13/12/2020
মহামারীতে আশা-নিরাশার দোলায় বিদেশ গমনেচ্ছু শিক্ষার্থীরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন আফসানা আলম প্রীতি। বিদেশ যাওয়ার ইচ্ছায় আইইএলটিএস পরীক্ষা দিয়েছেন গত বছরের ডিসেম্বর মাসে।
আবেদন করার পর জার্মানির তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রীতি সাড়াও পেয়েছেন স্কলারশিপসহ পিএইচডিতে ভর্তির জন্য। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে ভিসা কার্যক্রম এগোচ্ছে না।
প্রীতি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সবকিছু মোটামুটি নিশ্চিত হয়েই ভিসার জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু কবে ভিসা পাব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার ভিতরে আছি।”
প্রীতি আটকে রইলেও ভাগ্যের শিকে ছিঁড়েছে পৃথ্বিকা বনিক রিমির। তিনি পৌঁছতে পেরেছেন জার্মানিতে।
ফ্রাঙ্কফুর্ট ইউনিভার্সিটি অফ এপ্লায়েড সায়েন্সে স্কলারশিপসহ আইটি বিভাগ থেকে মাস্টার্সের সুযোগ, এমনকি ভিসা পেয়েও শুধু প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার কারণে যেতে পারছিলেন না রিমি।
গত ১৫ জুলাই এন্ট্রি রেস্ট্রিকশন তুলে দেওয়ার পর ফ্লাইট চালু হলে ২৬ অগাস্ট জার্মানির পথে পাড়ি জমান তিনি।
রিমি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গত বছর নভেম্বরে এপ্লাই করে ডিসেম্বরে অফার লেটার হাতে আসে। এর মধ্যেই ভিসার কাজও শেষ হয়। মার্চের শেষদিকে রওনা দেয়ার কথা ছিল, কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে যাওয়া বন্ধ থাকে।
“এপ্রিলে অনলাইনেই ক্লাস করেছি দেশে থাকাকালীন। অনলাইনে পরীক্ষাও দিয়েছি। অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলাম কবে আসতে পারব। শেষমেশ অগাস্টে এসে সরাসরি ক্লাস করছি,” বলেন তিনি।
রিমি জানান, বর্তমানে জার্মানির ভিসা কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও স্কলারশিপ থাকলে বিশেষ বিবেচনায় কিছু ভিসা দেওয়া হচ্ছে।
বিদেশে উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন অনেক শিক্ষার্থীর থাকলেও তা পূরণের সুযোগ এমনিতেই কঠিন, তার উপর বছরের শুরুতে করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে মহামারী রূপ নিলে তা সেই স্বপ্নকে আরও দূরে ঠেলে দেয়।
ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ শিক্ষার জন্য বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ৭০ থেকে ৯০ হাজার শিক্ষার্থী দেশের বাইরে যায়। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, জাপান ও নিউজিল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশই প্রধান গন্তব্য।
মহামারীর কারণে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের অধিকাংশ দেশে বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করলে দূতাবাসগুলো নতুন করে ভিসা ইস্যু বন্ধ করে দিয়েছিল।
এখন কিছু কিছু দেশ ক্ষেত্রবিশেষে দ্বার খুললেও বিদেশ গমনেচ্ছু এই শিক্ষার্থীদের দুঃশ্চিন্তা এখনও কাটছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান জানান, ২০১৯ সালের এপ্রিলে আইইএলটিএস দিয়ে কাঙ্ক্ষিত স্কোর অর্জন করে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ টেনেসিতে পিএইচডির জন্য আবেদন করে স্কলারশিপে ভর্তির সুযোগও পান তিনি, কিন্তু ভিসা পাচ্ছেন না।
মাহমুদ বলেন, “আমার যাওয়ার কথা ছিল অগাস্টেই। অ্যাম্বেসিগুলো বন্ধ থাকায় ভিসা প্রসেসিং বন্ধ আছে। ভিসা ইন্টারভিউ উইন্ডোটাই বন্ধ রাখার কারণে কারোই ভিসা হচ্ছে না।
“যারা ইউএসএতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার পেয়েছে, তাদের মধ্যে ৪০০ থেকে ৫০০ জনের সাইন নিয়ে ইউএস অ্যাম্বাসেডরকে মেইল করা হয়েছে। কিন্তু তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি, বলেছেন, সময় হলেই অ্যাম্বেসি খোলা হবে।”
গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়া সিফাত তুহিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যেতে এবছর শুরু থেকে জিআরই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিলেও তার আর পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। এখন সামনের ডিসেম্বরে জিআরই পরীক্ষা দেওয়ার চিন্তা করছেন তিনি।
সিফাত বলেন, “করোনাভাইরাস সব প্ল্যান পণ্ড করে দিল। এখন ঘরে বসে অনলাইনে পরীক্ষা দেওয়া যায়। তবে এটার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠছে। যাই হোক, ডিসেম্বরে জিআরই সেন্টারে গিয়েই পরীক্ষা দেব।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসির স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী সাবিনা রহমান হতাশার সুরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আগে থেকেই আইইএলটিএস পরীক্ষাটা দিয়ে রাখার ইচ্ছা ছিল। যাতে মাস্টার্স শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ইউএসএ বা ইউরোপের কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে পারি।
“এবছর নভেম্বরেই পরীক্ষাটা দেওয়ার প্ল্যান ছিল। জানি না, এই প্যানডেমিক কবে শেষ হবে, আর কবে পরীক্ষা দিতে পারব।”
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গত বছর স্নাতক সম্পন্ন করেছেন আশিকুর রহমান। যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের যে কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হতে চান তিনি। কিন্তু এখনও আইইএলটিএস পরীক্ষা দিতে পারেননি তিনি।
আশিক বলেন, “আইইএলটিএসের জন্য প্রস্তুতি নিয়েও করোনার জন্য আর পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। তারপর তো ভিসা জটিলতা আছেই। মনে হচ্ছে করোনার জন্য আমাকে একটা বছর পিছিয়ে যেতে হবে।”
জট খুলছে ধীরে -
করোনাভাইরাস মহামারীতে কয়েকমাস বন্ধ থাকার পর কয়েক ধরনের ভিসা নবায়নের আবেদন নেওয়া শুরু করেছে ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস। তবে যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার্থী ছিলেন ও পুনরায় লেখাপড়ায় ফিরে যেতে ইচ্ছুক এমন শিক্ষার্থীসহ নির্দিষ্ট কয়েক ধরনের নন-ইমিগ্রান্ট (যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে) ভিসা নবায়নের আবেদন করতে পারছেন। নতুন শিক্ষার্থীদের সুযোগ এখনও খোলেনি।
যুক্তরাজ্যের সব ধরনের ভিসা কার্যক্রম চালু রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় ব্রিটিশ হাই কমিশনের সিনিয়র প্রেস অফিসার মেহের জেরিন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, গত ১২ জুলাই ঢাকা এবং সিলেটের ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার পুনরায় চালু করা হয়। এক্ষেত্রে গ্রাহকদের আগে থেকে অ্যাপয়েনমেন্ট নিতে হচ্ছে।
জেরিন বলেন, বাংলাদেশে ইউকে ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার (ভ্যাক) বর্তমানে টাইয়ার-৪ স্টুডেন্ট ভিসাসহ সব বিভাগের ভিসা আবেদনের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।
“সামাজিক দূরত্বের নিয়ম মেনে চলায় অ্যাপয়েনমেন্টের সংখ্যা কমানো হয়েছে। তবে শিগগিরই এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারব বলে আশা করছি।”
শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা বিষয়ে সুবিধাপ্রদান প্রসঙ্গে জেরিন বলেন, “সেজন্য ভিসা কার্যক্রমে কিছুটা নমনীয়তা আনা হয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে কোনো শিক্ষার্থী সরাসরি ইউকেতে গিয়ে ক্লাস শুরু করতে না পারলেও দেশে থেকেই যেন অনলাইনে ক্লাস করতে পারে সে ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং তারা টায়ার-৪ ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যে সব প্রক্রিয়া রয়েছে তার মধ্যে ভাষার দক্ষতা প্রমাণ অন্যতম। এজন্য আইইএলটিএস, টোফেল, স্যাট অথবা জিআরই পরীক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন। একেকটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে এসব চাহিদার পার্থক্য থাকতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ, ব্রিটিশ কাউন্সিল ও আইডিপি অস্ট্রেলিয়া যৌথভাবে পরিচালনা করে আইইএলটিএস পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় নীতি নির্ধারক কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি হলেও বিশ্বব্যাপী পরীক্ষা পরিচালনা ও শিক্ষার্থীদের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার মূল ভূমিকা পালন করছে ব্রিটিশ কাউন্সিল ও আইডিপি অস্ট্রেলিয়া। সারা বিশ্বে একই প্রশ্নপত্র ও অভিন্ন নিয়মে পরিচালিত হয়।
কিছু দিন বন্ধ থাকলেও ব্রিটিশ কাউন্সিলে কম্পিউটার-ডেলিভারড ও পেপার-বেসড আইইএলটিএস পরীক্ষা পুনরায় শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে তা নেওয়া হচ্ছে।
ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশের হেড অফ কমিউনিকেশন্স শারমিন নিলিয়া জানান, কিছু দিন স্থগিত থাকলেও ব্রিটিশ কাউন্সিলের পক্ষ থেকে আইইএলটিএসের চারটি বিভাগের প্রস্তুতি বিষয়ক ভিডিও, টিপস ও ট্রিক্স, অনুশীলন সামগ্রীসহ বিভিন্ন রিসোর্সেস অনলাইনে উন্মুক্ত ছিল। যা ব্যবহার করে আগ্রহীরা অনায়াসেই বাসায় বসেই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পেরেছেন।
তিনি বলেন, “যেহেতু সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে সেন্টারসমূহের ধারণক্ষমতা কিছুটা হ্রাস করা হয়েছে, তাই প্রয়োজন অনুযায়ী টেস্ট ডেটের সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হবে।”
বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ও সিলেটে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া শুরু হয়েছে। খুলনা, কুমিল্লা ও রাজশাহীতেও পর্যায়ক্রমে পুনরায় পরীক্ষা শুরু হবে বলে জানান নিলিয়া।
বিশ্বব্যাপী জিআরই, টোফেল পরীক্ষা সেবা প্রতিষ্ঠান এডুকেশনাল টেস্টিং সার্ভিসের (ইটিএস) এর ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা কেন্দ্র বন্ধ থাকলেও ঘরে বসে অনলাইনে জিআরই, টোফেল পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ইটিএসের অধীনে বাংলাদেশে চারটি পরীক্ষাকেন্দ্র রয়েছে। এগুলো হল- আমেরিকান অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন (ট্রিপল এ), ইউএস সফটওয়্যার লিমিটেড, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (এআইইউবি) এবং ডিএনএস সফটওয়্যার লিমিটেড।
ডিএনএস সফটওয়্যার লিমিটেডের টেস্ট সেন্টার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মোহাম্মদ আলী বলেন, “আমরা পরীক্ষার শিডিওল এলে জিআরই পরীক্ষা নিয়ে থাকি। গত ছয় মাস যাবত পরীক্ষার শিডিওল নিয়ে অনেকটাই ঝামেলা তৈরি হয়েছে। প্রত্যেকবার শিডিওল দেওয়ার পর পরিস্থিতি বিবেচনায় তা স্থগিত করা হয়েছে।”
সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মূলত এই সেন্টারে জিআরই পরীক্ষা নেওয়া হয়।
“আগে যেখানে প্রতি সপ্তাহে পরীক্ষা নেওয়া হত, সেখানে এখন মাসে একবার পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও আগের চেয়ে অনেক কম,” বলেন আলী।
টোফেল পরীক্ষা বিষয়ে তিনি বলেন, “এই কোভিড-১৯ এর সময়ে টোফেল পরীক্ষা ঘরে বসেই দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এক্ষেত্রে কম্পিউটার বেজড পরীক্ষা হচ্ছে।”
আইইএলটিএস, জিআরই পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য রাজধানী ঢাকায় কিছু কোচিং সেন্টার চালু রয়েছে। কোচিং সেন্টারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে ঘরে বসে অনলাইনেই নিয়মিত ক্লাস করে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।
University Admission Information