03/09/2026
শহীদ মীর কাসেম আলী রাহিমাহুল্লাহ
(৩১ ডিসেম্বর ১৯৫২ – ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬)
শহীদ মীর কাসেম আলী একটি নাম, একটি ইতিহাস
যার বর্ণনা করতে গেলে কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। তিনি একাধারে বাংলাদেশের ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা কেন্দ্রীয় সভাপতি, প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, সংগঠক, শিল্প উদ্যোক্তা, সাংস্কৃতিক সংগঠক, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিত্ব এবং জনকল্যাণ ও সমাজকল্যাণমূলক অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত একজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে সকলের নিকট পরিচিত ও সমাদৃত।
এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন।
মীর কাসেম আলী ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান ও পরিচালক ছিলেন এবং ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন। তিনি দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন, যার অধীনে দৈনিক নয়া দিগন্ত ও দিগন্ত টেলিভিশন পরিচালিত হয়।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি ইবনে সিনা ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং প্রতিষ্ঠানটির বিকাশে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। ইবনে সিনা ট্রাস্টের উদ্যোগে পরবর্তীতে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, নার্সিং ইনস্টিটিউট ও ফার্মাসিউটিক্যাল কার্যক্রমসহ স্বাস্থ্যসেবার বিস্তৃত পরিসর গড়ে ওঠে। ট্রাস্টটির মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া।
এছাড়াও তিনি ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিপণন বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কেয়ারি লিমিটেড, অ্যাসোসিয়েশন অব মাল্টিপারপাস ওয়েলফেয়ার এজেন্সিজ অব বাংলাদেশ (AMWAB), Agro Industrial Trust, Fouad Al-Khateeb Charity Foundationসহ বিভিন্ন সামাজিক, ব্যবসায়িক ও কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। তিনি Industrialists and Businessmen Welfare Foundation, Allama Iqbal Sangsad, International Islamic University Chittagong, Darul Ihsan University এবং Centre for Strategy and Peace Studies-এর ব্যবস্থাপনা/কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ছড়িয়েছেন আলোর দ্যুতি। অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন অসংখ্য মানুষের। ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী বীমা, মসজিদ, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন সামাজিক-কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল । বিশেষ করে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় তুলনামূলক কম খরচে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ তাঁর কর্মকাণ্ডের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
বিশেষ করে গ্রাম, চরাঞ্চল ও পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তিনি প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জন্য রাঙ্গামাটির মাইনিমুখে ‘রাবেতা হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও তাঁর জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। পাহাড়ি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এ ধরনের উদ্যোগ তাঁর সমাজসেবামূলক চিন্তার প্রতিফলন বহন করে।
এমন একজন দেশপ্রেমিক মহৎ মানুষকে খুনী হাসিনার ক্যাঙ্গারু কোর্টে সাজানো ও হাস্যকর বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে খুন করা হয়। তাঁর শাহাদাতের কয়েক সপ্তাহ আগে, ৯ আগস্ট তাঁর আইনজীবী ও ছেলে ব্যারিস্টার আরমানকে হাসিনা সরকার তুলে নিয়ে যায়। আইনি প্রক্রিয়ায় পরাজিত হাসিনা সরকার বিচারকদের চাপ দিয়ে জোর করে ফাঁসির ব্যবস্থা করে।
তিনি আজ আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু রয়েছে তাঁর কাজ, তাঁর গড়া ও তাঁর উদ্যোগে বিকশিত প্রতিষ্ঠানগুলো। ইবনে সিনা ট্রাস্ট ও এর স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস, দিগন্ত মিডিয়া, নয়া দিগন্ত, দিগন্ত টেলিভিশন এবং বিভিন্ন সামাজিক, শিক্ষা, ধর্মীয় ও কল্যাণমূলক উদ্যোগ আজও তাঁর রেখে যাওয়া কর্মের স্মৃতি বহন করে।
দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য এসব প্রতিষ্ঠান ও সেবামূলক কার্যক্রম অবিরাম কাজ করে যাবে। আমাদের প্রজন্ম যাকে যুগ যুগ ধরে মনে রাখবে—তিনি শহীদ মীর কাসেম আলী রহি.