তখন ব্রিটিশের রাজত্ব , মুলত হিন্দুরাই ছিল তখন শিক্ষা দিক্ষায় উন্নত ও সমৃদ্ধ । বিভিন্ন কারনে এ দেশের মুসলমানরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল । মুসলমানদের এই অভিশাপ থেকে মুক্ত করার জন্য কেরানীগঞ্জের শিক্ষানুরাগী কতিপয় বেক্তিত্ত সমাজে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে সচেষ্ট হন এবং এই লক্ষে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন । এর নাম করন করা হয় “পারজোয়ার মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনি” । এই অন্যতম সদস্য ছিলেন মোঃ জালাল উদ্দিন (পট
কাজোর), আলহ্বাজ মোঃ তোঁতা মিয়া (পটকাজোর), অধ্যাপক মিরজাহান (পটকাজোর), আলহ্বাজ মোঃ আঃ কাদের, প্রমুখ বেক্তি বর্গ ।
১৯১৭ সালে বর্তমান বিদ্যালয় গৃহের উত্তর ভবনের স্থানে একটি মাদ্রাসা গড়ে ওঠে । অটিই ছিল বিদ্যালয়ের প্রথম ভীত । কিন্তু ২০ এর দশকের শেষের দিকে মাদ্রাসাটি ঝিমেয়ে পড়ে । ১৯২৯ সালে তথকালিন যুব সমাজ এটিকে “কালিন্দী এম.ই.(মিডিল ইংলিশ) স্কুল” নামে রুপান্তর করেন এবং ১ম থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণী পযর্ন্ত পাঠদানের ব্যবস্থা করেন । ১৯৩৫ সালে প্রবীণ ও নবীন দের যৌথ উদ্যোগে এটি “কালিন্দী হাই স্কুল” নামে প্রতিষ্ঠা লাভ করে । এ সময় ১ম থেকে ১০ম শ্রেণী পযর্ন্ত ক্লাশ শুরু হয় ।
জনাব হাজী মোঃ বানী ইব্রাহীম, জনাব হাজী মোঃ ফায়েজ হোসেন বেপারী, জনাব হাজী মোঃ আঃ মজিদ বেপারী, জনাব হাজী মোঃ আঃ কুদ্দুস বেপারী, জনাব হাজী মোঃ আঃ খালেক, জনাব মোঃ শফি বেপারী, জনাব মোঃ জয়নাল বেপারী প্রমুখ ব্যাক্তি বর্গ নেতৃত্ব দিয়ে বিদ্যালয়টিকে নতুন করে গড়ে তোলেন । এ সময় প্রধান শিক্ষক ছিলেন বাবু জ্ঞান চন্দ্র মিত্র বি.এস.সি (বিদ্যালয়ের ১ম প্রধান শিক্ষক) । এ সময় জনাব মোঃ মুসলেম উদ্দিন (মাস্টার) বিদ্যালয়ের প্রয়জনিও কাগজ পত্র তৈরি ও বিভিন্ন অফিসে দৌড়ো-দৌড়ি করে বিদ্যালয়ের অনেক জটিল কাজ সমাধা করেন । আবার ১৯৩৬ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন জনাব হেলাল উদ্দিন এম.এ.বিটি. সাহেব ।
এ সময় নেকরোজবাগ-এ কতিপয় বিদ্যানুরাগী ব্যাক্তির উদ্যোগে “পারজোয়ার এইচ. ই. বিদ্যালয়” নামে অপর একটি বিদ্দালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে । এ বিদ্দালয়টির প্রধান শিক্ষক ছিলেন জনাব মোঃ আলাউদ্দিন চাকলাদার । এ বিদ্যালয়টিতে ৮ম শ্রেণী পযর্ন্ত পাঠ দানের ব্যাবস্থা ছিল । ১৯৩৫ সালে এ বিদ্যালয়টিতে ১০ম শ্রেণী পযর্ন্ত পাঠ দান করা হয় । জনাব মোঃ আলাউদ্দিন সাহেব নিজের জমি বিদ্যালয়ের নামে লিখে দেন এবং নিজের টাকা ব্যায়ে বিদ্যালয়গৃহ নির্মাণ করেন ।
এ সময়টিতেই “কালিন্দী হাই স্কুল” ও “পারজোয়ার এইচ. ই. বিদ্যালয়” তুমুল প্রতিযোগিতায় নেমে পরে । উভয় কমিটি ছাত্র সংগ্রহে তথপর হন ।
এতো কাছাকাছি দুটি স্কুল চলতে পারেনা, তাই ১৯৩৮ সালে তৎকালিন ঢাকা বোর্ডের সেক্রেটারি জে. এন. রায় উভয় স্কুলের কমিটি দের নিয়ে বৈঠকে বসেন এবং সিদ্ধান্ত দেন যে, “পারজোয়ার এইচ. ই. বিদ্যালয়” ১ম থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণী পযর্ন্ত এবং “কালিন্দী হাই স্কুল” ৫ম থেকে ১০ম শ্রেণী পযর্ন্ত চলবে । ১৯৩৯ সালে “কালিন্দী হাই স্কুল” থেকে ১ম হাইস্কুল এক্জমিনিশন পরিক্ষায় ১৫ জন ছাত্র অংশ গ্রহন করে । কৃতকার্জ হন ৯ জন, ১ জন ১ম বিভাগে, ৫ জন ২য় বিভাগে এবং ৩ জন ৩য় বিভাগে উত্তীর্ণ হন ।
১৯৩৮ সালে ঢাকা বোর্ডের তথকালিন চ্যায়ারম্যান সাহেব, পুনরায় উভয় কমিটিকে ডেকে দুটি স্কুলকে একটি স্কুল এ পরিনত করার পরামর্শ দেন । তাই আঞ্চলিকতার স্বার্থে উভয় কমিটিগণ দুটি স্কুলকে একটি স্কুল এ পরিনত করেন এবং এর নাম দেন “পারজোয়ার কালিন্দী হাই স্কুল” । এ সময় কালিন্দী হাই স্কুল এর প্রধান শিক্ষক ছিলেন জনাব মোঃ মজিবর রহমান এবং “পারজোয়ার এইচ. ই. বিদ্যালয়” এর প্রধান শিক্ষক ছিলেন জনাব মোঃ নিয়াজ উদ্দিন । এদের দুজনই প্রধান শিক্ষক হওয়ার জন্য দরখাস্ত করলে জনাব মোঃ নিয়াজ উদ্দিন দরখাস্ত তুলে নেন এবং জনাব মোঃ মজিবর রহমান সাহেব এম.ই.বিটি. প্রধান শিক্ষক এর দায়িত্ব গ্রহন করেন ।
এ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যিনি প্রথমে এগিএ আসেন তিনি হচ্ছেন দানবীর হাজ্বি মোঃ বানী ইব্রাহীম (কালিন্দী) । তিনি মুক্ত হস্তে জমি ও অর্থ দান করে গেছেন । ছাত্র/ছাত্রী রা যাতে ঠিক মত স্কুলে আসতে পারে সেজন্য তিনি স্কুল থেকে উত্তরে বুড়িগঙ্গা নদীর ঘাঁট পযর্ন্ত একটি রাস্তা নির্মাণ করে দেন ।
এরপর “পারজোয়ার কালিন্দী হাই স্কুল” চালু করার পর হাল ধরেন জনাব আলহাজ্ব মোঃ ফায়েজ হোসেন (আমিরাবাগ) । তিনি রাতে হারিকেন জালিয়ে সঙ্গিদের সাথে নিয়ে ছাত্র সংগ্রহের কাজে ব্যাস্ত থাকতেন । তাছাড়া তাঁর বাড়ীতে ১৫/২০ জন ছাত্র রাখতেন, এবং তাদের সকল খরচ তিনি নিজেই দিতেন ।
