08/07/2026
বুবি আর নেই।
তাঁকে ঘুম থেকে তুলে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর কাছে ছিল ৪০ হাজার টাকা ২৫ বছরের কষ্টের সঞ্চয়। ভিক্ষা করে, প্ল্যাটফর্ম পরিষ্কার করে, মানুষের অবহেলা আর করুণার টুকরো টুকরো অংশ জুড়ে তিনি এই টাকা জমিয়েছিলেন। সেই টাকাও আর নেই। খুনিরা নিয়ে গেছে।
মৃত্যুর আগে ক্ষতবিক্ষত মুখ নিয়ে বুবি স্টেশনের একটি চেয়ারে নিশ্চুপ বসে ছিলেন। চোখে ছিল না অভিযোগ, না প্রতিরোধ—শুধু এক নিঃশব্দ শূন্যতা।
এমনিতেই সত্তর বছরের অধিকাংশ মানুষের পৃথিবীর কাছে নতুন করে কিছু বলার থাকে না। দীর্ঘ জীবন তাঁদের এতটাই ক্লান্ত করে দেয় যে, নতুন কোনো শব্দ বহন করার শক্তিও আর অবশিষ্ট থাকে না।
কিন্তু বুবির গল্প ছিল আরও গভীর।
তিনি সত্তর বছরের জীবনে কোনোদিন একটি অর্থপূর্ণ বাক্যও বলতে পারেননি। তিনি ছিলেন বাক্প্রতিবন্ধী। তাই আজ প্রশ্ন জাগে যদি তিনি কথা বলতে পারতেন, তাহলে কী বলতেন?
যখন টাকার জন্য তাঁকে মারা হচ্ছিল, তখন তিনি কাকে ডাকতে চেয়েছিলেন? মাকে? বাবাকে? নাকি আল্লাহকে? কিংবা এমন কাউকে, যার কাছে তিনি কোনোদিন ফিরতে পারেননি?
আসলে বুবির ধর্ম কী ছিল? তাঁর বাড়ি কোথায় ছিল? কে ছিল তাঁর আপনজন?
প্রায় ২৫ বছর আগে তিনি একদিন ট্রেনে চেপে মেথিকান্দা স্টেশনে এসে নেমেছিলেন। কোথা থেকে এসেছিলেন? কেন এসেছিলেন? কোনো অভিমান নিয়ে? নাকি কোনো অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে পালিয়ে?
আর তারপর কেন তিনি আর ফিরে গেলেন না?
তিনি কি এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে ক্লান্ত হয়ে এখানেই থেমে গিয়েছিলেন? নাকি প্রতিদিন কারও ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন? হয়তো মৃত্যুর অপেক্ষায়।
২৫ বছরে তিনি জমিয়েছিলেন মাত্র ৪০ হাজার টাকা। হিসাব করলে প্রতিদিন গড়ে ৪ টাকা ৩৮ পয়সা।
এই টাকাগুলো দিয়ে তিনি কী করতে চেয়েছিলেন?
এক টুকরো জমি কিনবেন? একটা ছোট্ট ঘর বানাবেন? কোনো হারিয়ে যাওয়া আপনজনের হাতে তুলে দেবেন? নাকি নিজের কবরের জন্য একটু জায়গা কিনে রাখবেন?
আমরা কোনোদিনই জানব না।
কারণ বুবি কোনো উত্তর দিয়ে যাননি।
যেমন নীরবে তিনি মেথিকান্দা স্টেশনে এসেছিলেন, তেমনি নীরবেই চলে গেলেন। হয়তো অনেকদিন কেউ খেয়ালই করবে না যে, প্রতিদিন প্ল্যাটফর্মে হাঁটা সেই পুরোনো দুই পা আর সেখানে নেই।
বুবির জন্য কোনো শোকসভা হবে না।
তাঁর হত্যার বিচার চেয়ে রাজপথে কোনো মিছিল হবে না।
সম্ভবত তাঁর কবরেও কোনো নাম লেখা থাকবে না।
কিছুদিন পর আমরা সবাই তাঁকে ভুলে যাব।
কিন্তু ভুলে যাওয়ার আগে অন্তত একবার নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত—
কেন এমন একটি দেশে আমরা বাস করছি, যেখানে একজন অসহায়, বাক্প্রতিবন্ধী বৃদ্ধাকে মাত্র ৪০ হাজার টাকার জন্য পিটিয়ে হত্যা করা যায়?
কেন স্টেশনে বসবাস করা মানুষগুলোর জীবন এতটাই মূল্যহীন?
তাঁরা কি মানুষ নন?
নাকি আমাদের চোখে তাঁদের জীবন, স্বপ্ন, কষ্ট আর মৃত্যুর কোনো মূল্যই নেই?
বুবি চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর নীরবতা আমাদের বিবেকের সামনে আজীবন এক অসহনীয় প্রশ্ন হয়ে রয়ে যাবে।