18/04/2020
করোনা নিয়ে জটিল মাসআলা সমূহের সঠিক সমাধান
আল্লামা মুফতী কুতুবুদ্দীন নানুপুরী দা.বা.
শায়খুল হাদীস নানুপুর মাদরাসা।
২য় পর্ব
প্রশ্নোত্তরে করোনা ও ইসলামী আক্বীদা-বিশ্বাস
১. প্রশ্নঃ করোনার ব্যপারে আমাদের আক্বীদা-বিশ্বাস কেমন হওয়া চাই?
উত্তরঃ করোনার ব্যপারে আমাদের এ বিশ্বাস রাখা চাই যে, ইহা একমাত্র আল্লাহ তা’য়ালারই সৃষ্ট এবং তাঁর হুকুমেই সংক্রমিত হয়েছে, হচ্ছে, এবং যতদিন, যেখানে, যেভাবে যাদের উপর তাঁর ইচ্ছা সংক্রমিত হবে। এতে কারো রক্ষার ক্ষমতা নেই, আর যখন তিনি তা স্তমিত করে দিবেন তা সংক্রমিত করার কারো ক্ষমতা নেই এবং স্বয়ং করোনাও সংক্রমিত হওয়ার ক্ষমতা রাখেনা, আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, {أَلا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعالَمِينَ}
অর্থঃ জেনে রেখো সবধরণের সৃষ্টি এবং সকল হুকুম তাঁর পক্ষ থেকেই, আল্লাহ রব্বুল আলামীন বরকতময় সত্ত্বা । (সূরা আ‘রাফ, আয়াতঃ৫৪)
তিনি আরও এরশাদ করেন, {قُلْ لَنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا}
অর্থঃ হে নবী বলে দিন কখনো কোন অশুভনিয় বিষয় আমাদের নিকট পৌছবেনা, কিন্তু আল্লাহ পাক যা নির্ধারণ করে রেখেছেন তাই পৌছবে। (সূরা তাওবা, আয়াতঃ ৫১)
আরো ইরশাদ করেন, {قُلْ كُلٌّ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ} [النساء: ৭৮]
অর্থঃ হে নবী বলে দিন ভাল-খারাপ সবই আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে।
(সুরা নিসাঃ আয়াত, ৭৮)
রসূল -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- ইরশাদ করেন, لاَ عَدْوَى...
অর্থঃ আল্লাহ তা’য়ালার হুকুম ব্যতিত কোন রোগ নিজে নিজে সংক্রমিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে না। (বুখারী শরীফ, খঃ৭, পৃঃ১৩৫, হা৫৭৫৩)
২. প্রশ্নঃ (ক) ইসলামে কোন “ছোঁয়াছে রোগ” আছে কি না?
(খ) করোনা ভাইরাসকে ছোঁয়াছে মনে করা হলে তা ইসলামী আক্বীদার পরিপন্থি হবে কি না?
উত্তরঃ (ক) ছোঁয়াছে বলতে তার দু’টি সংজ্ঞা:
১) ছোঁয়াছে বলতে কিছু রোগ এমন রহিয়াছে যা নিজে নিজে সংক্রমিত হতে পারে, এবং কোন প্রতিকার-প্রতিরোধ প্রতিবন্ধক না হলে তার নাগালের ভিতরে যাকে পাবে আক্রমন করে বসবে। এবং সংক্রমিত হবে।
২) ছোঁয়াছে বলতে কিছু রোগ এমন রহিয়াছে যা আল্লাহ তা’য়ালার হুকুমে এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীর মধ্যে সংক্রমিত হয়। যখন আল্লাহ তা’য়ালার হুকুম হয় রোগাক্রান্ত প্রাণী থেকে দূরে থাকলেও তা সংক্রমিত হয়, যেমন নিকটে থাকলে সংক্রমিত হয়, সেই রোগের নাগালের বাহিরে থাকলেও সংক্রমিত হয়। যেমন নাগালের ভিতরে থাকলে সংক্রমিত হয়। সেই রোগের প্রতিকার প্রতিরোধক থাকলেও সংক্রমিত হয় যেমন না থাকলে সংক্রমিত হয়।
দ্বিতীয় সংজ্ঞা ভিত্তিক ইসলামে ছোঁয়াছে রোগ আছে। প্রথম সংজ্ঞা ভিত্তিক নাই, কারণ আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন,
وَما هُمْ بِضارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلاَّ بِإِذْنِ اللَّهِ
অর্থ: তারা (লোকসকল) কোন কিছুতেই ও কারো মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ও আক্রান্ত হতে পারেনা আল্লাহ তা’য়ালার হুকুম ব্যতীত। (সুরা বাক্বারা: আয়াত: ১০২)
এবং রসূল -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- ইরশাদ করেন, لاَ عَدْوَى... অর্থাৎ আল্লাহ পাকের হুকুম ব্যতিত কোন রোগ নিজে নিজে সংক্রমিত হতে পারেনা। (বুখারী শরীফ, খঃ৭, পৃঃ১৩৫, হা৫৭৫৩)
বাস্তবতা ও প্রমান করে যে প্রথম সংজ্ঞা ভিত্তিক কোন ছোঁয়াছে রোগ নেই, কারণ মহামারীর এ কাল ইতিহাস আজকের নয়। ইসলামের পূর্বে বনী ইসরাইল গোত্রে মহামারী হয়েছিল, ইসলাম আগমনের পর ছাহাবা যুগে ১৮ হি: সালে শাম দেশে মহামারী হয়ে ছিল এর পরেও যুগে যুগে অনেক ধংসাত্মক মহামারী পৃথিবীতে সংক্রমিত হয়ে ছিল।
ইতিহাস সাক্ষী দেয় সে সকল মহামারী সংক্রমিত হওয়ার সময় অনেকে মহামারী থেকে বাঁচার জন্য সতর্কতা মূলক শক্তিশালী প্রতিরোধক গ্রহণ করেছিল এবং মহামারীতে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অনেক দূরে পালিয়ে গিয়েছিল তবুও বাঁচতে পারেনি, বিশেষ ভাবে সময়ের রেকর্ড ভঙ্গকারী “করোনা” মহামারী জলন্ত প্রমান বহন করে যে প্রথম সংজ্ঞা ভিত্তিক ছোঁয়াছে রোগ তথা কোন রোগ আল্লাহ তা’য়ালার হুকুম ছাড়া সংক্রমিত হতে পারেনা।
কারণ এ করোনা ভাইরাস সংক্রমিত প্রথম দেশ চীন, ও ইতালী, আমেরিকা, বৃটেন, ফ্রান্স সহ বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে অগ্রগামী, চিকিৎসা পদ্ধতীতে উন্নত, ও সার্বিক শক্তিধর দেশ গুলোতে, সতর্কতা ও চিকিৎসার কমতি নেই তারপর ও হাজারো লোক করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। অনেক দেশে তেমন সতর্কতা নেই, চিকিৎসার তেমন ব্যবস্থাও নেই, কিন্তু সেখানে করোনার কোন সংক্রমন নেই। অবলোকন করা হচ্ছে অনেক দেশে ভাইরাসের সংক্রমন না হওয়ার জন্য বিমান-হেলিকাপ্টার যোগে মেডিসিন ছিটানো হয়েছে তার পরও দেখা যায় সেখানে ভাইরাস সংক্রমিত, আর অনেক দেশে তা করা হয়নি তারপরও সংক্রমিত নয়। আবার দেখা যাচ্ছে একই জায়গাতে শত শত মানুষ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে আবার তার পাশের্^ শত শত লোক আক্রান্তু হয়নি বরং সুস্থ-সবলে আছে।
অতএব বাস্তবতার নিরিখে স্পষ্ট হয়ে গেল ছোঁয়াছে রোগের প্রথম সংজ্ঞা ভিত্তিক কোন ছোঁয়াছে নেই যেমন ইমলামের দৃষ্টিতে ও প্রথম সংজ্ঞা ভিত্তিক কোন ছোঁয়াছে নেই।
(খ) সময়ের বিশ্ব সংক্রমিত করোনা ভইরাসকে দ্বিতীয় সংজ্ঞা ভিত্তিক ছোঁয়াছে মনে করা হলে, তা ইসলামী আক্বীদা পরিপন্থী হবে না।
৩. প্রশ্নঃ যেহেতু সকল প্রকার রোগ ও ভাইরাস আল্লাহ তা’য়ালার হুকুমেই সংক্রমিত হয় ও তাঁর হুকুমেই স্থমিত হয়। অতএব করোনা ভইরাসের সংক্রমন থেকে বাচার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করার প্রয়োজন কি?
