21/08/2021
আমাদের দেশে এখনো আগের যুগের মতই EEE, ECE, ETE এভাবে আলাদা নাম দিয়ে ডিপার্টেমেন্টগুলোকে আলাদা করে রাখা হয়েছে। মাঝে মাঝে এসব আন্ত-বিভাগীয় ডিপার্টমেন্টগুলোর শ্রেষ্ঠতা নিয়েও দেশের ভার্সিটিগুলোতে অর্থহীন বিতর্ক হয় ! এগুলো অনেকটা- ফরজ নাই নফল নিয়ে টানাহেঁচড়ার মত!
কেন, সেটা বলছি।
প্রিয় ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং এর শিক্ষার্থীগণ, চলো আজ আমি তোমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি নর্থ আমেরিকার আর আমাদের দেশীয় ভার্সিটির EEE এর কিছু দৃস্টিভংগী নিয়ে।
দু হাজার সালের শুরুতেই আধুনিক প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জোয়ার শুরু হবার সাথে সাথেই ইলেক্ট্রিক্যাল, ইলেক্ট্রনিক্স, কম্পিঊটার ইঞ্জিনিয়ারিং এর নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠে। তোমরা যতই উপরে দিকে অর্থাৎ PhD এর দিকে আসবে, ততই এদের নিবিড়তা দেখে আশ্চর্য হবে।
আমেরিকা ও কানাডার ভার্সিটিগুলোতে খেয়াল করবে EEE, ECE, ETE বলে আলাদা আলাদা কোনো ডিপার্টমেন্ট নেই। প্রযুক্তির এই নিবিড় সম্পর্কের জন্যে আমেরিকান ও ক্যানাডিয়ান ভার্সিটিগুলোতে দুদশক আগে থেকেই EEE এবং CSE দুটো ডিপার্টমেন্টকে একীভুত করে একটি মাত্র ডিপার্টমেন্ট Electrical & Computer Engineering এর প্রথা চালু হয়েছে।
ইলেক্ট্রিক্যাল এবং কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং এর গবেষণা ও এপ্লিকেশনের ক্ষেত্রগুলো ওভারল্যাপ করে। একারনেই মেশিন লার্নিং সহ অনেক কম্পিউটিং এলগরিদমের ব্যবহার সিগন্যাল প্রসেসিং, স্মার্ট পাওয়ার গ্রিড, কন্ট্রোল সিস্টেম, ওয়ারলেস কমিউনিকেশন, ন্যানোইলেক্ট্রনিক্স ফিল্ডে দুর্দান্ত ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আবার কম্পিঊটার ইঞ্জিনিয়ারিং এর ডিভাইস বানাতে প্রয়োজন হচ্ছে ইলেক্ট্রনিক্স সার্কিটের জ্ঞান।
তোমরা জানো আগামির দুনিয়া শাসন করবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার? বর্তমানের সকল ডিজিট্যাল কম্পিউটার ব্যাবেজীয় মেশিনের আধুনিকায়ন এবং ফিজিক্সের ল' মোতাবেক প্রেডিক্টিভ কম্পিউটিং মেনে চলে। কিন্ত কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রোব্যালিস্টিক কম্পিউটিং নীতি মেনে চলে। একটা ফিজিক্যাল কোয়ান্টাম কম্পিউটার বানাতে হলে অত্যন্ত শীতল তাপমাত্রায়( cryogenic) কাজ করে এমন ইলেক্ট্রনিক্স সার্কিট প্রয়োজন। এধরনের ক্রায়োজেনিক সার্কিট বানানো হয় ইলেক্ট্রনিক্স সার্কিটের নীতি ব্যবহার করে। তাহলেই এক্ষনে বুঝতে পারছো কেন কম্পিউটার ও ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং এতটা ওভারল্যাপ করে।
বাংলাদেশীয় ভার্সিটিগুলোর ব্যাচেলরে এধরনের একীভুতকরন এখনো না হয়ে উঠার কারনে তোমরা অনেকেই একটা ভুল থিম নিয়ে এবং অপ্রয়োজনীয় সুপিরিয়রিটি ফিলিংস নিয়ে গ্রাজুয়েশন শেষ করছো। দেশের জব মার্কেটে EEE বলতে পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোর এবং মোবাইল কোম্পানির জবই বোঝায়। যার জন্যে পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর স্টুডেন্টদের মধ্যে একটা ভুল সুপিরিয়রিটি কাজ করে।
সব শেষে চলো জেনে নেয়া যাক কিছু ইন্টারেস্টিং তথ্য। EEE এর জন্মসুত্র নিয়ে। EEE এর জন্মের ভিত্তি দুটো সুত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত : ওহমের সুত্র V=IR এবং কঞ্জারভেশন অব চার্জের অর্থাৎ চার্জকে সৃস্টি বা ধংস করা যায় না। এটা ফিজিক্সের শক্তির নিত্যতা সুত্রেরই একটা রূপ।
ওহমের সুত্র ছিল এক্সপেরিমেন্টাল ওব্জারভেশন। অর্থাৎ থিওরেটিক্যাল ভিত্তিটা ম্যাথ দিয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল না। ওহমের প্রায় ৫০ বছর পর স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল রিগোরাস ম্যাথেমেটিক্স দিয়ে ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক্সের সুচনা করেন যেটা ওহমের ছিল না। জানো কি, মুলত ওহমের V = IR সূত্রটি, ম্যাক্সওয়েলের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক্সের J = σE এর একটি বিশেষ রুপ!
