12/07/2015
লগারিদমের মজার জগতে আরো একটি
বার স্বাগতম। লগের জগতে একটি স্কেল
আছে, যার নাম লগ স্কেল। লগ স্কেলের
মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, কয়েকটা ছোট লগের
মান দিয়ে যাতে আমরা একটি বড়
সংখ্যার লগের মান পেতে পারি সেই
ব্যবস্থা করা। তবে আগেই যেহেতু বলে
দিয়েছি, লগ হচ্ছে লগের যে ভিত্তি তার
সূচক বা পাওয়ারের মান।
স্বভাবতই, a × a = a
সুতরাং, log b + log c =log (b×c)
একটি উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা
পরিষ্কার হবে। ধরে নেই, সাধারণ লগের
মতো এখানেও লগের ভিত্তি ১০।
log 10000= 4 এবং log 1000 = 3.
log(10000000) = log(10000 × 1000) = log
(10000) + log(1000) = 4+3=7
অর্থাৎ, log a = x এবং log b = y হলে, log
(xy) = log x + log y
সুতরাং, log 6 = log (2 × 3) = log 2 + log
3.
অর্থাৎ, আমাদের সাধারণ স্কেলের মতো
লগ ২ এর সাথে লগ ৩ যোগ করলেই আমরা
লগ ৬ এর মান পেয়ে যাব। সাধারণ
স্কেলের সাথে লগের স্কেলের পার্থক্য
এটাই। সাধারণ স্কেলে পরপর বসিয়ে
যোগ করলে যোগফলের মান পাওয়া যায়,
আর লগ স্কেলের ক্ষেত্রে পরপর বসিয়ে
যেটা পাওয়া যায় সেটা গুণফল!
এখন দেখি তো কেউ একজন জবাব দাও,
যোগই যদি হবে তাহলে তো যেকোনো
সংখ্যা n কে আমি লিখতে পারি log n =
log (n × 1) = log n + log 1.
এটা কিন্তু এভাবেও লিখা যায়, log n =
log (n × 1 × 1) = log n + log 1 + log 1.
অর্থাৎ, আমি একটা স্কেলে একই মান
যতবারই যোগ করছি না কেন স্কেলের
পাঠের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না!
কীভাবে সম্ভব হলো? ব্যাপারটি কেউ
কি ধরিয়ে দিতে পারবে? প্রশ্ন থাকলো।
পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত নদীর নাম কী?
সবাই হয়তো এক বাক্যে বলে উঠবে, কেন,
আমাদের বুড়িগঙ্গা! বুড়িগঙ্গার পানি
এতটাই দূষিত যে সেখানে কোনো মাছ
বাঁচতে পারে কিনা সন্দেহ। বুড়িগঙ্গা
দূষণের মূল কারণ হচ্ছে নদীটির চারপাশে
গজিয়ে উঠা কল-কারখানার বিষাক্ত
বর্জ্য। পরিবেশ প্রকৌশলী বা পানির
গুণাগুণ নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তারা
কিন্তু কেবল দুইটি রাশির মান দেখে বলে
দিতে পারেন পানিতে মাছ বাঁচবে
কিনা। রাশি দুইটি হচ্ছে pH এবং BOD.
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, এই দুইটি মানই
কিন্তু পরিবর্তন হয় গুণোত্তরভাবে, অর্থাৎ
pH এবং BOD সাথেও ওতপ্রোতভাবে
জড়িয়ে আছে এই লগারিদম।
লন্ডনে একবার দেখা গেল, পরিবেশ
দূষণের কারণে তাদের খুব প্রিয় এক
জাতের মাছ আর পানিতে বাঁচতে পারছে
না। আমুদে বৃটিশ জাতির প্রিয় এই মাছের
নাম ‘সীল ফিশ’। সীল ফিশ না বাঁচার
প্রধান কারণ কিন্তু সরাসরি পানি দূষণ
ছিল না, ছিল বায়ু দূষণ! তার উপর যে
দেশের পানিতে ওদের বসবাস বেশি,
দূষণটা আবার সেখানেও না, তার কয়েকশ
মাইল দূরে অবস্থিত অন্য কোনো দেশের
কারণে। অদ্ভুত ব্যাপারই বটে। এই অদ্ভুত
ব্যাপারের মূলে আছে এসিড রেইন বা
এসিড বৃষ্টি। নামটা শুনলে যদিও মনে হয়
বৃষ্টির সাথে এসিড ঝরে পড়ছে
ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। রূপক অর্থে
এটার ভয়াবহতা বোঝাতে এই নামকরণ।
কারণ এই বৃষ্টির পানি যেখানেই যায়,
সেখানকার পানি কিংবা মাটির
এসিডিটি বা অম্লতা অনেকগুণ বেড়ে
যায়। তবে ব্যাপারটা এমন না যে আমার
এলাকায় বায়ু দূষণ হলে সেটার ফলে
কেবল আমার এলাকাতেই এসিড বৃষ্টি
হবে। যেহেতু বায়ু পানির মতো নির্দিষ্ট
পরিসরে আবদ্ধ থাকে না, তাই কোনো
এলাকার বায়ু দূষণের কারণে
আশেপাশের কয়েকশ মাইল এলাকায় এই
এসিড বৃষ্টি হতে পারে। এসিড বৃষ্টির মূল
উপাদান সালফার ডাই অক্সাইড এবং
নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড। কলকারখানা
থেকে সৃষ্ট ক্ষতিকর এসব অক্সাইড
বায়ুতে মিশে যায়। এদের থাকাকালীন
সময়ে বৃষ্টি পড়লে এরা বৃষ্টির পানির
সঙ্গে বিক্রিয়া করে সালফিউরিক
এসিড কিংবা নাইট্রিক এসিডের মতো
শক্তিশালী এসিড উৎপন্ন করে। এই এসিড
বৃষ্টি পানিতে পড়লে পানির অম্লতা
বেড়ে যায়, যেটা খুব বেশি বেড়ে গেলে
মাছের পক্ষে আর বাঁচা সম্ভব হয় না।
কত বেশি অম্লতা থাকলে মাছ পানিতে
বাঁচবে না সেটা পরিমাপের জন্য অবশ্যই
একটি রাশি দরকার। পানির অম্লতা বা
ক্ষারতা পরিমাপের এই রাশির নাম pH.
(সবাইকে একটা কথা বলে রাখি এটা
কিন্তু ছোট p এর পরে ক্যাপিটাল H, pH
নয়। অনেক জ্ঞানী লোকও এটা ভুল করে
বসে থাকেন!) তো pH টা আসলে কী?
pH হচ্ছে পানিতে উপস্থিত এসিডের
ঘনমাত্রার ঋণাত্মক মান। ঘনমাত্রা?
সেটা আবার কী? ঘনমাত্রা হচ্ছে, প্রতি
লিটার পানিতে (বা অন্য দ্রাবকে)
অবস্থিত পদার্থের মোল সংখ্যা। কোনো
পদার্থের মোল বলতে বুঝায়, তার আণবিক
ভরের যতগুণ ভর বা পদার্থ (ভরের একক
গ্রামে প্রকাশিত) এই মুহূর্তে আছে।
যেমন ধরুন, সালফিউরিক এসিডের
আণবিক ভর = ৯৮। সুতরাং ১ মোল
সালফিউরিক এসিড মানে ৯৮ গ্রাম
সালফিউরিক এসিড। তেমনিভাবে এক
মোল নাইট্রিক এসিড মানে ৬৩ গ্রাম
নাইট্রিক এসিড। pH এর সংজ্ঞা
অনুযায়ী, এক লিটার পানিতে
সালফিউরিক এসিডের এক মোল উপস্থিত
থাকলে তার pH হবে= – log (2 × 1), কারণ
১ মোল H2SO4 বিযোজিত হয়ে ২ মোল
প্রোটন দেয়। একইভাবে H3PO4 এর এক
মোল মানে ৩ মোল প্রোটন। সেক্ষেত্রে
এক মোল এসিড উপস্থিত থাকা মানে
pH= – log (3 × 1).
