16/09/2026
উন্নয়ন মানুষের জন্য, মানুষকে উচ্ছেদ করার জন্য নয়
মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (মিডা) মহেশখালীকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রায় ৩৭ হাজার একর ভূমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনার কথা বলেছে। এই পরিকল্পনার আওতায় ধলঘাটা, মাতারবাড়ী, কালারমারছড়া ও হোয়ানকসহ মহেশখালীর বিভিন্ন এলাকা পড়ছে। এমনকি এই চারটি ইউনিয়ন সম্পূর্ণভাবে প্রকল্পের আওতায় চলে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব মহেশখালীর অন্যান্য এলাকাতেও পড়তে পারে।
এই বিষয়টি আমাদের জন্য কেবল একটি উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয় নয়; এটি আমাদের মাটি, মানুষ, বসতভিটা, পেশা, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি বিষয়।
আমি নিজেও মহেশখালীর সন্তান; আমার শিকড়, আমার পরিবার, আমার পৈতৃক ভিটা, সবকিছুই এই মাটির সঙ্গে জড়িত। তাই মহেশখালীর মানুষের জমি ও বসতভিটা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা হলে সেটিকে আমি দূরের কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ রাখি না। এই মাটির প্রশ্নে “তারা” আর “আমরা” আলাদা নই, আমরাই সেই মানুষ, যাদের জীবন ও ভবিষ্যৎ এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত।
উন্নয়ন আমরা চাই; মহেশখালীর উন্নয়ন আমরাও চাই। কিন্তু উন্নয়নের অর্থ যদি হয় মানুষের ভিটেমাটি কেড়ে নেওয়া, পৈতৃক সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ করা, কৃষকের চাষের জমি কেড়ে নেওয়া, জেলে ও অন্যান্য পেশাজীবীর জীবিকার পরিবেশ ধ্বংস করা এবং একটি প্রজন্মকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া, তাহলে সেই উন্নয়নের ধরন ও বিকল্প নিয়ে প্রশ্ন তোলা আমাদের ন্যায্য অধিকার।
এ ধরনের বৃহৎ ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনই নাগরিকের অধিকার সুরক্ষার প্রধান ভিত্তি।
১। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ নাগরিকের সম্পত্তি ও আইনগত সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়:
"কোনো নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির ক্ষতি করা যাবে না।"
২। অনুচ্ছেদ ৩২ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করে:
"উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ে "জীবন" বলতে শুধু বেঁচে থাকা নয়, বরং অর্থপূর্ণ জীবন ও জীবিকাকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।"
৩। অনুচ্ছেদ ৪০ বৈধ পেশা ও বৃত্তির স্বাধীনতা স্বীকার করে।
৪। একই সঙ্গে অনুচ্ছেদ ১৮ক বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নির্ধারণ করেছে।
৫। অন্যদিকে স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭ অনুযায়ী জনস্বার্থে অধিগ্রহণ হলেও নির্ধারিত আইনগত প্রক্রিয়া, যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পুনর্বাসনের বিষয় নিশ্চিত করতে হবে।
৬। পাশাপাশি বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী প্রযোজ্য প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত মূল্যায়ন ও পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিধানও অনুসরণ করতে হবে।
এই আইনের ধারা ১২ অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছ থেকে পরিবেশগত ছাড়পত্র (Environmental Clearance Certificate) গ্রহণ ব্যতিরেকে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না। বৃহৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (EIA) এবং জনমত যাচাই করা আইনগত বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া।
আমরা মনে করি, কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের মূল্যায়ন শুধু কত কিলোমিটার রাস্তা হবে, কত বড় বন্দর হবে কিংবা কত বিনিয়োগ আসবে, এসব দিয়ে শেষ হতে পারে না। আমাদের প্রশ্ন হতে হবে: এই উন্নয়নের জন্য কতটি পরিবার তাদের ভিটেমাটি হারাবে? কতজন মানুষ জীবিকার উৎস হারাবে? কৃষক কোথায় চাষ করবেন? পরিবেশগত কী কী ভয়াবহতা নেমে আসতে পারে? জেলে কোথায় মাছ ধরবেন? উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো কোথায় যাবে? তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী হবে? এবং একই উন্নয়ন কম ক্ষতির মাধ্যমে বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প আছে কি না?
কারণ একটি মানুষের জমি শুধু কয়েক শতক বা কয়েক একর ভূমি নয়। সেই জমির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তার পূর্বপুরুষের স্মৃতি, পরিবারের ইতিহাস, বসতভিটা, পেশা, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার।
একজন কৃষক তার জমি হারালে শুধু একটি জমি হারান না, তিনি হারান তাঁর পেশা ও আয়ের প্রধান উৎস। একজন জেলে তার জীবিকার পরিবেশ হারালে শুধু একটি কর্মক্ষেত্র হারান না, তার সঙ্গে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে পুরো পরিবার। আর একটি পরিবার যখন তার পৈতৃক ভিটা হারায়, তখন শুধু একটি বাড়ি হারায় না; হারায় তার সামাজিক শিকড়, পরিচিত পরিবেশ এবং প্রজন্মের উত্তরাধিকার।
ক্ষতিপূরণের অর্থ দিয়ে একটি জমির বাজারমূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে; কিন্তু একটি মানুষের শিকড়, পূর্বপুরুষের স্মৃতি এবং প্রজন্মের উত্তরাধিকারকে টাকার অঙ্কে পরিমাপ করা যায় না।
তাই আমরা চাই, মহেশখালীর মানুষের ওপর কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা চাপিয়ে দেওয়ার আগে তাদের কথা শোনা হোক। প্রকল্পের সম্ভাব্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হোক। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মতামত, অধিকার, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি জীবিকার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হোক।
বিশেষ করে সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য নতুন করে মানুষের বসতভিটা ও চাষের জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হলে সম্ভাব্য বিকল্প স্থান ও বিকল্প পরিকল্পনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভূমি ও অবকাঠামো পুনর্বিবেচনা করে সেখানে সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সম্ভাবনা আছে কি না, তা কারিগরি, পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও আইনগতভাবে যাচাই করা যেতে পারে। যদি মানুষের বসতভিটা ও কৃষিজমির ওপর চাপ কমিয়ে উন্নয়নের কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প থাকে, তাহলে সেটিও অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
আমরা উন্নয়ন বন্ধ করতে চাই না। আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই; আমরা মানুষকে বাদ দিয়ে উন্নয়নের বিরোধী।
আমরা চাই মহেশখালী এগিয়ে যাক। আমরা চাই এখানে কর্মসংস্থান হোক, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হোক, শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারিত হোক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি হোক। কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল পেতে গিয়ে যেন মহেশখালীর মানুষকেই নিজেদের ভিটেমাটি, পেশা ও জীবিকার মূল্য দিতে না হয়।
আমি মহেশখালীর একজন সন্তান হিসেবে, আমাদের মানুষের একজন প্রতিনিধি হিসেবে স্পষ্টভাবে বলতে চাই,
আমাদের উন্নয়ন চাই, কিন্তু আমাদের উচ্ছেদ করে নয়।
আমাদের সমৃদ্ধি চাই, কিন্তু আমাদের শিকড় কেটে নয়।
আমাদের ভবিষ্যৎ চাই, কিন্তু আমাদের বর্তমানকে ধ্বংস করে নয়।
মহেশখালীর মানুষকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে, পৈতৃক সম্পত্তি ও বসতভিটা কেড়ে নিয়ে, মানুষের পেশা ও আয়ের উৎস ধ্বংস করে এবং একাধিক প্রজন্মকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়ে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা আমরা চাই না।
মহেশখালীর উন্নয়ন আমরাও চাই। কিন্তু সেই উন্নয়ন হতে হবে মহেশখালীর মাটি, মানুষ, জীবিকা, অধিকার, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে।
কারণ,
উন্নয়ন মানুষের জন্য, মানুষকে উচ্ছেদ করার জন্য নয়।
সাইফুল ইসলাম
সাংগঠনিক সম্পাদক,
পুসাহ
শিক্ষার্থী,
আইন বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।