20/08/2024
ইতোমধ্যে আমরা বলেছি, কিভাবে লেফ. জেনারেল সাইফুল আলমের কন্যা জারিফা বিনতে আলম ও সাবেক এমপি সাহিদুজ্জামানের পুত্র সামিউজ্জামান অবৈধ ভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের হাতের মুঠোয় কুক্ষিগত করে রাখে বিগত ৩ বছর ধরে। আমাদের একজন শিক্ষকের সাথে তাদের করা অন্যায় এবং এই প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু সামরিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার অবৈধ হস্তক্ষেপের প্রমাণ আমরা পেয়েছি। এই পর্বে আমরা বলবো
পরবর্তী ঘটনাবলি-
জারিফা-সামির অপকর্ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহার শুধু খালেদ ইমরান স্যারের ক্ষেত্রে থেমে থাকেনি। দিনকে দিন তারা হয়ে উঠেছে বেপরোয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের কারোর-ই যেনো কিছু বলার নেই- প্রশাসন থেকে শিক্ষার্থী সবাই যেনো নিরুপায় তাদের সামনে। নিজেদের ক্ষমতার বলেই বারবার তারা এড়িয়ে গেছে সকল প্রকার জবাবদিহিতার জায়গা, বিইউপির এই নিয়মানুবর্তী, সুশৃঙ্খল ক্যাম্পাসও তাদের উপস্থিতিতে যেনো হয়ে উঠত ব্যক্তি নৈরাজ্যের তীর্থস্থান।
জারিফা এবং সামি বিশ্ববিদ্যালয় হতে যে সকল অবৈধ সুযোগ-সুবিধা জোর পূর্বক আদায় করতেন তার মধ্যে অন্যতম - পরীক্ষায় অতিরিক্ত নাম্বার, প্রশ্ন আগে থেকে পাওয়া, এবং পরীক্ষায় প্রকাশ্যে নকল করা। সাহস করে তাদের নকলের বিরুদ্ধে কথা বলায়, ডিপার্টমেন্ট এর তৎকালীন চেয়ারম্যান, লে. কর্নেল (অব:) রবিউল আলমকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। চেয়ারম্যান স্যার এর রুম থেকে বের হওয়ার পর আত্মোপলব্ধীর বদলে সামির মন্তব্য ছিল এরকম, "বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই প্রথমবার সবাই দেখবে নকল ধরার ফলস্বরূপ একজন চেয়ারম্যান এর চাকরি চলে গেল! ওই লোকের বদলি করিয়ে দিব এখনই।"
খালেদ ইমরান স্যারের ঘটনাটির একটি ইতিবাচক সুরাহার জন্য আমাদের ডিপার্টমেন্ট এর শিক্ষকবৃন্দ সংসদ ভবনে যান এবং তৎকালীন এমপি সাহিদুজ্জামান খোকন (সামির বাবা) এর সাথে কথা বলেন, যেন এই অভিযোগটি তুলে নেওয়া হয়। কিন্তু সে সময় তিনি বলেন, “আমি আসলে একজন এমপি, অনেক ব্যস্ত একজন মানুষ। আমি যদি এখন একটা ইউনিভার্সিটির স্যার এর বিরুদ্ধে অভিযোগ সরানোর মত তুচ্ছ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করি, এটা আমাকে মানায় না। সামির ব্যাপার এটা, ওই সামলে নিবে”।
তদন্তের মধ্যেই স্যারকে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয় চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অব্যহতি নিতে। এই প্রক্রিয়ায় ডিপার্টমেন্ট এর অন্য যে সকল ব্যাচের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেন প্রশাসন তাদেরও শোকজ করেন এবং এই বিষয়ে চুপ থাকতে বলেন। উক্ত ঘটনার সূত্রপাতে বিইউপি যেনো বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে একটি অন্ধকারযুগে প্রবেশ করে- কোথাও কোন আইন নেই, নিয়ম নেই, জবাবদিহিতা নেই আর তা শুধু সে দু’জন ব্যক্তির জন্যেই।
অন্যান্য শিক্ষকদের প্রতি বিরুপ আচরণঃ
শুধুমাত্র খালেদ ইমরান স্যার পর্যন্তই ব্যাপারটি সীমিত থাকেনি। আমাদের অন্যান্য সিনিয়র ফ্যাকাল্টি দের ও প্রতিনিয়ত বিভিন্ন থ্রেট এর আওতায় রাখা হতো। আমাদেরই একজন সিনিয়র ফ্যাকাল্টি ক্লাসে পরীক্ষাচলাকালীন সময়ে জারিফা কে আগে থেকেই উত্তর লেখা খাতা সহ হাতে নাতে ধরেন। জারিফা এর পরিপ্রেক্ষিতে স্যারকে "ফ্রড" বলে সম্বোধন করেন। স্যার ডিন অফিসে ব্যাপারটি জানানোর কথা বললে জারিফা পুরো ক্লাসে সবার সামনে সেই ফ্যাকাল্টি কে ওপেন চ্যালেঞ্জ করে বলে যদি স্যার ডিন অফিস এ যায় তাহলে সেও যাবে। উক্ত শিক্ষককে "দ্বিতীয় খালেদ ইমরান স্যার" বানানোর পরিকল্পনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়।
আমাদের অপর একজন ফিমেল সহকারী অধ্যাপক জারিফাকে যৌক্তিক কারণে কম নম্বর দেওয়ায় তার জীবনে অশান্তি সৃষ্টি করার হুমকি দিতেও জারিফা দ্বিধাবোধ করে না। অপর একটি ঘটনায়, ঘুমের কারণে জারিফার একার অনলাইন ক্লাস এ জয়েন না করতে পারার কারনে আমদের শিক্ষক যখন অ্যাটেন্ডেন্স না দেয় তখন তার বিরুদ্ধে ডিন অফিস এ কম্পলেইন করা হবে বলে হুমকি দেয়।
সামিও কোনো অংশে কম নয়। তাকে ২য় সেমিস্টারের ইকোনোমিক্স ফাইনাল পরীক্ষায় নকল হাতে ধরার পর সে শিক্ষকের বিরুদ্ধে মন্তব্য ছিলো এরুপ -"ওকে আমি জাতে না, ভাতে মারবো। বিইউপি থেকে ও আস্ত শরীরে বাড়ি ফিরতে পারবে না। হয় আমি আমার বন্দুক দিয়ে গুলি করবো নাহলে আমার ছাত্রলীগ এর পোলাপান দিয়ে মাইর খাওয়াবো।"
তবুও সামির যে “গুন” জারিফার থেকে আলাদা করে তা হলো সে নকল নিয়ে ধরা পড়লেও স্বীকার করে নেয়, জারিফার মতো হাতেনাতে নকল নিয়ে ধরা খেয়েও উল্টো শিক্ষকের বিরুদ্ধেই পাল্টা অভিযোগ দেয় না যে- শিক্ষক ওকে ফাসানোর জন্য এসব কিছু প্ল্যান করে সাজিয়েন। ক্লাসরুমে সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকলে সে শিক্ষককেও হয়তো পত্রপাঠ বিদায় নিতে হত।
এতটাই অসহায় ছিলেন আমাদের শিক্ষকেরা।
বর্তমান অবস্থাঃ
আমাদের ব্যাচের প্রতিও তৈরি হয় বিরূপ প্রতিক্রিয়া, আমাদের মধ্যেই সবাই যেনো অন্যায় আর বৈষম্যের প্রতিচ্ছবিকে দেখতে পায় অথচ, সে প্রতিচ্ছবিতে আমরাই সরাসরি ভুক্তভোগী এবং সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত হই। যারা মানসিক ও বিভিন্নভাবে প্রতিনিয়ত এক শঙ্কা এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পার করি। এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছিলেন বরাবরই উদাসীন। কিন্তু বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং পরবর্তী প্রেক্ষাপট আমাদের সাহস যোগায় ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর।
তারই ধারাবাহিকতায় - ১৮ই আগস্ট, ২০২৪ এ- আইআর ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা সকল একাডেমিক কার্যক্রম বয়কটের ঘোষণা দেয়। আমাদের সকল অন্যায় এবং দমন কার্যক্রমের সুষ্ঠ তদন্ত, ন্যায় প্রতিষ্ঠা, দোষীদের শাস্তির আওতায় এনে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ একাডেমিক পরিবেশ সৃষ্টি করা। তা না হলে আমরা ক্লাসরুমে ফিরব না। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে স্বস্তির বিষয়- বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমাদের সাথে বসেন এবং ক্লাসরুমে ফিরে আসার অনুরোধ করেন । কিন্তু শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের উপর আস্থা না রাখতে পেরে চলমান বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়।
আজ যখন পুরো দেশজুড়ে সংস্কার হচ্ছে, সকল মানুষ নতুনভাবে দেশগড়ার স্বপ্নে বিভোর, সেখানে ক্ষমতার এই মঞ্চে আজও কি আমরা সাধারণ দর্শক এবং ভুক্তভোগী হয়েই থাকবো?
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থানে আমরা শংকিত, এই প্রশাসনের অধীনে আদৌ আমরা ন্যায় পাবো? একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি শিক্ষক এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে তা সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নৈতিক অবস্থান ও কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমাদের যৌক্তিক দাবির প্রতি একাত্মতা জানিয়ে ইতিমধ্যে একাধিক ডিপার্টমেন্ট সংহতি প্রকাশ করে। সে শক্তি এবং সংহতির বলেই আমরা আহ্বান করবো, বৃহত্তর ঐক্য গঠনের মাধ্যমে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা হোক। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সকল দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আজ আওয়াজ উঠাতে হবে, কথা বলতে হবে- বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নীরব ঘাতক চরিত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আমরা এটাও স্পষ্ট করে বলতে চাই- আমাদের লড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে নয়, সামরিক বাহিনী বা সরকারের বিরুদ্ধেও নয় কিংবা দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করাও আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই- বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে তারা যে বাংলাদেশের আশ্বাস আমাদের দিয়েছে তার প্রতিফলন যেনো এখানেও ঘটে। আমরা বিশ্বাস করি, ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই আমাদের দেশ, জনগণ, সামরিক বাহিনী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে।
- বিইউপি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ২০২১ ব্যাচের সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ।