24/10/2023
আমরা যা করি, অতিরিক্ত করি।
পরীক্ষা নেয়া শুরু করলে ক্লাস ফাইভ, ক্লাস এইটে ও পাবলিক পরীক্ষা নেয়া শুরু করি, আগা মাথা কিছু না বুঝেই।
বেশ কয়েক বছর পরে বুঝতে পারি, আহারে! এসব তো কোন কাজে আসছেনা। তখন আবার বন্ধ করে দিই।
মানে পরীক্ষা নিলে শুধু পরীক্ষা নিই আর না নিলে পরীক্ষা একেবারেই বন্ধ করে দিই। মাঝামাঝি কিছু নেই। একেবারে দুই মেরু।
এভাবে প্রশ্ন ব্যাংক, সৃজনশীল কত কিছু করলাম। আবার দুই দিন পর বন্ধ করে দিলাম।
কোন কিছু না বুঝেই শুরু করি, আম ছালা সব হারিয়ে আবার বন্ধ করে দিই।
মাঝখানে শিক্ষার্থীরা সাফার করে। ওদের কিছু শিক্ষা বর্ষ নষ্ট হয়। অভিভাবকদের অর্থ নষ্ট হয়। রাষ্ট্রের ট্যাক্সপেয়ারদের অর্থের অপচয় হয়।
আর শিক্ষকগণ চেয়ে চেয়ে দেখেন। তেমন কিছু বলতে পারেননা, চাকুরী হারানোর ঝুঁকি কে নিবে?
এ বছর থেকে ক্লাস সিক্স- সেভেনে শুরু হওয়া নতুন কারিকুলাম অবশ্য সবকিছুকে হার মানিয়েছে।
পরীক্ষা বিহীন, শুধু মূল্যায়ন নির্ভর, প্রজেক্ট নির্ভর এই সিস্টেমে শিক্ষার্থী, অভিভাবক প্রায় সবাই ই বিরক্ত,
চরম বিরক্ত।
সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়ে অভিভাবকগণ শঙ্কিত। হতাশ।
মায়ের রান্না করা কিংবা হোটেল থেকে কিনে নেয়া খাবার, চাচার বানানো কাঠের বাড়ি, বন্ধু আর টিম লিডারদের করে দেয়া প্রজেক্ট মূল্যায়ন করে ও কী লাভ?
আসলে অনেক অভিভাবকই চায়না তাদের ছেলে মেয়ে সারাদিন কাটাকুটি করে লেখা পড়া করুক। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের দিকে ঝুঁকছে পুরো পৃথিবী। সেখানে ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে নকশীকাঁথা সেলাই, মাটির হাড়ি পাতিল রঙ করা, প্রতিদিন কাগজ কাটা, পুতুল বানানো, শহরের বাড়িতে মুরগী পালন, ছাগল পালন ইত্যাদি হাস্যরসের জন্ম দিচ্ছে।
অভিভাবকরা প্রজেক্টের সরঞ্জাম সাপ্লাই দিতে দিতে বিরক্ত, স্টুডেন্টরা গভীর রাত পর্যন্ত এসব প্রজেক্ট করতে করতে ত্যক্ত- বিরক্ত, ক্লান্ত। স্টুডেন্টরা এখন নিজেরাই বলছে, এর চেয়ে পরীক্ষা সিস্টেম অনেক ভালো ছিলো।
হ্যাঁ, এসব করুক। সবই করুক। কোন সমস্যা নেই।
তবে মূল পড়াশুনা বাদ দিয়ে নয়। এসব নিয়ে তো সারাদিন পড়ে থাকলে হবেনা।
তাছাড়া, নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্ত এমনিতেই আকাশচুম্বী দ্রব্যমূল্যের কারণে খুবই বেকায়দায় আছে। এর উপর প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন প্রজেক্টের জন্য এটা সেটা কিনবে কিভাবে?
সত্যি কথা বলতে কি, ক্লাস সাইজ বিশ/ ত্রিশ জনের হলে, কোয়ালিফাইড এবং যথেষ্ট ট্রেনিং প্রাপ্ত শিক্ষক থাকলে, অভিভাবকগণ যথেষ্ট সচ্চল ও সচেতন হলে -- তখন হয়তো এরকম পরীক্ষা বিহীন, শুধু মূল্যায়ন নির্ভর, প্রজেক্ট নির্ভর এই সিস্টেমের কথা ভাবা যেতো। তাও শুধু প্রাইমারি পর্যায়ে।
হাই স্কুল কিংবা কলেজ পর্যায়ে নয়, কোনভাবেই নয়।
এখন ক্লাস সিক্স/ সেভেনে পড়া শিক্ষার্থীদের অনেকে বাসায় কিছুই পড়েনা। রাতদিন মোবাইল, ইউটিউব নিয়ে পড়ে থাকে। অভিভাবক কিছু বললে ওরা বলে, প্রজেক্ট করছি।তোমরা এসব বুঝবেনা।
আর আট জনের গ্রুপকে হয়তো একটা প্রজেক্ট দেয়া হলো, আট জনের আট জায়গায় বাসা। আজকের প্রজেক্ট কালই জমা দিতে হবে। তো ওরা সেই প্রজেক্ট একসাথে কিভাবে করবে?