উত্তরঃ মোটামুটি ভাবে দুটি কারণে ভাইরাসের সংক্রমন থেকে বাচার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করার প্রয়োজন পরিলক্ষিত হয়।
(ক) এক দিকে যদিও এটা ইসলামের মৌলিক বিধান যে সব কিছু আল্লাহ পাকের হুকুমেই হয়, অপর দিকে দুনিয়াকে আল্লাহ পাক দারুল আসবাব বানিয়েছেন তথা আল্লাহ পাকের হুকুম কে আসবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। নিশ্চিত হিসাবে বা সাম্ভাব্য হিসাবে। নিশ্চিত ভাবে যেমন ক্ষুধা নিবারণকারী একমাত্র আল্লাহ কিন্তু তা সম্পৃক্ত করেছেন খানার সঙ্গে খানা খেলে ক্ষুধা নিবারণ হবে। সাম্ভাব্য হিসাবে যেমন অসুখ নিরাময়কারী একমাত্র আল্লাহ, তিনি ইরশাদ করেন,
وَإِذا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ (سورة الشعراء: الآية:৮০)
অর্থঃ আমি যখন অসুস্থ হই তখন তিনিই (আল্লাহই) শিফা দেন। কিন্তু তা সাম্ভাব্য হিসাবে সম্পৃক্ত করেছেন চিকিৎসা ও সতর্কতার উপর, অনেক সময় চিকিৎসা ও সতর্কতা ব্যতিত আল্লাহ পাক শিফা দেন, আবার অনেক সময় চিকিৎসা ও সতর্কতার মাধ্যমে আল্লাহ পাক শিফা দেন। সেদিকে ইঙ্গিত করেই রসূল -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- ইরশাদ করেন,
" مَا أَنْزَلَ اللهُ دَاءً، إِلَّا قَدْ أَنْزَلَ لَهُ شِفَاءً، عَلِمَهُ مَنْ عَلِمَهُ، وَجَهِلَهُ مَنْ جَهِلَهُ "
অর্থঃ আল্লাহ পাক কোন রোগ অবতরণ করেননি তবে তার জন্য নিরাময়ের ব্যবস্থা ও আল্লাহ পাক অবতরণ করেছেন, যার তাওফীক তা সম্মন্ধে জানতে পেরেছে, আর যার তাওফীক হয়নি সে তা সম্মন্ধে অজ্ঞ রয়েছে। (মুসনাদে আহমদ: খঃ৬ পৃঃ৫০ হাঃ৩৫৭৮)
তিনি আরো ইরশাদ করেন,
لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاءٌ، فَإِذَا أُصِيبَ دَوَاءُ الدَّاءِ بَرَأَ بِإِذْنِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ
অর্থঃ প্রত্যেক রোগের ঔষধ রয়েছে অতএব যখন রোগ অনুযায়ী ঔষধ বা চিকিৎসা মিলে যায় আল্লাহ তা’য়ালার হুকুমে রোগ নিরাময় হয়। (মুসলিম শরীফ: খঃ৪ পৃঃ১৭২৯ হা: ২২০৪)
অতএব সতর্কতা ও যেহেতু অনেক সময় রোগ সংক্রমণ থেকে বাচার উপায় হয় সেজন্য সাম্ভাব্য হিসাবে তা গ্রহণ করা সমীচীন।
(খ) যদিও মুমিন মুসলমানের এটা বিশ্বাস যে ভাইরাসের সংক্রমন একমাত্র আল্লাহ তা’য়ালার হুকুমেই হয়। কিন্তু অধিকাংশ মুসলমান এই আক্বীদাতে দুর্বল, প্রকাশ্য আসবাবের উপর নির্ভরশীল। অতএব কেউ যদি সতর্কতা অবলম্বন না করার কারণে ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে মারা যায় তখন দুর্বল মুসলমানের দুর্বল ঈমানে আরো ঘাটতি আসবে এবং বলবে যে, সে সতর্কতা অবলম্বন না করার কারণেই সংক্রমিত হয়ে মারা গেছে, অতএব সংক্রমন থেকে বাঁচতে হলে সতর্কতা অবলম্বন করতেই হবে। এই দুর্বল মুসলমানের দুর্বল ঈমানের হেফাজতের জন্য রসূল -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- আদেশ দিয়েছেন, وَفِرَّ مِنَ المَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنَ الأَسَدِ.
