08/05/2021
টিভিতে আলিফ লায়লা চলছে,
ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে এক বাড়িতে আলিফ লায়লা দেখতে আসছি।
সেসময় নিজের বাসায় টিভি থাকাতো বহু দূরের কথা, এলাকায় টিভি ছিল হাতেগোণা কয়েক বাড়িতে,
আর বেশিরভাগ বাড়িতে ইলেক্ট্রিসিটিও ছিলনা।
টিভিগুলো চলত ব্যাটারি দিয়ে।
আলিফ লায়লা আমি আসার আগেই শুরু হয়ে গেছে,
"দেখ সব নতুন কাহিনী, মন ভরে...আলিফ লায়লা" সুচনা সংগীতটা মিস করে ফেলছি।
ওদিকে মাথায় টেনশন, বাবা কখন ঘুম থেকে জেগে আমাকে খোঁজ করে।
বাবা খাটে শুয়ে শুয়ে আমাদের পড়াচ্ছিলেন। আমরা সব ভাই বোন হারিকেন মাঝখানে রেখে গোল হয়ে মাটিতে পাটি বিছিয়ে পড়ছিলাম।
বৃষ্টি শুরু হতেই বাবার চোখ লেগে এল। আর আমিও দৌড় দিলাম।আমার মন পড়ে ছিল আলিফ লায়লায়।
আজ রিস্কটা নিতেই হত..
আজকে মালিকা হামিরার প্রাণপাখিকে সিন্দাবাদ তীর ছুড়ে মারবে।
সেটা এক্সাইটিং হবে নিশ্চই।
ওই বাড়ির ডেলায় দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে টিভি দেখছি, তারা একটু ফইন্নি আছে, কাউরে ভেতরে এলাউ করেনা।
আমি জানালায়.. এটা তারা টের পায়নায়।
বৃষ্টির কারণে ডেলা পিছলা হয়ে আছে।
আমি ব্যালেন্স ঠিক না রাখতে পেরে ধুপ করে পড়ে গেলাম।
ওরা টের পেয়ে টিভিটা অফ করে দিল।
সাক্ষাৎ অপমান।
জীবনে টিভি দেখতে আর ওই বাড়িতে যাইনি। এর কিছুদিন পর এলাকায় অন্য আরেকটা বাড়িতে টিভি কিনল, তারা চাচা হন সম্পর্কে।
এরপর আমরা বন্ধুরা সব সেখানে ভীড় করলাম।
তারা সাদরে আমাদের টিভি দেখতে জায়গা করে দিত। অনুষ্ঠান চলার সময় এটা সেটা খাওয়াত।
কি দারুণ ভাতৃত্ব, আন্তরিকতা, আর সৌহার্দ্য সে সময়ের মানুষে মানুষে..
আলিফ লায়লা, ম্যাকগাইভার, ওশান গার্ল, রুপনগর, অয়োময়, ছায়াছন্দ, টিম নাইট রাইডার, ইত্যাদি আর শুক্রবারের বাংলা ছবি,
কি দেখিনি আমরা?..
প্রতিটা দিন আমাদের এক একটা উৎসব যেন।
শুক্রবারে সিনেমার তিনটা বিরতিতে ৩৬ টা করে এড দিত। আমরা গুনতাম একটা একটা করে।
নন্দীনী প্রিন্ট শাড়ির বিজরী বরকত উল্যাহকে দিয়ে শুরু হত বিজ্ঞাপন, শেষ হত মৌ এর কেয়া সুপার লেমন সোপ দিয়ে।
আহা সে দিন!
ওই টিবি দেখতে গিয়ে সারা এলাকার মানুষের খবর পেয়ে যেতাম আমরা, এর বিপদ তার খুশি সব ই জানা হত।
আজ আমাদের নিজেদের ঘরে ঘরে দু তিনটা করে টিভি, কত উন্নত মানের ছবি, নাটক, এটা সেটা সেখানে..
অথচ ভুলকরেও সেদিকে তাকানো হয়না। নিজের রুমে বা নিজের আলয়ে আমরা সবাই মোবাইলেই বুদ হয়ে থাকি।
প্রুযুক্তি আর উন্নত জীবন আমাদেরকে কি ভুয়াবাজিতেই না লাগিয়ে দিল,
অসাধারণ সবকিছু কেড়ে নিয়ে আমাদের ডুবিয়ে দিল অসীম মরীচিকায়,
সীমাহীন আবেগহীনতায়, নিদারুণ একাকিত্বে আর ভয়ংকর স্বার্থপরতায়।
কে বলেছিল আমাদের এত এগিয়ে যেতে?
কারাই বা এমন অনুভূতিশুন্য করে দিল আমাদের?
কেউ কি ফিরিয়ে দিবে আমাদের সে নিখাদ ভালবাসা? সোনালী সময়?
দিবে কি কেউ???
© ওয়াজেদ মহান