13/05/2026
কিছু পেশা আছে, যেগুলো মানুষ শুধু জীবিকার জন্য বেছে নেয় না; বরং ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের মানুষটিকেও সেই পেশার আলোয় আবিষ্কার করে। শিক্ষকতা ঠিক তেমনই এক যাত্রা—যেখানে প্রতিদিন মানুষ অন্যকে শেখাতে শেখাতে নিজের ভেতরও নতুন এক বোধের জন্ম হতে দেখে।
শুরুতে একজন প্রশিক্ষণার্থী মনে করেন, শিক্ষক হওয়া মানে হয়তো পাঠ্যবই ভালোভাবে জানা। কিন্তু যখন তিনি প্রথমবার কোনো শ্রেণিকক্ষে দাঁড়ান, তখন বুঝতে পারেন—জ্ঞান একা কখনও যথেষ্ট নয়। একটি ক্লাসরুম আসলে বহু আলাদা মন, বহু ভিন্ন স্বপ্ন আর নীরব সংকোচের সমষ্টি। সেখানে একই বাক্য একজন শিক্ষার্থীর মনে আলো জ্বালায়, আবার আরেকজনের কাছে সেটি শুধুই শব্দ হয়ে থেকে যায়। আর এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো বুঝতে শেখার জায়গাটিই হলো টিচিং প্র্যাকটিস।
এখানে একজন মানুষ শুধু পাঠদান করেন না; তিনি মানুষের মন পড়তে শেখেন। কখন ক্লাসে গতি বাড়াতে হয়, কখন থেমে যেতে হয়, কখন একটি উদাহরণ পুরো বিষয়টিকে সহজ করে দেয়—এসব কোনো বই শেখায় না। এগুলো আসে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে, শিক্ষার্থীদের চোখের ভাষা পড়ে পড়ে।
প্রথম কিছু দিন ভীষণ অদ্ভুত লাগে। নিজের কণ্ঠস্বরও তখন অপরিচিত মনে হয়। মনে হয়, সবাই যেন তার প্রতিটি ভুল লক্ষ্য করছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ভয় ধীরে ধীরে বদলে যায় এক ধরনের নীরব স্থিরতায়। তখন তিনি বুঝতে শুরু করেন, একজন ভালো শিক্ষক কখনও নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা করেন না; বরং প্রতিদিন একটু বেশি মানবিক, একটু বেশি মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করেন।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, টিচিং প্র্যাকটিস একজন মানুষকে বিনয়ী হতে শেখায়। কারণ শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, শেখানো আসলে একমুখী কিছু নয়। শিক্ষক যেমন শিক্ষার্থীকে শেখান, শিক্ষার্থীরাও তেমনি শিক্ষককে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। কখনও একটি সাধারণ প্রশ্ন, কখনও একটি নির্ভেজাল কৌতূহল—একজন শিক্ষকের বহু পুরোনো ধারণাকেও নতুন করে নাড়িয়ে দেয়।
যে প্রতিষ্ঠান এই অভিজ্ঞতার জন্য একটি সহানুভূতিশীল ও বাস্তবভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করে, তারা শুধু শিক্ষক তৈরি করে না; তারা এমন মানুষ গড়ে তোলে, যারা ভবিষ্যতের প্রজন্মের চিন্তা ও মূল্যবোধ নির্মাণে ভূমিকা রাখবে। আইইসি সেই বিশ্বাসেরই একটি নাম, যেখানে শিক্ষা কেবল সনদের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস, ব্যক্তিত্ব ও দায়বোধের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে ওঠে।
শেষ পর্যন্ত শিক্ষকতা কোনো পেশাগত পরিচয়ের নাম নয়। এটি এমন এক নীরব সাধনা, যেখানে প্রতিদিন একটু একটু করে মানুষ নিজেকেই আলোকিত করতে শেখে—আর সেই আলোই একসময় ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনে।
© ডক্টর নজরুল ইসলাম খান
অধ্যক্ষ, আইইসি, ধানমণ্ডি, ঢাকা।