আর কার্শফের যে দ্বিতীয় সুত্রটি আছে সেটা ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক্সের ইকুয়েশন অব কন্টিনিউটির একটি বিশেষ রুপ!
ম্যাক্সওয়েল এসে EEE এর চেহারা পালটে দিয়েছিল। ওর আগে সকল EEE অধিকাংশ সুত্রসমুহ বিক্ষিপ্ত ভাবে ছিল। কোনো রিগোরাস ম্যাথমেটিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক ছিল না EEE এর। পুরো EEE কে ম্যাক্সওয়েলের ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক্সের একটিমাত্র রিগোরাস ম্যাথ ফ্রেমওয়ার্ক দিয়ে বেধে ফেলা যায়। পাওয়ার ও কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্টরা যে সার্কিট থিওরি পড়ছো সবই ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক্স এর একটি বিশেষ রুপ। ভোল্টেজ ও কারেন্টের ফিজিক্যাল উৎপত্তি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড থেকে। একারনে EEE এর জন্মসুত্র ট্রেইস করলে ম্যাক্সওয়েলের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক্স এ এসে থামা যায়।
শেষ করতে করতে আরেকটি মজার তথ্য দিয়ে যাই। ম্যাক্সওয়েল তার অরিজিন্যাল ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক্সের লেখায় ভেক্টরের নোটেশন মধ্যযুগীয় প্যাঁচানো গোথিক স্টাইলের ফন্ট দিতেন। ওলিভার হেভিসাইড নামের এক ইঞ্জিনিয়ারের সেটা পছন্দ হয়নি। তিনিই আজকের মত করে ভেক্টর নোটেশন শুরু করেন। হেভিসাইডের হাত ধরেই impedance টার্মটার প্রচলন শুরু হয়! ঊনিই unit step function প্রচলন করেন! হেভিসাইড নিয়ে বললে এ লিখা আরো লম্বা হবে। আজ আর নয়।
আমার পিএইচডির রিসার্চ ফিল্ডও ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক্স নিয়েই। আমি রিসার্চ করি এন্টেনা ও ওয়ারলেস কমিউনেশন নিয়ে। স্পেইস-শিপ থেকে পৃথিবীতে সিগন্যাল পাঠানো, ওয়েস্টার্ন আর্মিদের জন্য হাই-টেক টেক্সটাইল এন্টেনা (আর্মিদের ড্রেসের কাপড়ে এন্টেনা), মানুষের শরিরে বায়ো-ইম্পল্যান্টাবল চিপ্স, ক্যান্সার ডিটেকশনের জন্য ডিভাইস থেকে সিগ্ন্যাল প্রেরনসহ সকল যোগাযোগে এখন ছোট ও স্মার্ট এন্টেনার ব্যবহার হয়। তাই আগের যুগের মত এন্টেনা মানে ছাদে বসানো ডিশ এন্টেনা, আর টিভির এন্টেনা এমন নয়!
আগামী লিখায় EEE এর বিভিন্ন অত্যাধুনিক রিসার্চ ফিল্ড নিয়ে লিখবো, আমারটা সহ। তোমরা যারা ভবিষ্যতে পিএইচডি মাস্টার্সে গবেষণা করতে চাও এতে কিছু আইডিয়া পাবে। এই ফিল্ডে কি কি মেজর গবেষণা হচ্ছে বর্তমানে। অনেক কিছুই জানতে পারবে। লিখাটি শেয়ার করতে পারো।
© Md Nazmul Hasan Topu, UBC, Canada