14/09/2026
বনলতা সেন: বনলতা আসলে কে?
“বনলতা সেন কে?”
প্রশ্নটা খুব সহজ। উত্তরটা হয়তো নয়।
মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের বনলতা সেন শুরু থেকেই দর্শককে কোনো সরল গল্প শোনাতে চায় না; বরং একটা রহস্যের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। একজন মানুষ বনলতাকে খুঁজছে। কিন্তু যত এগোনো যায়, ততই মনে হয়, সে কি সত্যিই একজন নারীকে খুঁজছে, নাকি এমন কোনো আশ্রয়কে, যার অস্তিত্ব হয়তো কেবল কবিতাতেই?
মহীন,দুর্লভ বইয়ের এক বিক্রেতা,এই অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু। তার পথের সঙ্গে ধীরে ধীরে মিশে যায় জীবনানন্দ দাশের জীবন, তাঁর প্রেম, তাঁর একাকিত্ব, তাঁর স্মৃতি এবং তাঁর কবিতার পৃথিবী। ফলে একসময় মহীন আর জীবনানন্দের মধ্যে সীমারেখাটাই অস্পষ্ট হয়ে আসে। কে কাকে খুঁজছে—মহীন বনলতাকে, নাকি জীবনানন্দ নিজের কবিতার ভেতর হারিয়ে যাওয়া কোনো মানুষকে?
আর এখানেই সিনেমাটির সবচেয়ে সুন্দর খেলাটা শুরু হয়।
বনলতা কি শোভনা? বিশাখা? মুনিয়া? হেলেন? নাকি তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই ছড়িয়ে থাকা একটি অনুভূতি?
ছবিটি কোনো সহজ উত্তর দেয় না।
বরং জীবনানন্দের কবিতার মতোই কিছু ছবি ছুড়ে দেয় দর্শকের দিকে: মহীনের ঘোড়া, কার্তিকের জ্যোৎস্না, ফড়িং, ইঁদুর, পাখির নীড়ের মতো চোখ, লাশকাটা ঘর, কমলালেবু। এগুলো শুধু দৃশ্য নয়; মনে হয় কবিতার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা কিছু অসম্পূর্ণ স্মৃতি। ক্যামেরা যখন এই প্রতীকগুলোর মধ্য দিয়ে হাঁটে, তখন সিনেমা আর প্রচলিত গল্প থাকে না। একটি দীর্ঘ, বিষণ্ন কবিতা হয়ে ওঠে।
খায়রুল বাসারের জীবনানন্দ নিঃসঙ্গ। খুব বেশি কথা বলেন না, কিন্তু তাঁর নীরবতার মধ্যেই যেন সবচেয়ে বেশি শব্দ। অন্যদিকে সোহেল মণ্ডলের মহীন চরিত্রটি সেই নীরবতার আধুনিক প্রতিধ্বনি। আর মাসুমা রহমান নাবিলার বনলতা—সে যতটা দৃশ্যমান, তার চেয়ে অনেক বেশি রহস্যময়।
তবে বনলতা সেন নিখুঁত নয়। কোথাও কোথাও গতি ধীর হয়ে যায়, কিছু দৃশ্য প্রয়োজনের চেয়ে দীর্ঘ মনে হয়। বাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার মধ্যে যাতায়াতও সবসময় সমান সাবলীল নয়। কিন্তু হয়তো এই অসম্পূর্ণতাই ছবিটির স্বভাবের সঙ্গে মিশে যায়।
কারণ এই সিনেমা আপনাকে গল্পের শেষটা জানাতে চায় না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা বদলে যায়।
বনলতা সেনকে পাওয়া গেল কি না—সেটা আর গুরুত্বপূর্ণ থাকে না। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, মানুষ কেন সারাজীবন একজন বনলতা সেনকে খুঁজে বেড়ায়।
হয়তো বনলতা কোনো নারী নন।
হয়তো তিনি সেই মানুষটির নাম, সেই জায়গাটির নাম, কিংবা সেই মুহূর্তটির নাম—যেখানে হাজার বছরের পথ হাঁটার পর একজন ক্লান্ত মানুষ একটু বসতে পারে।
আর তাই সিনেমা শেষ হওয়ার পরও প্রশ্নটা থেকে যায়,
“বনলতা সেন কে?”
হয়তো উত্তরটা পর্দায় ছিল না।
হয়তো উত্তরটা এতক্ষণ ধরে দর্শক নিজেই খুঁজছিলেন
সিনেমা : বনলতা সেন
তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর, বৃহ:স্পতিবার।
টাইম : বিকেল ৩.০০ টায়
ticket : https://forms.gle/pf3es21JhCX4G2YC8