01/12/2025
কেন আমরা আন্দোলন করছি—এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়, কিন্তু অত্যন্ত বাস্তব।
আমরা যারা সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার মান ধরে রাখি, দেশের ভবিষ্যৎ গড়ি, তারা যোগদানের সময়ই পরিষ্কারভাবে জেনেছিলাম—
আমাদের পদটি দশম গ্রেডভুক্ত, এবং নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ বছর চাকরি ও বিএড ডিগ্রি অর্জনের পর বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সহকারী প্রধান বা সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার পদে পদোন্নতির সুযোগ থাকার কথা।
কিন্তু সেই সুযোগ আজ ২০ থেকে ২৫ বছরেও কেউ পাচ্ছে না। এ বাস্তবতাই আন্দোলনের মূল কারণ।
আপনি আগের লেখায় “এবং”-এর পরের এই গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো বাদ দিয়েছেন—যা আমাদের ক্ষোভের জায়গাটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
টাইমস্কেল নিয়ে প্রতিশ্রুতি ছিল, বাস্তবে তার ছায়াও নেই
চাকরিতে যোগদানের আগে আমাদের জানানো হয়েছিল—
যাদের পদোন্নতি হবে না, তারা ৪টি টাইমস্কেল পাবেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—
একটাও টাইমস্কেল না পেয়ে অনেক শিক্ষক অবসরের দুয়ারে পৌঁছে গেছেন।
এটিও আগের লেখায় অনুল্লেখিত ছিল।
স্থায়ীকরণ ও ইনক্রিমেন্ট—যা জানানো হয়েছিল, তার কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি
২টি ইনক্রিমেন্ট যোগদানের সময় থেকেই পাওয়ার কথা ছিল।
২ বছরের মাথায় স্থায়ীকরণ হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু সত্য হলো—
৮ বছর কাজ করেও স্থায়ীকরণ হয়নি, ইনক্রিমেন্টের প্রতিশ্রুতিও অপূর্ণ।
এগুলো শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি আমাদের পেশাগত মর্যাদার ওপর আঘাত।
অনেকে কঠিন বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নন-ক্যাডার হয়েই এখানে যোগ দিয়েছেন
যে কথাটি অনেকেই জানেন না—
এই প্রতিষ্ঠানে থাকা অর্ধেক শিক্ষকই ৩৪তম, ৩৫তম, ৩৬তম, ৩৮তম, ৪১তম, ৪৩তম বিসিএস পরীক্ষায় প্রিলিমিনারি, লিখিত বা ভাইভা উত্তীর্ণ নন-ক্যাডার প্রার্থী, অর্থাৎ তারা দেশের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর বৈতরণী পার হয়েই এসেছেন।
তারা অযোগ্য নন—বরং যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েই এখানে অবস্থান করছেন।
‘আয়নদের স্কুলে’ কারা ক্লাস নিচ্ছেন?
অনেকে আবেগভরে শিক্ষার্থী আয়ানের পরীক্ষার তিন দিনের স্থগিত হওয়া নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন।
কিন্তু সেই আয়ানদের স্কুলগুলোর বাস্তবতা কী?
৮০% স্কুল সহকারী প্রধান ও প্রধানশূন্য—প্রশাসন চালান সিনিয়র শিক্ষকরা।
বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই—জুনিয়ররা তিনগুণ ক্লাস নিয়ে দায় সামলায়।
শিক্ষকরা পদোন্নতি, টাইমস্কেল, ইনক্রিমেন্ট—কিছুই না পেয়েও নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা, সহশিক্ষা, প্রশাসনিক দায়িত্ব সব চালিয়ে যান।
অর্থাৎ শিক্ষকরা নিজেদের অধিকার বঞ্চিত হয়েও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে স্কুল চালিয়ে যাচ্ছে—এটাই সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার শক্তি, মর্যাদা ও মানবিক দায়িত্ববোধের প্রমাণ।
সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার মূল শক্তি—তার শিক্ষকরা
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো দেশের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ও বৃহৎ শিক্ষাব্যবস্থা।
এখানেই—
সব শ্রেণির মানুষ সন্তানকে পাঠায়
মেধাবী, দক্ষ, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে কম সুবিধা নিয়েও কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন
শিক্ষার মান টিকিয়ে রাখা হয় সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও
সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকরা যদি দায়িত্ব না নিতেন, তাহলে আয়ানদের স্কুলে প্রশাসনই থমকে যেত—পরীক্ষা স্থগিত তো দূরের কথা।
এত কিছু করেও যখন শিক্ষকদের অবস্থার দিকে কেউ তাকায় না, তখন আমাদের আবেগ ক্ষয়ে যায়, ক্ষোভ জন্মায়।
কিন্তু মানুষ শুধু তখনই আবেগ দেখায়, যখন শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হয়—শিক্ষকদের বঞ্চনা নিয়ে নয়।
তাই আমরা বলি—আমরা বেকায়দায় পড়লে কেউ কাঁদে না, বরং অনেকে হাসে!
কারণ, শিক্ষকরা নাকি কষ্ট পেতেই জন্মেছেন!
শেষ কথা
আমরা আন্দোলন করছি দেশের শিক্ষা, নিজের অধিকার, এবং সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাকে টিকিয়ে রাখার জন্য।
যে সিস্টেম কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ে—সেই সিস্টেমের শিক্ষকরা যদি সম্মান না পান, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এটাই সত্য, এবং এটাই আমাদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা।