14/08/2026
আজ যদি ঢাবির শিক্ষার্থী হতাম........
আব্দুল্লাহ আল নোমান
আজ যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হতাম, তবে বৃহৎ পরিসরে ছাত্ররাজনীতির আরেকটি স্বপ্নের যাত্রা হয়তো শুরু করতে পারতাম।
দীর্ঘদিনের গু/ম, খু/ন, মাম/লা, নির্যা/তন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। হরতাল-অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন এবং তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছেন। সেই ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল জুলাই আন্দোলন।
জুলাই আন্দোলনের উত্তাল সময়ে শহিদ ওয়াসিম আকরাম আমার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত মিছিলে অংশ নিয়ে শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের আন্দোলনের ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অধ্যায়। শহিদ ওয়াসিম জাতীয়তাবাদী শক্তি ও ছাত্রদলের জন্য এক গর্বের নাম। আন্দোলনের সময় নিজের পা হারানোর ঝুঁকি নিয়েও ক্র্যাচে ভর দিয়ে আন্দোলনকে চলমান ও বেগবান রাখার চেষ্টা করেছি; সঙ্গে ছিলেন আমার সহযোদ্ধারা। দিন কিংবা রাতের পর রাত কেটেছে রাজপথে। শরীরের ওপর দিয়ে গেছে অসহনীয় নির্যাতন, কিন্তু মূল লক্ষ্য থেকে কখনো সরে যাইনি। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সেই সময়গুলো আমার জন্য যেমন কঠিন চ্যালেঞ্জের ছিল, তেমনি ছিল দায়িত্ব পালনের গভীর এক উপলব্ধি।
মাঝে মাঝে মনে হয়, আজ যদি আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হতাম এবং ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেতাম, তাহলে হয়তো আরও বৃহৎ পরিসরে মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র ও ছাত্রসমাজের কল্যাণে কাজ করতে পারতাম। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এই আক্ষেপ আমার অবশ্যই আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে রাজনীতি করার সুযোগ না পাওয়ার আক্ষেপ হয়তো জীবনের কোনো না কোনো প্রান্তে থেকে যাবে।
তবে সেই আক্ষেপের চেয়েও বড় আমার দায়িত্ববোধ। কারণ রাজনীতিতে পদ-পদবি বড় কথা নয়; মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ত্যাগ স্বীকার করা এবং কঠিন সময়ে দায়িত্ব পালন করাই একজন কর্মীর প্রকৃত পরিচয়।
ক্র্যাচে ভর দিয়ে নিজের পা হারানোর ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে থাকার চেষ্টা করেছি। রাতের পর রাত কেটেছে আন্দোলনের মাঠে। কিন্তু মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা থেকে পিছু হঠিনি। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী না হতে পারার আক্ষেপ থাকলেও রাজপথের কর্মী হিসেবে নিজের ভূমিকা নিয়ে আমার কোনো অনুশোচনা নেই।
৫ আগস্টের পর আমাদের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, সেটিকে বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিহিংসা, দখলদারিত্ব ও আধিপত্যের রাজনীতির পরিবর্তে প্রয়োজন দায়িত্বশীল, সহনশীল ও গঠনমূলক ছাত্র রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
ক্ষমতা বা প্রভাব পাওয়া মানেই প্রতিপক্ষকে দমন করা নয়। বরং দায়িত্বশীল অবস্থানে থেকে ভিন্নমতকে সম্মান জানানো, মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করাই হওয়া উচিত নতুন ছাত্র রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি।
জুলাই-পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি নিরাপদ, শিক্ষাবান্ধব ও স্বাভাবিক ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তুলতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ছাত্ররাজনীতির অর্থ শুধু মিছিল-মিটিং নয়; শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা, তাদের বাস্তব সমস্যার পাশে দাঁড়ানো এবং সব মতের শিক্ষার্থীর নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করাও ছাত্ররাজনীতির মূল দায়িত্ব।
ক্ষমতাসীন অবস্থানে থেকেও দখলদারিত্ব না করা, হল বা ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার না করা, ভিন্নমতের শিক্ষার্থীদের হয়রানি না করা এবং প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে নয়—গণতান্ত্রিক সহযাত্রী হিসেবে দেখাই হতে পারে নতুন ছাত্ররাজনীতির প্রকৃত পরিবর্তন।
শহিদ ওয়াসিমের আত্মত্যাগ, জুলাইয়ের সংগ্রাম এবং রাজপথে অসংখ্য মানুষের ত্যাগ যেন শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে—সেই প্রত্যয়েই আমরা এগিয়ে যেতে চাই।
আমি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানুষের অধিকার থাকবে, শিক্ষার্থীরা নিরাপদ থাকবে, ক্যাম্পাস হবে শিক্ষাবান্ধব, ভিন্নমতের প্রতি থাকবে শ্রদ্ধা এবং রাজনীতি হবে শুধুই মানুষের কল্যাণের জন্য।
আমাদের স্বপ্ন হওয়া উচিত সুন্দর বাংলাদেশ—সবার আগে বাংলাদেশ। সেই স্বপ্নের বাংলাদেশকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রত্যয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ, মানবিক ও দায়িত্বশীল বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামে আজীবন নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চাই।
কারণ আমার কাছে রাজনীতি কোনো পদ-পদবির প্রতিযোগিতা নয়; এটি মানুষের জন্য, দেশের জন্য এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আজীবন দায়িত্ব পালনের এক অঙ্গীকার।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।