তার মানে দাঁড়াচ্ছে, পানিতে উপস্থিত
প্রোটনের ঘনমাত্রা ১ মোল হলে, সেই
পানির pH হবে –log (1)= 0. এখন, প্রতি
লিটার পানিতে যদি সালফিউরিক
এসিডের ০.৫ মোল থাকে তবে
সেক্ষেত্রে প্রোটন থাকবে দ্বিগুণ বা ১
মোল। সেখান থেকে বলা যায়, প্রতি
লিটারে ০.৫ মোল সালফিউরিক এসিড
বা ৪৯ গ্রাম সালফিউরিক এসিড উপস্থিত
থাকলে তার pH শূন্য। এখন প্রতি লিটারে
যদি সেটা ৪.৯ গ্রাম থাকে, সেক্ষেত্রে
প্রোটন থাকবে ০.০৫ × ২ = ০.১ মোল। এবং
এক্ষেত্রে pH= – log (0.1) = 1. স্পষ্টত,
দেখাই যাচ্ছে, এসিডের পরিমাণ ১০ গুণ
কমানোতে pH এর মান ১ ঘর বৃদ্ধি
পেয়েছে। এখান থেকেই বুঝা যাচ্ছে, pH
যত বেশি, অম্লতা বা এসিডিটি তত কম।
এখন কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে,
এসিড বা ক্ষার কিছুই না হলে pH কত
হবে। আমরা জানি বিশুদ্ধ পানি হচ্ছে
নিরপেক্ষতার মানদন্ড। তার মানে বিশুদ্ধ
পানির pH এর মান হবে নিরপেক্ষ pH।
হিসেব করে দেখা গিয়েছে বিশুদ্ধ
পানির মধ্যে H+ এবং OH- দুইটিই সমান
ঘনমাত্রায় বিদ্যমান, এবং মানটি হচ্ছে
10 M. সেই কারণে পানির pH = – log
(10 ) = 7. যেহেতু নিরপেক্ষ মান 7,
সেহেতু তার দুই দিকেই সমান সংখ্যক ঘর
নিয়ে তৈরি হয় pH স্কেল। 7 এর বামে
যেতে থাকলে নিরপেক্ষতা থেকে
অম্লতা বা এসিডিটি বাড়ে, অন্যদিকে
ডানে যেতে থাকলে ক্ষারতা বৃদ্ধি পায়।
পানিতে ক্ষারের পরিমাণকে pOH দিয়ে
প্রকাশ করা হয় এবং সেটাও নিরপেক্ষ
হবে পানির OH আয়নের ঘনমাত্রার
ভিত্তিতে। pOH= -log (OH ) = log (10 ) =
7.
যেহেতু pH = – log (H ), pOH = – log
(OH )
এবং বিশুদ্ধ পানির ঘনমাত্রা = 10-14,
সুতরাং, বলা যায় যে, বিশুদ্ধ পানিতে
একই ঘনমাত্রার ধনাত্নক ও ঋণাত্নক আয়ন
বিদ্যমান। সুতরাং, পানিতে উপস্থিত H
+ OH = 10 । উভয়পক্ষে – log নিলে
আমরা পাব, pH + pOH = 14. বা, pH = 14 –
pOH. অর্থাৎ, পানিতে pH বা pOH এর
একটি জানা থাকলে অন্যটি সহজেই বের
করা যায়। নিম্নে লগ স্কেলের একটি
নমুনা দেখানো হলো।
বাস্তব জীবনে pH এর গুরুত্ব অপরিসীম।
যেমন, পানির pH এর মান ৪.৫ এর নিচে
গেলে মাছ বাঁচে না, কারণ সেক্ষেত্রে
পানিতে কার্বনিক এসিড বা কার্বন ডাই
অক্সাইডের পরিমাণ এত বেড়ে যায় যে,
মাছের শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া অসম্ভব হয়ে
পড়ে। আবার অন্যদিকে pH এর মান ১০.৩
এর উপরে গেলেও মাছ বাঁচে না।
সেক্ষেত্রে পানিতে ক্ষতিকর
অ্যামোনিয়ার মাত্রা বেড়ে যায় যার
কারণে মাছের পক্ষে বাঁচা অসম্ভব হয়ে
পড়ে। এজন্য অ্যাকুরিয়ামের pH সবসময়
একটি optimum পর্যায়ে রাখতে হয়।
মাছের সুস্থ স্বাভাবিক বাঁচার জন্য
মোটামুটি নিরপেক্ষ সীমার pH ভালো,
সেই pH এর মান ৬.০ থেকে ৯.০ এর মধ্যে
হলে সবচেয়ে ভালো। এই কারণেই নদী বা
খালের পাশের কারখানার তরল বর্জ্য
পরীক্ষণের সময় প্রথমেই pH এর মান
দেখে আন্দাজ করে নেয়া হয় পানির
অবস্থা এবং সেক্ষেত্রে চেষ্টা করা হয়
কীভাবে অম্ল বা ক্ষার যোগ করে
পানির pH এর মান ৬ থেকে ৯ এর মধ্যে
আনা যায়।
এসিড বৃষ্টির কারণে প্রতি লিটার
পানিতে মোট উপস্থিত প্রোটনের
পরিমাণ বেড়ে যায়। যার ফলশ্রুতিতে
পানির pH এর মান কমতে থাকে। সমুদ্রের
পানির ক্ষেত্রে ভয় নেই, কারণ সমুদ্র এত
বড় যে সামান্য এসিড বৃষ্টি তার pH এর
খুব একটা মান কমাতে পারে না। কিন্তু,
নদী বা খালের আয়তন অনেক কম থাকে।
ফলে টানা এসিড বৃষ্টি হলে পানির pH
এর মান কমে যেতে বাধ্য। কয়েক বছর
টানা এসিড বৃষ্টি হতে থাকলে একসময়
সেটা pH এর মান ৪.৫ এর নিচে নামিয়ে
আনে। ফলে পানিতে মাছের বেঁচে থাকা
কষ্টকর হয়ে উঠে। আমুদে বৃটেনবাসীর
প্রিয় সীল ফিশ কিন্তু এই এসিড বৃষ্টির
কারণেই বিলুপ্ত হতে যাচ্ছিল। পরে
সেটার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েই
প্রাণের সীল ফিশকে তারা বাঁচাতে
পেরেছিল।
শুধু পানিই নয়, যে কোনো তরল বস্তুর
(দ্রবণের) সাম্যাবস্থা বজায় রাখতে pH
এর গুণগত মান বজায় রাখা জরুরি।
মানুষের রক্তের pH ৬.৩। রক্তের pH কমে
যাওয়া কিংবা বেড়ে যাওয়া ভয়াবহ
বিপর্যয়ের লক্ষণ। pH এর মান একটু কমে ৬
এর নিচে কিংবা ৭ এর উপর গেলেই
মানুষের বেঁচে থাকা দুষ্কর হয়ে উঠে।
আচ্ছা pH এর মান কখনো ০ এর কম বা ১৪
এর বেশি হতে পারে না? উত্তর- পারে।
তবে সেটা আমরা চূড়ান্ত বা চরম অবস্থায়
ধরে নিব, যা আমাদের হিসেবের বাইরে।
pH এর মান শূন্য মানে প্রতি লিটারে
প্রোটন থাকবে 10 = 1 mole. যেহেতু pH
কমা মানে প্রোটনের পরিমাণ বাড়া,
সেহেতু আমরা বলতে পারি, আমাদের
ধর্তব্যের মধ্যে ১ লিটারে সর্বোচ্চ ১
মোল প্রোটন থাকা সম্ভব। তার বেশি
প্রোটন থাকলে সেটা আমাদের
হিসেবের সীমার বাইরে চলে যাবে।
ব্যাপারটা শুনে একটু অবাকই লাগছে?
অবাক হলেও সত্য যে, ১ লিটারে ১ মোল
প্রোটন থাকা মানে ১/২ মোল দ্বিপ্রোটন
এসিড (সালফিউরিক এসিড) বা ১/৩ মোল
ত্রিপ্রোটনিক এসিড (ফসফরিক এসিড)
বিদ্যমান থাকা। অর্থাৎ ১ লিটার
পানিতে ৪৯ গ্রাম সালফিউরিক এসিড
বা ৩২.৫৫ গ্রাম ফসফরিক এসিড থাকলে
সেটার pH এর মান শূন্য। মনেই হতে পারে
১ লিটারে মাত্র ৪৯ গ্রাম সালফিউরিক
এসিড, এ আর এমন কি ভয়ঙ্কর! কিন্তু
বাস্তবে এলেই দেখা যাচ্ছে ১ লিটারে
মাত্র ০.০০৪৯ গ্রাম সালফিউরিক এসিডই
(pH = ৪) মাছের প্রাণ নিয়ে নিতে সক্ষম!
সেখানে ৪৯ গ্রাম তো আরো ১০০০০ গুণ
বেশি শক্তিশালী। এজন্যই
ল্যাবরেটরীতে একটা কথার খুব প্রচলন
থাকে- লঘু সালফিউরিক এসিড।
শক্তিশালী এসিডগুলো এতটাই মারাত্নক
যে, প্রতি লিটারে ওদের ১ মোলের ১০
হাজার ভাগের ১ ভাগও অনেক
শক্তিশালী। অথচ, দুর্বৃত্তরা সেই
শক্তিশালী এসিডই সরাসরি ছুঁড়ে দিচ্ছে
সামান্য প্রতিশোধ বা জিঘাংসা
চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে।
এসিড বৃষ্টি বন্ধের পাশাপাশি এসিড
নিক্ষেপ বন্ধ করাটাও তাই আমাদের
একান্ত কর্তব্য। আগামী মাসে লগ নিয়ে
আরো কথা হবে, সেই পর্যন্ত সবাই সুস্থ
থাকুন। এসিড নিক্ষেপকে প্রতিরোধ
করুন।