13/10/2026
একজন বিইউবিটিয়ান হিসেবে নিজের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এমন প্রশ্ন তুলতে ভালো লাগে না। কারণ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমাদের শুধু ডিগ্রির সম্পর্ক নয়; জড়িয়ে আছে আমাদের স্বপ্ন, পরিশ্রম, পরিবারের কষ্টার্জিত অর্থ এবং ভবিষ্যৎ। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এমন কিছু বিষয় সামনে এসেছে, যেগুলোর উত্তর না চেয়ে চুপ থাকাও নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়া।
প্রথম প্রশ্ন—বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও শিক্ষকতার দায়িত্ব নিয়ে।
আমাদের কাছে থাকা তথ্য ও নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের স্প্রিং, সামার ও ফল সেমিস্টারে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং কিছু ক্ষেত্রে সহকারী অধ্যাপকদের নিয়মিত কোর্সে পাঠদান না করার অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কোটি টাকারও বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে আমাদের দাবি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা দেওয়ার এবং তাঁদের ঘিরে একটি বিশেষ প্রভাববলয় গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।
প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিশ্চিত না করেই যদি শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দেওয়া হয়, তাহলে সেই অর্থের জবাবদিহি কে করবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থে ক্ষতি হলে তার দায় কার? এসব বিষয়ে কি নিরপেক্ষ তদন্ত হবে?
দ্বিতীয় প্রশ্ন—অতিরিক্ত ভাতা, বোনাস এবং আর্থিক বৈষম্য নিয়ে।
অভিযোগ রয়েছে, উপাচার্য মহোদয়ের পছন্দের কিছু কর্মচারী অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন না করেও অতিরিক্ত ভাতা পেয়েছেন। আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় সিন্ডিকেট বা ট্রাস্টি বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই পছন্দের কিছু কর্মচারীকে বোনাস দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকদের বেতন-ভাতার সঙ্গে নিয়মিত স্কেলে নিয়োগপ্রাপ্ত বা পদোন্নতিপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতার বিশাল পার্থক্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
আমরা জানতে চাই—কোন নীতিমালায় এসব সুবিধা দেওয়া হয়েছে? কোথায় অনুমোদন? বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে নিয়ম সবার জন্য সমান, নাকি পদ ও ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে আলাদা?
তৃতীয় প্রশ্ন—উপাচার্য, প্রভাববলয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে।
আমাদের কাছে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগ উঠেছে, উপাচার্য মহোদয়, কয়েকজন প্রভাবশালী শিক্ষক এবং কিছু ট্রাস্টি সদস্যের সমর্থনকে কেন্দ্র করে এমন একটি বলয় তৈরি হয়েছে, যার সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব রয়েছে। অভিযোগ আরও রয়েছে, কিছু আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। তাই প্রতিটি সিদ্ধান্তের অনুমোদন, আর্থিক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা হোক। আইন ও বিধিমালা সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হোক।
চতুর্থ প্রশ্ন—৫ আগস্ট ২০২৫-এর পর ৩১৩টি নিয়োগ নিয়ে।
আমাদের কাছে থাকা নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য ও নথি অনুযায়ী, ৫ আগস্ট ২০২৫-এর পর বিইউবিটিতে ৩১৩ জন নিয়োগের বিষয়টি সামনে এসেছে। আমাদের দাবি, এই নিয়োগগুলোর সঙ্গে গ্রিন ইউনিভার্সিটি, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি এবং হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা প্রার্থীদের ব্যাপক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশ উপাচার্য মহোদয়ের পূর্বপরিচিত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এখানে আমাদের প্রশ্ন অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া নিয়ে নয়। যোগ্য প্রার্থী যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আসতে পারেন। প্রশ্ন হলো—এই ৩১৩টি নিয়োগে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতাই কি প্রধান বিবেচ্য ছিল? নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ পরিচিতি বা পূর্বসম্পর্ক প্রভাব ফেলেছে কি না, তা কি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হবে?
আমরা চাই, ৩১৩টি নিয়োগের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, প্রার্থীদের প্রাসঙ্গিক যোগ্যতা, নিয়োগের উৎস, নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং অনুমোদনসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হোক। কারণ নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকলে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন হওয়ার কথা নয়।
পঞ্চম প্রশ্ন—বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ প্রোগ্রামার নিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিয়ে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ প্রোগ্রামার গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত দায়িত্ব পালন করেন। এই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা যাচাই করা অপরিহার্য।
আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট নিয়োগে প্রার্থীর সরাসরি পেশাগত অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একজন ফ্রিল্যান্সার হওয়া কোনো অযোগ্যতার প্রমাণ নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত পদে নিয়োগের সময় কী কী যোগ্যতা যাচাই করা হয়েছে? নিয়োগের মানদণ্ড কি প্রকাশ করা হবে?
বিইউবিটির নিজেরই এমন বহু গ্র্যাজুয়েট রয়েছেন, যাঁরা দেশি-বিদেশি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, এমনকি লিড প্রোগ্রামার ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত দায়িত্বেও রয়েছেন। তাহলে নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দক্ষ জনবল বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তাঁদের মতো যোগ্য প্রার্থীদের সুযোগ ও মূল্যায়ন কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে?
ষষ্ঠ প্রশ্ন—TA ও RA নিয়োগে বিইউবিটির শিক্ষার্থীরা কতটা সুযোগ পাচ্ছেন?
আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট (TA) ও রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট (RA) নিয়োগে বিইউবিটির শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ মাত্র ৩–৫ শতাংশের কাছাকাছি। অন্যদিকে গ্রিন ইউনিভার্সিটি, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি ও হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা প্রার্থীদের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যদি এই পরিসংখ্যান সঠিক হয়, তাহলে বিইউবিটির শিক্ষার্থীরা কেন এত কম সুযোগ পাচ্ছেন? নিজেদের শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা এবং শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দেওয়া কি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নয়?
আমরা বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সুযোগ বন্ধ করতে চাই না। আমরা চাই, বিইউবিটির শিক্ষার্থীরাও যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান সুযোগ পান। নিজেদের শিক্ষার্থীদের অবমূল্যায়ন করে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে না।
সপ্তম প্রশ্ন—ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা ও শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে।
বিইউবিটির ওয়েবসাইটে অনুপযুক্ত বা ১৮+ কনটেন্ট প্রদর্শিত হওয়ার অভিযোগ এবং শিক্ষার্থীদের তথ্য ফাঁস হয়ে স্প্যাম ফোন আসার বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। এসব ঘটনা সত্য হলে, সেগুলোকে সাধারণ প্রযুক্তিগত সমস্যা বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই।
শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য কতটা নিরাপদ? ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা কে পর্যবেক্ষণ করেন? কোনো তথ্য ফাঁস হয়ে থাকলে তার উৎস কী, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া হবে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল নিরাপত্তা শুধু আইটি বিভাগের বিষয় নয়; এটি শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তা ও আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
সবশেষে, আমরা কী চাই?
আমরা বিইউবিটির ক্ষতি চাই না। আমরা চাই না আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বিতর্কে জড়িয়ে পড়ুক। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষা করার অর্থ অনিয়মের অভিযোগ উপেক্ষা করা নয়। বরং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, স্বচ্ছতা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব।
আমাদের কাছে থাকা তথ্য ও নথিগুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা হোক। শিক্ষকতার দায়িত্ব, আর্থিক সুবিধা, বোনাস, নিয়োগ, অনুমোদন এবং তথ্যনিরাপত্তা—প্রতিটি বিষয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে পদ-পদবি বা প্রভাব বিবেচনা না করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
বিইউবিটি কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, অভিভাবকদের কষ্টার্জিত অর্থ এবং অসংখ্য শিক্ষক-গ্র্যাজুয়েটের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান।
একজন বিইউবিটিয়ান হিসেবে আমার প্রশ্ন—আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হলে কি আমাদের অপরাধী হতে হবে? নিয়োগের স্বচ্ছতা চাইলে, অর্থের হিসাব চাইলে, শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন করলে কি আমরা ভুল করছি?
আমরা কারও ব্যক্তিগত শত্রু নই। আমরা জবাবদিহি চাই, স্বচ্ছতা চাই, যোগ্যতার মূল্যায়ন চাই এবং এমন একটি বিইউবিটি চাই, যেখানে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সবার আগে থাকবে।
বিইউবিটি প্রশাসনের কাছে সরাসরি প্রশ্ন: এই অভিযোগগুলোর জবাব কি প্রমাণ ও নথিসহ প্রকাশ করা হবে? ৩১৩টি নিয়োগের প্রক্রিয়া, আর্থিক সুবিধা প্রদানের অনুমোদন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ব্যয়ের হিসাব কি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে দেওয়া হবে?
প্রশ্নগুলো ব্যক্তিগত নয়। এগুলো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে।