05/10/2026
বিশ্ব শিক্ষক দিবস: প্রদীপ থেকে প্রজন্মান্তরে
~ প্রফেসর ড. নজরুল ইসলাম খান
৫ অক্টোবর—বিশ্ব শিক্ষক দিবস।
ক্যালেন্ডারের একটি তারিখমাত্র নয়; এটি পৃথিবীর সেই মানুষগুলোর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার দিন, যাঁরা অন্যের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে গিয়ে নিজের বর্তমানকে বিসর্জন দেন। একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের অক্ষর পড়ান না; তিনি মানুষের ভেতরে মানুষ হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলেন। একটি শিশুর চোখে যে স্বপ্নের প্রথম আলো জ্বলে, তার পেছনে প্রায়ই থাকে কোনো এক শিক্ষকের মমতাময় হাত।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষাকে দেখেছিলেন প্রাণের সঙ্গে প্রাণের সংযোগ হিসেবে। তাঁর ভাষায়, “মানুষ মানুষের কাছ হইতেই শিখিতে পারে; যেমন জলের দ্বারাই জলাশয় পূর্ণ হয়, শিখার দ্বারাই শিখা জ্বলিয়া উঠে, প্রাণের দ্বারাই প্রাণ সঞ্চারিত হইয়া থাকে” (ঠাকুর, ১৯২৬)।
এই একটি বাক্যেই শিক্ষকতার গভীরতম সত্য যেন ধরা পড়ে। শিক্ষা কেবল তথ্যের আদান-প্রদান নয়; এক প্রাণ থেকে আরেক প্রাণে আলো সঞ্চারের নামও শিক্ষা।
সভ্যতার শুরু থেকেই জ্ঞান এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে। আর সেই প্রবাহের অন্যতম প্রধান বাহক শিক্ষক। তবে শিক্ষক কখনো কেবল জ্ঞানের বাহক ছিলেন না; তিনি মূল্যবোধের নির্মাতা, বিবেকের প্রহরী এবং মানবিকতার পথপ্রদর্শক।
কাজী নজরুল ইসলামের শিক্ষাচিন্তাতেও ছিল মুক্তবুদ্ধি, প্রাণশক্তি ও মানবিকতার আহ্বান। শিক্ষা মানুষের দেহ-মন, চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে বিকশিত করবে—নজরুলের শিক্ষাভাবনায় এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই বিশেষভাবে উজ্জ্বল।
‘শিখা’ পত্রিকার অমর বাণী—“জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব”—আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু তথ্য সঞ্চয় নয়; চিন্তার স্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধির বিকাশও তার অপরিহার্য অংশ।
আজ প্রযুক্তি মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে অগণিত তথ্য। একটি মোবাইল ফোনেই মুহূর্তে পাওয়া যায় হাজার হাজার বই, বক্তৃতা, গবেষণা ও জ্ঞানভাণ্ডার। তবু প্রযুক্তি শিক্ষককে অপ্রয়োজনীয় করে দিতে পারেনি।
কারণ তথ্য পাওয়া যায় প্রযুক্তিতে; কিন্তু তথ্যকে জ্ঞান এবং জ্ঞানকে প্রজ্ঞায় রূপ দেওয়ার শিক্ষা পাওয়া যায় একজন সত্যিকারের শিক্ষকের কাছে।
John Dewey-এর শিক্ষাদর্শে শিক্ষা কোনো ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য কেবল প্রস্তুতি নয়; শিক্ষা নিজেই জীবনের চলমান প্রক্রিয়া—“education, therefore, is a process of living and not a preparation for future living” (Dewey, 1896)।
একজন ভালো শিক্ষক তাই শুধু বলেন না—কী শিখতে হবে; তিনি শেখান কীভাবে ভাবতে হয়। তিনি সব প্রশ্নের উত্তর দেন না; বরং কখনো এমন একটি প্রশ্ন রেখে যান, যার উত্তর খুঁজতে একজন শিক্ষার্থী সারাজীবন পথ হাঁটে।
Nelson Mandela শিক্ষার শক্তিকে দেখেছিলেন আরও বৃহত্তর পরিসরে। তাঁর বিখ্যাত বক্তব্য—“Education is the most powerful weapon which you can use to change the world” (Mandela, 2017)।
পৃথিবীকে পরিবর্তন করার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র যদি শিক্ষা হয়, তবে সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারিগর হলেন শিক্ষক।
একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় অর্জন তাঁর নিজের পরিচিতি নয়; তাঁর শিক্ষার্থীর সাফল্য। যে শিক্ষার্থী একদিন শ্রেণিকক্ষের শেষ বেঞ্চে বসে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত ছিল, কোনো একদিন যখন সে নিজের পরিচয়ে দাঁড়িয়ে বলে—“আমার শিক্ষক আমাকে পথ দেখিয়েছেন”—তার চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে?
