ইলমরা তাঁকে সবচেয়ে বেশি মান্য করতো এবং আমরাও তাঁকে গভীরভাবে সম্মান করতাম। আরেকজন উস্তাযকে দেখেছি, যিনি নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়তেন এবং তাঁর আখলাক দিয়ে শিক্ষার্থীদের হৃদয় জয় করতেন।

​পক্ষান্তরে, এমন উস্তাযকেও দেখেছি যিনি কথায় কথায় ধমক দিতেন এবং বেত্রাঘাত করতেন। তালেবে ইলমরা তাঁকে দেখে কেবল ভয়ই পেতো, সম্মান নয়।
​রব্বে কারীম আমাকে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষাবিভাগের দায়িত্ব পালনের তৌফিক দিয়েছেন। এই দীর্ঘ কর্মজীবনে আমি মহিলা মাদরাসা, ছেলেদের মাদরাসা এবং কিন্ডারগার্টেনেও ক্লাস নিয়েছি।

​একটি মহিলা মাদরাসায় এমন এক বদমেজাজি শিক্ষিকাকে দেখেছি, রাগের মাথায় যিনি আগুনের মতো লেলিহান হয়ে উঠতেন। বেত্রাঘাত না করা পর্যন্ত যেন তাঁর রাগ শান্ত হতো না। আবার এমন একজন শিক্ষককেও পেয়েছি, শিশুদের প্রহার না করলে যার মনে শান্তিই আসতো না—তাঁকে আমার স্রেফ এক মানসিক রোগী মনে হতো। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সেই শিক্ষকের নির্মম প্রহারের কারণে বহু তালেবে ইলম শেষ পর্যন্ত মাদরাসার পড়ালেখাই ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল।

​নববী শিক্ষা ও বাস্তবতা

​সরকারি আইন বা আধুনিক শিশুমনোবিজ্ঞানের আলোকে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ হলেও, আমাদের কওমী মাদরাসার নূরানী, নাজেরা ও হিফজ বিভাগে আজও অনেক প্রতিষ্ঠানে "দারাবা-ইয়াদরিবু" (প্রহারের সংস্কৃতি) বহাল তবিয়তেই রয়ে গেছে।
​অথচ তারবিয়াহ বা লালন-পালনের অসংখ্য বিকল্প ও কার্যকর পদ্ধতি রয়েছে। আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সমগ্র মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি কি প্রহার করে করে শিক্ষা দিয়েছেন? এর কি একটি নজীরও ইতিহাসে আছে?

​শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.) রচিত বিখ্যাত কিতাব 'আর-রাসুলুল মুআল্লিম ওয়া আসালিবুহু ফিত-তালীম' আমি একাধিকবার পড়েছি। কিন্তু সেখানে প্রহারের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার কোনো নববী পদ্ধতির অস্তিত্ব খুঁজে পাইনি।

​প্রহারের মূল কারণ: অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকতা

​পারিবারিক, অর্থনৈতিক বা ব্যক্তিগত কারণে তৈরি হওয়া ক্ষোভ ও রাগ মেটানোর জন্য যারা অবুঝ তালেবে ইলমদের প্রহার করে, তাদেরকে কোনোভাবেই শিক্ষক বলা যায় না; তারা মানসিক অসুস্থ। তাদের স্থান হওয়া উচিত হাসপাতালের মানসিক বিভাগে।

​মূলত যারা কোনো ধরনের শিক্ষকতা কোর্স (TTC) না করে কিংবা নিজস্ব উদ্যোগে শিক্ষা-মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষাদান পদ্ধতি নিয়ে পড়াশোনা না করেই ক্লাসে আসেন, তারাই সাধারণত তালেবে ইলমদের ওপর বেশি চড়াও হন এবং প্রহার করেন।

​আমার জীবনের এক আদর্শ মুহতামিমের কথা মনে পড়ে। এক হিফজ শিক্ষক অতিরিক্ত প্রহার করায় তিনি একদিন তাকে ডেকে বলেছিলেন,
​"আপনি কি তালেবে ইলমকে গরু পেয়েছেন? চলে যান, বাড়িতে গিয়ে গরু লালন-পালন করেন।"
​কথাটি বলেই তিনি সেই শিক্ষককে চাকরি থেকে বহিষ্কার করেন। বহিষ্কৃত সেই শিক্ষক নিজেই পরবর্তীতে গল্পটি আমার কাছে স্বীকার করেছিলেন।

​আমাদের করণীয় ও প্রস্তাবনা

​নূরানী, নাজেরা ও হিফজখানায় বাড়াবাড়ি পর্যায়ের প্রহার শতভাগ নিষিদ্ধ করা এখন সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যে আমাদের কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

​১. শিক্ষক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা:

কওমী মাদরাসায় শিক্ষক প্রশিক্ষণের (Teacher Training) সার্টিফিকেট ছাড়া কাউকেই ক্লাসে পড়ানোর সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।

