12/09/2026
সেদিন ভোরে গ্রামের সরু পথের পাঁচালী ধরে ছেলেটি হাঁটছিল। তার মনে হচ্ছিল, জীবন যেন এক অপরাজিত যাত্রা—কখনও আলো, কখনও অন্ধকার।
পথের শেষে সে পৌঁছল এক গভীর আরণ্যক-এর কাছে। সেখানে প্রকৃতির নিস্তব্ধতার মধ্যে তার দেখা হল এক বৃদ্ধ রাঁধুনির সঙ্গে। বৃদ্ধটি নিজের ছোট্ট আদর্শ হিন্দু হোটেল চালায়। তার জীবনের গল্প শুনতে শুনতে ছেলেটি বুঝল, মানুষের সুখ-দুঃখ আসলে এক বিশাল বিপিনের সংসার।
হোটেলের পাশের বাড়িতে থাকত দুই পরিবার—দুটি আলাদা দুই বাড়ি, অথচ তাদের হাসি-কান্না যেন একই সুতোয় বাঁধা। গ্রামের এক শিক্ষক তাকে বললেন, “জীবনকে বুঝতে গেলে অনেক পথ অনুবর্তন করতে হয়; তবেই একদিন নিজের ভিতরের দৃষ্টিপ্রদীপ জ্বলে ওঠে।”
সন্ধ্যায় নদীর ধারে বসে ছেলেটি দূরের আকাশের দিকে তাকাল। মনে হল, সে যেন কোনও অদৃশ্য দেবযান-এর যাত্রী।
পরদিন সে দেখা পেল এক বৃদ্ধের—নাম কেদার রাজা। তাঁর মুখে ছিল বহু বছরের অভিজ্ঞতা। তিনি বললেন, “জীবন কখনও শান্ত নদী নয়; কখনও কখনও মানুষকে অথৈ জল পার হতে হয়।”
নদীর ওপারে ছিল ইছামতী। তার জলে সূর্যের আলো পড়ে ঝিকমিক করছিল। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালেও মানুষের জীবনে ছিল দুর্ভিক্ষ, দুঃখ আর সংগ্রাম—যেন আসন্ন অশনি সংকেত।
ছেলেটি তখন বুঝল, মানুষের জীবন শুধু আনন্দের গল্প নয়। ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, সংসার, প্রকৃতি, দারিদ্র্য, স্বপ্ন—সব মিলিয়েই জীবন। সেই জীবন কখনও দম্পতির ভালোবাসায় পূর্ণ হয়, কখনও বিচ্ছেদে শূন্য হয়; তবু মানুষের স্বপ্ন থেকে যায়—একটি অনশ্বর আলোর মতো।
সেদিন বাড়ি ফেরার সময় ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাল। পথ, বন, নদী, মানুষ—সব যেন একসঙ্গে তাকে বলল—
“জীবন থেমে থাকে না।
পথ চলতে চলতেই গল্প হয়,
আর গল্পের মধ্যেই মানুষ বেঁচে থাকে।”
সেই দিন থেকেই ছেলেটি বুঝেছিল—বিভূতিভূষণের সাহিত্য আসলে একটিই দীর্ঘ জীবনকাহিনি; যেখানে পথের ধুলো থেকে আকাশের স্বপ্ন পর্যন্ত সবকিছুই গল্প হয়ে ওঠে।
Aaradhaya Institute