রবীন্দ্রনাথের অমর প্রার্থনা যেন শিক্ষারও এক চিরন্তন স্বপ্ন—
“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির” (ঠাকুর, ১৯০১)।
শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য এমন মানুষ তৈরি করা, যার মন মুক্ত, বিবেক জাগ্রত এবং চিন্তা স্বাধীন।
কিন্তু এই মহান পেশার মানুষটির জীবন সবসময় মর্যাদা ও নিরাপত্তায় আবৃত নয়। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থার বহু শিক্ষক এখনো পেশাগত নিরাপত্তা, আর্থিক নিশ্চয়তা, প্রশিক্ষণ, সুযোগ-সুবিধা ও যথাযথ মর্যাদার নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।
বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষকরা বহন করেন আরও একটি বিশেষ দায়িত্ব। তাঁরা শুধু শিক্ষক নন; তাঁরা শিক্ষক তৈরির কারিগর। ভবিষ্যৎ শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষের জন্য প্রস্তুত করা, শিক্ষাতত্ত্বকে বাস্তব পাঠদানের দক্ষতায় রূপ দেওয়া এবং একজন প্রশিক্ষণার্থীকে আত্মবিশ্বাসী শিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বও তাঁদের কাঁধে।
অতএব, যাঁরা শিক্ষক তৈরি করেন, তাঁদের মর্যাদা, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও শিক্ষা উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত।
এখানেই বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য।
২০২৬ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য—“Standing with teachers: 60 years of protecting the profession, advancing its status and shaping our futures”—শিক্ষক পেশার মর্যাদা, সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার আহ্বান জানাচ্ছে। এ বছর ১৯৬৬ সালের ILO/UNESCO Recommendation concerning the Status of Teachers-এর ৬০ বছর পূর্তিও হচ্ছে (UNESCO, 2026)।
শিক্ষার মান নিয়ে আমরা যত কথা বলি, শিক্ষকের মানোন্নয়ন নিয়ে তার চেয়ে কম কথা বললে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা কখনো বাস্তব হবে না। একজন প্রশিক্ষিত, মর্যাদাবান ও নিরাপদ শিক্ষকই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে একটি প্রজন্মকে পথ দেখাতে পারেন।
শিক্ষককে উন্নত না করে শিক্ষাকে উন্নত করা যায় না।
আমরা প্রায়ই বলি—জাতির ভবিষ্যৎ শ্রেণিকক্ষে তৈরি হয়। কথাটি সত্য হলে শ্রেণিকক্ষের সেই নির্মাতাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে।
যে হাত শিশুর হাতে বই তুলে দেয়, সেই হাত যেন বঞ্চনার ভারে ক্লান্ত না হয়। যে কণ্ঠ শিক্ষার্থীকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়, সেই কণ্ঠ যেন নিজের অধিকার নিয়ে দীর্ঘশ্বাসে থেমে না যায়।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস তাই শুধু ফুল দেওয়া, শুভেচ্ছা জানানো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু সুন্দর কথা লেখার দিন নয়; এটি আত্মজিজ্ঞাসারও দিন।
আমরা আমাদের শিক্ষকদের কতটা সম্মান করি?
তাঁদের পেশাগত মর্যাদা কতটা নিশ্চিত করেছি?
শিক্ষক প্রশিক্ষণকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছি?
যাঁরা অন্যের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে আমরা কতটা দায়িত্বশীল?
একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন, তাঁর সঙ্গে প্রবেশ করে একটি জাতির আগামীকাল। তাঁর হাতে শুধু কলম থাকে না; থাকে একটি প্রজন্মের স্বপ্ন। তাঁর একটি বাক্য, একটি উৎসাহ, একটি বিশ্বাস কখনো কখনো একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।
তাই শিক্ষককে সম্মান করা মানে শুধু একজন মানুষকে সম্মান করা নয়; ভবিষ্যৎকে সম্মান করা।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো শিক্ষক তাঁর ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদার জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন না; বরং নিশ্চিন্ত মনে শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে একটি প্রজন্মের স্বপ্ন নির্মাণ করবেন।
আমরা এমন একটি শিক্ষা-ব্যবস্থা চাই, যেখানে প্রতিষ্ঠানের ধরন শিক্ষককে ভাগ করবে না; যোগ্যতা, দায়িত্ব, দক্ষতা ও অবদানই হবে মর্যাদার প্রধান ভিত্তি।
কারণ—
একজন শিক্ষক চলে যান, তাঁর শিক্ষা থেকে যায়।
একজন শিক্ষক অবসর নেন, তাঁর আদর্শ অবসর নেয় না।
একজন শিক্ষক পৃথিবী ছেড়ে যান, তাঁর জ্বালানো আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্বলতে থাকে।
এই আলোই সভ্যতার আলো।
এই আলোই মানবতার আলো।
এই আলোই শিক্ষার আলো।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে
পৃথিবীর সকল শিক্ষককে জানাই অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আন্তরিক শুভেচ্ছা।
শ্রদ্ধা তাঁদের প্রতি, যাঁরা জ্ঞানের আলো জ্বালান।
শ্রদ্ধা তাঁদের প্রতি, যাঁরা অন্ধকারে পথ দেখান।
শ্রদ্ধা তাঁদের প্রতি, যাঁরা একটি শিশুর স্বপ্নকে বিশ্বাস করতে শেখান।
শ্রদ্ধা তাঁদের প্রতি, যাঁরা নিজের জীবন দিয়ে অন্যের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন।
শিক্ষক বেঁচে থাকুন মর্যাদায়,
শিক্ষা এগিয়ে যাক মানবিকতায়,
প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ হোক জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত,
আর সেই আলো ছড়িয়ে পড়ুক—প্রদীপ থেকে প্রজন্মান্তরে।
বিশ্বের সকল শিক্ষককে
বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬-এর
শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আন্তরিক শুভেচ্ছা।
© লেখক:
প্রফেসর ড. নজরুল ইসলাম খান
অধ্যক্ষ, ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন কলেজ
ধানমন্ডি-৮, ঢাকা
এবং
সভাপতি
বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ শিক্ষক সমিতি