ঐ একজনই করে, বাকীরা হুদাই নাম্বার পায়। ভুল বললাম। ত্রিভুজ, বৃত্ত, চতুর্ভুজ ইত্যাদি পায়, কোন গ্রেড/ নাম্বার পায়না।
ওরা স্কুলে উৎসব উৎসব ভাব নিয়ে হাবিজাবি প্রজেক্ট করে।
আরে ভাই, স্কুল তো সিরিয়াস ক্লাস করার জায়গা। সেই ক্লাস ঠিকঠাক হচ্ছে কী? ওরা ঠিকঠাক সায়েন্স, ম্যাথ, ইংরেজি, বাংলা শিখছে কী?
বই হয়তো মোটামুটি ভালো তবে পরীক্ষা না থাকলে স্টুডেন্টরা পড়বে কি?
ও আচ্ছা, পরীক্ষা না থাকলে এসব শিখেও কী লাভ?
বাপরে বাপ। কি সিস্টেম আসলো!
অভিভাবকরা কিছু বুঝেনা, অনেক শিক্ষক বুঝেনা। আমরা ভার্সিটিতে পড়ালেও এসব আজগুবি সিস্টেমের আগামাথা কিছু বুঝিনা।
তবে শুধু একটা বিষয় বুঝি, এসব স্টুডেন্টকে জিগ্যেস করলে গ্রামার পারেনা, ম্যাথ পারেনা। পড়াশুনা বাদে জগতের সব বিষয় ওরা পারে।
আমাদের আর্থসামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে এসব আসলে একেবারেই অচল, অবাস্তব। মোটেও উপযোগী নয়।
এখন একটা ক্লাসে পঞ্চাশ/ ষাট / সত্তুর জন শিক্ষার্থী থাকলে একজন শিক্ষক পঞ্চাশ মিনিটের ক্লাস টাইমে ওদের কি পড়াবেন, কি প্রজেক্ট দিবেন, কি মূল্যায়ন করবেন?
বাস্তবে হবে কি, অফিস রুমে বসে বসে সব স্টুডেন্টকে কিছু একটা ধরিয়ে দিতে হবে -- ত্রিভুজ, বৃত্ত, চতুর্ভুজ ইত্যাদি।
আসল মূল্যায়ন ও প্রায় অসম্ভব।
আর ঐ শিক্ষককে দোষারোপ করেও আসলে কি লাভ ?
বুঝলাম আমাদের আগের সিস্টেম পারফেক্ট ছিলোনা।
তো ওটাকে আরো উন্নত করেন।
প্রয়োজনে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এবং সমাদৃত ব্রিটিশ কারিকুলামের অনুকরণে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও আর্থসামাজিক অবস্থার সাথে মিল রেখে আমাদের মতো করে একটা কারিকুলাম সাজান।
ব্রিটিশ কারিকুলামে তো পরীক্ষা রয়েছে, মূল্যায়ন হয় নম্বর ও গ্রেড ভিত্তিক।
পৃথিবীর দুই শ'র কাছাকাছি দেশে এটা তো আর এমনি এমনি সমাদৃত হয়নি। নিশ্চয় ওদের কারিকুলাম অনেক বেশী ভালো, অর্গানাইজড বলেই সবাই এটাকে গ্রহণ করেছে। অনেক বছরের গবেষণার ফসল জনপ্রিয় এই শিক্ষা পদ্ধতি।
#পুনশ্চ
কোচিং বাণিজ্য থেকে মুক্তি দিতে গিয়ে আমরা পরীক্ষা বন্ধ করে দিবো?
বিষয়টা মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মতো হয়ে গেলোনা?
তাছাড়া কোচিং এ তো শিক্ষার্থীরা কিছু শিখে, পড়াশুনাই করে, তাই না?
আমরা স্কুল / কলেজে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত না করে কোচিং বন্ধ করে ও কি লাভ আসলে?
দেশের কয়টি কলেজে ইন্টারমিডিয়েটের সিলেবাস পুরো শেষ হয়? এর দায় আসলে কার?
পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, পর্যাপ্ত ক্লাস রুম নেই, সিলেবাস শেষ হবে কিভাবে?
আরেকটা বিষয়, কলেজ/ ভার্সিটি পড়ুয়া লাখ লাখ ছেলেমেয়ে টিউশানি করেই নিজে চলে, অনেকে পরিবারকে সাপোর্ট দেয়।
হুট করে পরীক্ষা বিহীন সিস্টেমে চলে গেলে তাদের কি হবে?
দেশে এরকম আর কোন পার্ট টাইম ইনকামের সহজ কোন ব্যবস্থা আছে কী?
ওরা কোথায় যাবে?
ওদের কথা কেউ ভাবছেন কী?
আরেকটি বিষয়, এসব ত্রিভুজ, বৃত্ত, চতুর্ভুজ ইত্যাদি পেয়ে এসএসসি, এইচএসসি পাশ করার পর ওদের ভার্সিটিতে ভর্তি প্রক্রিয়া কেমন হবে?
বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নিতে চাইলে ওরা কম্পিটিশানে টিকতে পারবে তো?
🖊️ লিখেছেনঃ Rezuanul Hoque