07/07/2026
কুরআনের সাথে কিভাবে সম্পর্ক গড়ব?
~উস্তাদ হযরত মাওলানা মুফতি তাওহীদুল ইসলাম আযহারি (হাফিযাহুল্লাহ), সিনিয়র উস্তাদ, ইন্টারনেট মাদরাসা।
এমফিল গবেষক : হাদিস উলূমুল হাদিস বিভাগ: আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর।
🍁কুরআনুল কারীমের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা কেবল তিলাওয়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বুদ্ধিবৃত্তিক, আত্মিক ও আমলভিত্তিক একটি সমন্বিত জীবনব্যবস্থা। আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর আলোকে কুরআনের সঙ্গে প্রকৃত সম্পর্ক প্রধানত সাতটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
১. কুরআন হিফয করা:
কুরআন হিফয করা এই উম্মতের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। কুরআন সর্বপ্রথম মানুষের অন্তরে সংরক্ষিত হয়েছে, এরপর তা লিখিত আকারে সংকলিত হয়েছে। কুরআনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে হিফযের দুটি স্তর রয়েছে—
১. ফরযে আইন:নামাজ শুদ্ধভাবে আদায়ের জন্য সূরা আল-ফাতিহা এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণ কুরআন মুখস্থ করা।
২. ফরযে কিফায়া: সম্পূর্ণ কুরআন বা এর উল্লেখযোগ্য অংশ মুখস্থ করা।
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
﴿بَلْ هُوَ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ فِي صُدُورِ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ﴾ [العنكبوت: ٤٩]
অর্থ: "বরং এটি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ, যা তাদের অন্তরে সংরক্ষিত, যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে।" (সূরা আল-আনকাবূত, আয়াত: ৪৯)
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
«إنَّ الَّذي ليسَ in جوفِهِ شيءٌ منَ القرآنِ كالبيتِ الخرِبِ»
অর্থ: "যার অন্তরে কুরআনের কোনো অংশ নেই, সে যেন একটি পরিত্যক্ত ঘরের মতো।"
(সুনান আত-তিরমিযী, হাদিস: ২৯১৩)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
«يُقالُ لِصاحِبِ القرآنِ: اقرَأ وارتَقِ ورتِّلْ كما كُنتَ ترتِّلُ في الدُّنيا، فإنَّ منزلتَكَ عندَ آخِرِ آيةٍ تقرَؤُها»
অর্থ: "কুরআনের সাথীকে বলা হবে: পড়তে থাকো, উপরে উঠতে থাকো এবং দুনিয়ায় যেভাবে তারতীলের সঙ্গে পড়তে, সেভাবেই পড়ো। তোমার মর্যাদা হবে তোমার সর্বশেষ পঠিত আয়াত পর্যন্ত।"
(সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ১৪৬৪; সুনান আত-তিরমিযী, হাদিস: ২৯১৪)
২. নিয়মিত তাজবীদের সঙ্গে তিলাওয়াত করা:
কুরআন শুধু বেশি বেশি পড়ার জন্য নয়; বরং তারতীল, তাজবীদ ও যথাযথ আদবের সঙ্গে তিলাওয়াত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
﴿وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا﴾
অর্থ: "কুরআন স্পষ্ট ও সুবিন্যস্তভাবে (তারতীলের সঙ্গে) পাঠ করো।"(সূরা আল-মুযযাম্মিল: ৪)
আরও ইরশাদ করেছেন,
﴿الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَتْلُونَهُ حَقَّ تِلَاوَتِهِ أُولَئِكَ يُؤْمِنُونَ بِهِ﴾ [البقرة: ١٢١]
অর্থ: "যাদের আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তা যথাযথভাবে তিলাওয়াত করে।"
হযরত আবু উমামাহ আল-বাহিলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
«اقْرَءُوا القُرْآنَ فإنَّه يَأْتي يَومَ القِيامَةِ شَفِيعًا لأَصْحابِهِ»
"তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করো; কেননা কিয়ামতের দিন এটি তার সাথীদের জন্য সুপারিশকারী হয়ে আসবে।"
(সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৮০৪)
৩. তাদাব্বুর (গভীর চিন্তা ও অনুধাবন):
কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে শুধু পড়ার জন্য নয়; বরং তা বোঝা, চিন্তা করা এবং জীবন পরিচালনার জন্য।
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
﴿كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ﴾
অর্থ: "এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীর চিন্তা করে।"
(সূরা সোয়াদ: ২৯)
আরও ইরশাদ করেছেন,
﴿أَفَلَا يَتَدَبَّرونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا﴾
"তারা কি কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা করে না? নাকি তাদের অন্তরে তালা লাগানো রয়েছে?"
(সূরা মুহাম্মদ: ২৪)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাচ্ছিলাম। সূরা আন-নিসার ৪১ নম্বর আয়াতে পৌঁছলে তিনি বললেন,
«حَسْبُكَ الآنَ»
আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তাঁর দুই চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে।
(সহীহ বুখারী, হাদিস: ৫০৫০; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৮০০)
৪. কুরআনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি:
কুরআনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা, ঈমানকে দৃঢ় করা এবং উত্তম চরিত্র গঠন করা। তাই কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়; বরং আত্মশুদ্ধি ও জীবন গঠনের জন্য নাযিল হয়েছে।
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
﴿هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ﴾
"তিনিই উম্মীদের মধ্যে তাদেরই একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদের আত্মশুদ্ধি করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন।"(সূরা আল-জুমুআ: ২)
আরও ইরশাদ করেছেন,
﴿قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا﴾
অর্থ: "নিশ্চয়ই সে সফল, যে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর সে ব্যর্থ, যে তাকে কলুষিত করেছে।"(সূরা আশ-শামস: ৯–১০)
হযরত সা'দ ইবনু হিশাম (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.)-কে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন,
«كانَ خُلُقُهُ القُرْآنَ»
"কুরআনই ছিল তাঁর চরিত্র।"
(সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৭৪৬)
৫. কুরআনের ওপর আমল করা:
কুরআন নাযিলের একমাত্র উদ্দেশ্য কেবল তিলাওয়াত নয়; বরং এর আদেশ-নিষেধ অনুযায়ী গোটা জীবন পরিচালনা করা৷কুরআন নাযিলের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য৷
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
﴿وَهَذَا كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ فَاتَّبِعُوهُ وَاتَّقُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ﴾
"এটি এক বরকতময় কিতাব। অতএব তোমরা এর অনুসরণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।"(সূরা আল-আনআম: ১৫৫)
৬. নিয়মিত মুরাজাআহ (পুনরাবৃত্তি) করে হিফয সংরক্ষণ করা:
কুরআন নিয়মিত পুনরাবৃত্তি না করলে তা দ্রুত স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। তাই অল্প বা বেশি—যতটুকুই মুখস্থ থাকুক না কেন, তা নিয়মিত মুরাজাআহ করা আবশ্যক।
হযরত আবু মূসা আল-আশ'আরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
«تَعاهَدُوا هذا القُرْآنَ، فَوَوالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّদٍ بِيَدِهِ لَهُوَ أَشَدُّ تَفَلُّتًا مِنَ الإِبِلِ فِي عُقُلِهَا»
"এই কুরআনের প্রতি যত্নবান হও। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! এটি বাঁধা উটের চেয়েও দ্রুত স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়।"
(সহীহ বুখারী, হাদিস: ৫০৩৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৭৯১)
কুরআনের সঙ্গে শরয়ী সম্পর্কের সূচনা হয় শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত শেখার মাধ্যমে। এরপর নিয়মিত তিলাওয়াত, হিফয, তাদাব্বুর, আত্মশুদ্ধি, কুরআনের ওপর আমল ও নিয়মিত মুরাজাআহর মাধ্যমে এই সম্পর্ক পরিপূর্ণতা লাভ করে। এভাবেই কুরআনের হক যথাযথভাবে আদায় হয়।
কুরআন কেবল তিলাওয়াতের গ্রন্থ নয়; বরং এটি জীবনের পথপ্রদর্শক, আত্মশুদ্ধির মাধ্যম এবং দুনিয়া-আখিরাতের সফলতার দিশারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআনকে বুঝে পড়া, তার ওপর আমল করা এবং এর আলোকে জীবন পরিচালনার তাওফীক দান করুন। আমীন।