পরবর্তী পর্যায়ে এক দানবিরের কথা উল্লেখ ন আকরলেই ন্য় । এক সময় স্কুলের অবস্থা যখন জীর্ণ-শীর্ণ, আর্থিক সঙ্কটে স্কুল চালান প্রায় সম্ভব ছিলনা, শিক্ষকগনের ৭ মাসের বেতন বাকি এবং রিজার্ভ ফান্ড শূন্য, তখন দানবীর হয়ে এগিএ আসেন হাজ্বি মোঃ বদর উদ্দিন (আমিরাবাগ) । তিনি তাঁর স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে শিক্ষকদের বেতন দেন এবং রিজার্ভ ফান্ডে টাকা জমা দিয়ে স্কুলটিকে স্বীকৃতি বন্ধের হাত থেকে রক্ষা করেন ।
এছাড়া মোঃ জালাল উদ্দিন সাহেব স্কুলটির জন্য তাঁর স্বরবস্ব বিলিয়ে দেন । পরিমিত জমি, এমনকি নিজ বাসগৃহে নিজ অর্থে বিদ্যালয়ের প্রাসাদ তুল্ল গৃহ নির্মাণ করেন । কথিত আছে যে, তিনি এই বিদ্দালয়কে দান করতে যেয়ে দেউলিয়া হয়ে পরেন ।
পঞ্চাশের শেষের দিকে, এই বিদ্যালয়টির জন্য যারা এগিএ আসেন, তারা হলেন জনাব হাজ্বি মোঃ বদর উদ্দিন (আমিরাবাগ), জনাব হাজ্বি মোঃ নাসির উদ্দিন (বরিশুর), জনাব হাজ্বি মোঃ আলহাজ আলী (খাগাইল), জনাব হাজ্বি মোঃ আঃ কুদ্দুস (কুশাইরবাগ), জনাব হাজ্বি মোঃ জান শরিফ (কালিন্দী), মোঃ এমলাক খান (কালিন্দী), মোঃ শফি বেপারী (আমিরাবাগ), মোঃ গিয়াস উদ্দিন (আমিরাবাগ) ।
এ সময়ে শিক্ষক হিসেবে অবদান রাখেন জনাব মোঃ শাজেদুল হক বি.এ.বিটি. । তিনি সরকারী চাকরি ইস্তফা দিয়ে কম বেতনে এই স্কুলে চাকরি করেন । ১৯৫৪-৫৮ সালের মাঝমাঝি জনাব মোঃ নাসির উদ্দিন বি.এস.সি. প্রধান শক্ষকের দায়িত্ব গ্রহন করেন ।
এভাবেই প্রতিষ্ঠানটি আপন গতিতে চলতে থাকে । ১৯৬৬ সালে বিদ্দালয়ে বিজ্ঞান বিভাগ চালু হয় । ১৯৭০ সালে কতিপয় ছাত্র নেতার প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়ের “ড্রেস” সিস্টেম চালু হয় ।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হবার পর শুরু হয় দেশ গড়ার কাজে আত্বনিয়গের পালা । তখন কালিন্দী হাই স্কুল ভবনেই “কেরানীগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়” নামে নতুন স্কুল চালু হয় । তখন বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শক্ষকের দায়িত্ব গ্রহন করেন জনাব অ্যাডভোকেট আবুল কালাম বি.এম.এল.এল.বি সাহেব । আর বালক বিভাগের প্রধান ছিলেন জনাব মোঃ রজ্জব আলী সাহেব । পরে বালিকা বিভাগের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত পান মিসেস সালেহা বেগম এবং এর পর বাবু প্রেমানন্দ সরকার । ১৯৮৫ সালে “কেরানীগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়” স্থানান্তরিত হয়ে এক মনোরম পরিবেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ।
এভাবেই “পারজোয়ার কালিন্দী হাই স্কুল” চলছে তাঁর নিজ গতিতে । (সংক্ষেপিত)
( ১৯৯৩ সালে “পারজোয়ার কালিন্দী হাই স্কুল” এর প্রকাশিত ম্যাগাজিন “প্রভা” থেকে সংগৃহীত )