২. প্রহারবিহীন তারবিয়াহর প্রশিক্ষণ:

প্রশিক্ষণে প্রহার ও সহিংসতা ছাড়া কীভাবে ভালোবাসা ও দক্ষতার মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যায়, তা শেখাতে হবে।

৩. চিন্তার পুনর্গঠন:
প্রহার, বেত্রাঘাত এবং শ্রেণীকক্ষে অহেতুক রাগের আগুন না ছড়িয়েও যে মানসম্মত তালিম দেওয়া সম্ভব, এই মানসিকতা আমাদের সর্বস্তরে গড়ে তুলতে হবে।

​প্রহারের কারণে প্রতিবছর অসংখ্য শিশু মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং মাদরাসা ছেড়ে দ্বীনি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মনে রাখা প্রয়োজন—সাধারণত যারা অন্যের শিশুদের ওপর অতিরিক্ত প্রহার ও নির্যাতন চালায়, তাদের নিজেদের সন্তানাদী ও পারিবারিক জীবনও খুব একটা সুন্দর বা সুখময় হয় না।

​সম্মানীয় উস্তাযবৃন্দের প্রতি আকুল আবেদন

​মুহতারাম শিক্ষক, আপনি যদি অন্যের সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতে পারেন, তবে তাকে অতিরিক্ত প্রহার করতে আপনার বিবেকে অবশ্যই খটকা লাগবে। আর যদি আপনি নিজের সন্তানকেও একইভাবে প্রহার করে থাকেন, তবে বুঝে নেবেন—আপনি এখনো একজন আদর্শ পিতা হতে পারেননি। কারণ, একজন আদর্শ উস্তায হলেন একজন আদর্শ পিতার তুল্য।
​আমার এই লেখা হয়তো প্রহারের পক্ষে থাকা কিছু শিক্ষকের রাগ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাতে আমার কোনো আক্ষেপ নেই; কারণ আমিও একজন শিক্ষক এবং আমি আমার আমানতদারিতার জায়গা থেকেই সত্যটি বলছি। প্রহারের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে ভালোবাসার তারবিয়াহ প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লাবীব আব্দুল্লাহ
ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট

কওমী মাদরাসায় খ্রিস্টান মিশনারির হানা------------------------------------------------------------ছবিতে দৃশ্যমান ব্যক্তি...
01/08/2026

কওমী মাদরাসায় খ্রিস্টান মিশনারির হানা
------------------------------------------------------------

ছবিতে দৃশ্যমান ব্যক্তি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন একটি কওমী মাদ্রাসা থেকে আলেম হয়ে উচ্চতর হাদিস বিভাগেও পড়াশোনা করেছেন।
শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন টাঙ্গাইল শহরের অন্যতম বড় একটি কওমি মাদ্রাসায়।

হতবাক করার বিষয় হলো, তিনি একজন খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারক। পরিচয় লুকিয়ে শিক্ষকতার সুযোগ নিয়ে ১৯ জন কোমলমতি ছাত্রকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করেছেন। ২১১ জন ছাত্রকে খ্রিস্টধর্মের প্রাথমিক নিবন্ধন করাতে সক্ষম হয়েছেন!

দীর্ঘদিন শিক্ষকতার পর মাসখানেক আগে ধরা পড়েছেন। প্রতিষ্ঠানের বদনাম হবে; তাই রাতের আঁধারে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এবার কিছু বিষয় বোঝার আছে -
১. মাদ্রাসায় বলাৎকারের ঘটনা কারা ঘটাচ্ছে; বুঝতে পারছেন?

২. ব্যক্তির অতীত না জেনে শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার খেসারত দিতে হয় যেভাবে

৩. বিভিন্ন বাতিল ধর্ম সম্পর্কে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের না জানালে শ'য়ে শ'য়ে খ্রিস্টান হয়ে যেতে পারে

৪. প্রতিষ্ঠানের বদনাম হবে; এই ভেবে লুকোচুরি করে রাতের আঁধারে বের করে দিলেই চলবে? ওকে জনসমক্ষে নিয়ে ভাইরাল করে মিডিয়ায় তার পরিচয় প্রকাশ করা কি জরুরী ছিল না?

৫. বড় বড় প্রতিষ্ঠানে ঝাঁকে ঝাঁকে ছাত্র দরকার! কোনো যাচাই বাছাই ছাড়া ভর্তি নিলে যা হতে পারে।

সারা দেশের সকল মুসলমান ও কওমী কর্তৃপক্ষের সচেতনতা জরুরি। অবশ্যই সকলকে সার্বক্ষণিক সোচ্চার থাকতে হবে।

Address

Fotehpur 5th Part
Sylhet

Telephone

+8801714731731

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Nazaratul Maarif Al Islamia নাযারাতুল মা'আরিফ আল ইসলামিয়া posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share