12/05/2026
স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ এক ভিডিও সামনে এলো! তারপর ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল আমার হৃদয়, আমার জীবন, আমার গন্তব্য...
সমস্ত প্রশংসা একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলার জন্য। তিনি যাকে ইচ্ছা অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসেন। তিনি মানুষের হৃদয়ে ঈমানের আলো প্রজ্বলিত করেন। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কোনো হৃদয়ে হেদায়েতের আলো প্রবেশ করে না। হেদায়েত আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় নেয়ামত। মানুষ যতই চেষ্টা করুক, আল্লাহ যদি না চান তবে সে সঠিক পথ খুঁজে পায় না। আবার মানুষ যত গভীর অন্ধকারেই নিমজ্জিত থাকুক, আল্লাহ চাইলে এক মুহূর্তেই তার অন্তর পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।
আলহামদুলিল্লাহ, আমার জীবনেও দ্বীনের পথে প্রত্যাবর্তন ছিল আল্লাহ তাআলার এক বিশেষ রহমত। যখন আমি নিজের অতীতের দিকে তাকাই, তখন স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করি- এটি আমার যোগ্যতা বা সামর্থ্যের ফল নয়; বরং এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ অনুগ্রহ। এমন এক রহমত, যা আমার জীবনের গতিপথকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে। আর বিস্ময়ের বিষয় হলো, এই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল অত্যন্ত সাধারণ একটি মাধ্যম- একটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে।
সাধারণত আমরা মোবাইল ফোনকে ব্যবহার করি বিনোদনের জন্য, অবসর কাটানোর জন্য বা দুনিয়াবি ব্যস্ততার নানান কাজে। অনেক সময় নতুন ফোন মানুষের গাফলতিকে আরও বাড়িয়ে দেয়, সময় অপচয় হয়। কিন্তু আমার জীবনে ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ঘটেছিল। আল্লাহর অশেষ ইচ্ছায় এই ছোট্ট যন্ত্রই আমার জীবনের পরিবর্তনের একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। একসময় আমি ফেসবুক ও ইউটিউবে বিভিন্ন ইসলামী আলোচনা শোনা শুরু করি। প্রথমদিকে হয়তো বিষয়টি ছিল নিছক কৌতুহল, কিন্তু ধীরে ধীরে সেই আলোচনাগুলো আমার অন্তরে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। বিভিন্ন আলেমের নাসিহা শুনতে শুনতে আমার মনে একের পর এক প্রশ্ন জাগতে থাকে—আমি যে জীবন যাপন করছি সেটি কি প্রকৃতপক্ষে সঠিক? আমি কি এমন পথে অগ্রসর হচ্ছি যা আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে নিয়ে যাবে? নাকি আমি এমন এক জীবনে নিমগ্ন যা একদিন অনুতাপ ছাড়া কিছুই রেখে যাবে না?
একদিন ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ একটি ভিডিও আমার সামনে চলে আসে। একজন দ্বীনি ভাই মুহাম্মদ রাফিউজ্জামান অত্যন্ত সহজ ভাষায় যুবসমাজকে উদ্দেশ্য করে কিছু কথা বলছিলেন। তাঁর কথাগুলো ছিল সরল অথচ চিন্তাকে গভীরভাবে নাড়া দেওয়ার মতো। ভিডিওর এক পর্যায়ে তিনি একটি সিরিজ দেখার পরামর্শ দেন, যার নাম "জীবন-মৃত্যু-জীবন"। কৌতুহলবশত একদিন রাতে নিজের রুমে একা বসে ইউটিউবে সিরিজটি দেখা শুরু করি। তখনও আমি ধারণা করতে পারিনি সেই রাতটি আমার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠবে।
ভিডিওর কয়েক মিনিট অতিক্রান্ত হওয়ার পরই আমার হৃদয়ের ভেতর এক অদ্ভুত আলোড়ন সৃষ্টি হয়। দুনিয়ার জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব, মৃত্যুর অনিবার্য বাস্তবতা, কবরের জীবন এবং আখিরাতের জবাবদিহিতার ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। এই বিষয়গুলো পূর্বেও শুনেছি, কিন্তু এত গভীরভাবে কখনো উপলব্ধি করিনি। ভিডিও যত সামনে এগোতে থাকে, ততই আমার মনে হতে থাকে আমি কত মূল্যবান সময় অবহেলায় নষ্ট করেছি। আমার জীবনের নানা স্মৃতির পাতায় অসংখ্য ভুল আর অবহেলার মুহূর্ত ভেসে উঠতে শুরু করে। সেই অনুতাপ আমাকে ভেঙে দেয়নি, বরং আমাকে জাগিয়ে তোলে। নিজের ভেতর ফিরে আসার শক্তি আর নিজেকে পরিবর্তন করার দৃঢ় সংকল্প জন্ম নেয়।
সেই রাতেই আমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি—আমি বদলাবো, আমি আল্লাহর দিকে ফিরে আসবো। এরপর ধীরে ধীরে আমার জীবনে পরিবর্তনের সূচনা ঘটে। নামাজের প্রতি যত্নশীল হওয়া, নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত এবং হাদিস শিক্ষার প্রতি আমার আগ্রহ বাড়তে থাকে। আগে যেখানে চিন্তার অধিকাংশ জুড়ে ছিল দুনিয়াবি পড়াশোনা আর ক্যারিয়ার, এখন সেখানে নতুন উপলব্ধি জন্ম নিয়েছে—মানুষের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
এই সময় আল্লাহর বিশেষ রহমতে কিছু দ্বীনি বোনের সাথে আমার পরিচয় হয়। তাদের ইবাদতের প্রতি যত্ন আর আন্তরিকতা দেখে আমি নতুন অনুপ্রেরণা পাই। তাদেরই একজন ছিলেন আইওএম (IOM)-এর একজন ছাত্রী। তাঁর মাধ্যমেই আমি এই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানতে পারি। তিনি আমাকে দ্বীনের জ্ঞান অর্জনের জন্য নিয়মিত পড়াশোনা করতে উৎসাহ প্রদান করেন। আমি উপলব্ধি করি, কেবল আবেগ দিয়ে পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হয় না; পরিবর্তনকে স্থায়ী করতে হলে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান অর্জন প্রয়োজন। অবশেষে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় আমি আইওএম-এ ভর্তি হওয়ার সুযোগ লাভ করি এবং একজন তালিবুল ইলম হওয়ার পথ আমার সামনে উন্মুক্ত হয়।
আজ যখন আমি অতীতের দিকে ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি একটি ক্ষুদ্র মাধ্যম কীভাবে এক বিশাল পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। একটি ভিডিও বা কিছু নাসিহাই ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। আজও আমি নিখুঁত নই, এখনো শিখছি এবং ভুল করলে পুনরায় তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসছি। তবে এখন আমার জীবনের লক্ষ্য সুস্পষ্ট- আমার প্রকৃত গন্তব্য আখিরাত। আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমাকে দ্বীনের পথে দৃঢ় রাখেন এবং শেখা জ্ঞান অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করেন। আলহামদুলিল্লাহ, আজ আমার জীবন নতুন অর্থ আর দিশা খুঁজে পেয়েছে।
আল্লাহ আমাদের সকলকে হেদায়েতের আলো দান করুন এবং সত্যের পথে অবিচল থাকার তৌফিক প্রদান করুন। আমিন।
- ২৬১৫ ব্যাচের এক বোনের দ্বীনে ফেরার গল্প