28/07/2026
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের গ্রাজুয়েট নীলাওয়ান রাখাইন (যাকে আমি নীলা বলে ডাকি) যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি প্রোগ্রামে পড়ার সুযোগ পেয়েছে এবং এটা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে বেশ সাধুবাদ জানানো হচ্ছে। আমিও সাধুবাদ জানাই। প্রতিবছর আমার অসংখ্য শিক্ষার্থী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্কলারশীপসহ উচ্চশিক্ষার জন্য যায় কিন্তু তাদেরকে নিয়ে আমি আলাদা করে কখনো কোন পোস্ট করি না। কিন্তু নীলাকে নিয়ে আলাদা করে লেখা তাগিদ বোধ করছি চারটি কারণে। এক. নীলা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, সুতরাং তার কৃতিত্বে আমিও গর্বিত; দুই. নীলা কক্সবাজারের মেয়ে আর আমিও কক্সবাজারের মানুষ, ফলে নীলার কৃতিত্ব আমার জন্যও আনন্দের; তিন. নীলা একজন আদিবাসী শিক্ষার্থী, যেহেতু আমি আদিবাসী জাতিসত্তা নিয়ে গবেষণা করি এবং বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি মেয়ের কৃতিত্ব আমার জন্য ভীষণ ভালোলাগার; এবং চার. নীলা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭ বছরের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন অঙ্গন-এর নৃত্যবিভাগের কর্মী, আর আমি ২০০৮ সাল থেকে অঙ্গনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। তাছাড়া অনেকেই জানেন, অঙ্গনের ছেলেমেয়েদেরকে আমি নিজের ছেলেমেয়ের মতো করে গড়ে তুলি। সবকিছু মিলে, আমি নীলাকে নিয়ে দু'কলম লেখার তাগিদ অনুভব করছি প্রধানত অন্যদেরকে উৎসাহিত ও প্রাণিত করার জন্য এবং নীলার কৃতিত্বের স্বীকৃতি দেয়ার জন্য।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের ২০১৬–১৭ শিক্ষাবর্ষের এই মেধাবী শিক্ষার্থী নীলা যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে (Clemson University, Indiana University Bloomington এবং Kent State University) পিএইচডির সুযোগ অর্জন করেছেন। এর মধ্যে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি সম্পূর্ণ অর্থায়নে (Fully Funded) পিএইচডি স্কলারশিপ পেয়েছেন, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। কিন্তু বিষয়টা একেবারেই এরকম নয় যে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগ থেকে পাশ করেই যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি'র অফার পেয়েছে। বরঞ্চ, নীলা নিজেকে খুবই পরিকল্পিতভাবে, কঠোর পরিশ্রম করে, একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে স্থির করে এবং প্রবল মানসিক ইচ্ছা নিয়ে আজকে এ পর্যায়ে এসেছে।
চবি'র পালি বিভাগে থেকে পাস করার পর নীলা এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন থেকে শিক্ষা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়াও নীলা ইংরেজি ভাষার শিক্ষক, 10 Minute School–এর কনটেন্ট ক্রিয়েটর, টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং ইউনিসেফ ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিভিন্ন শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি কক্সবাজারে নিজের সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘চালুং একাডেমি’, যেখানে প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এভাবেই নীলা শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনি। ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কমিউনিটি উন্নয়নকে একসঙ্গে যুক্ত করে তিনি একটি শক্তিশালী একাডেমিক প্রোফাইল গড়ে তুলেছেন। সেই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুল ফান্ডেড পিএইচডির সুযোগ পেয়েছেন।
আমি মনে করি নীলার এ কৃতিত্ব অনেকের জন্য অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় উদাহারণ। নীলা প্রমাণ করেছে, আন্তরিক ইচ্ছে থাকলে, নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা থাকলে, দৃঢ় সংকল্প থাকলে, কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকলে এবং উদ্দেশ্যের প্রতি অটল থাকলে পৃথিবীতে কোনকিছুই অজেয় নয়। নীলাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।