অর্থঃ কুষ্ট রোগী থেকে ভাগ যেমন তুমি হিংস্র বাঘ থেকে ভাগ। (বুখারী শরীফ, খঃ৭ পৃঃ১২৬ হা৫৭০৭)
এবং নির্দেশ দিয়েছেন,
لاَ يُورِدَنَّ مُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ
অর্থঃ মহামারী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ ব্যক্তির ধারে যাবে না। (বুখারী শরীফ খঃ৭ পৃঃ১৩৮ হাঃ৫৭৭০ )
এই আদেশ ও নির্দেশ একমাত্র দুর্বল ঈমানদ্বারের ঈমানের হেফাজতের জন্য।
ইমাম আবু ওবাইদা রহ. বলেন,
لِأَنَّ الصِّحَاحَ لَوْ مَرِضَتْ بِتَقْدِيرِ اللَّهِ تَعَالَى رُبَّمَا وَقَعَ فِي نَفْسِ صَاحِبِهَا أَنَّ ذَلِكَ مِنَ الْعَدْوَى فَيُفْتَتَنُ وَيَتَشَكَّكُ فِي ذَلِكَ.
অর্থঃ রসূলের নির্দেশ এই কারণেই যে, যদি সুস্থ ব্যক্তি আল্লাহ তা’য়ালার হুকুমেই অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন তার সাথী মনে করবে যে. অসতর্কতার কারণে রোগের সংক্রমন ঘটেছে তখন ফিৎনাতে পড়ে যাবে এবং ঈমানের ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে যাবে। (ফতহুল বারী: খ: ১০ পৃ. ১৬১)
৪. প্রশ্ন: শরীয়তের দৃষ্টিতে এই সতর্কতার হুকুম কি?
উত্তরঃ এই সতর্কতার শরয়ী হুকুম হলো তা মুস্তাহাব।
বিখ্যাত হাদীস বিশারদ আল্লামা ক্বাজী ইয়াজ রহ. বলেন,
بَلْ يَجِبُ ...، وَحَمْلُ الْأَمْرِ بِاجْتِنَابِهِ وَالْفِرَارِ مِنْهُ عَلَى الِاسْتِحْبَابِ وَالِاحْتِيَاطِ.
অর্থঃ বরং মহামারী আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে দুরে থাকা ও সরে থাকার হুকুমকে মুস্তাহাব ও সতর্কতার উপর আরোপ করা উচিত। (ফতহুল বারী: ১০/১৫৯)
৫. প্রশ্নঃ সরকারী ভাবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে করোনার সংক্রমন থেকে হিফাজতের জন্য যে ফর্মূলা ও বিধি-নিষেধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে (যথা লক ডাউন, মুখে মাস্ক পরে চলা-ফেরা করা, হাছী আসলে মুখে রুমাল ইত্যাদী ব্যবহার করা, হাত ধোয়া ব্যতিত চোখে ও নাকে হাত না দেওয়া, বাহির থেকে ঘরে ঢোকার পূর্বে ভাল করে দুনো হাত ধুয়ে নেওয়া ইত্যাদী) তা গ্রহণ করা আমাদের জন্য কতটুকু বাঞ্চনীয়?
উত্তরঃ প্রথমে এ কথা জানা থাকা চাই উপরোক্ত ফর্মূলা ও বিধি-নিষেধ গুলো করোনা সংক্রমন থেকে হেফজতের লক্ষে সাম্ভাব্যপূর্ণ বিষয়, নিশ্চিত নয়, দৈনিক হাজারো লোক সে বিধি-নিষেধ উপেক্ষা করে ঘুরা-ফেরা করা, বাজারে আনাগোনা করা, ব্যাংকে সমাগম করা সত্তে¡ও কোন ধরনের সংক্রমন না হওয়া তার জলন্ত প্রমান যা সবার নিকট দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। অতএব দুইটি শর্তকে সামনে রেখে উক্ত ফর্মূলা গ্রহণ করা উচিত।
১. এটা বিশ্বাস রাখতে হবে যে, সংক্রমন হওয়া না হওয়া, রোগাক্রান্ত হওয়া না হওয়া সব আল্লাহ তা’য়ালার হাতে, এই সতর্কতা অবলম্বন শুধু মাত্র দুনিয়া দারুল আসবাব হিসাবে।
বিখ্যাত ফক্বীহ আল্লামা আলাউদ্দীন হাছকফী বলেন,
وإذا خرج من بلدة بها الطاعون: فإن علم أن كل شئ بقدر الله تعالى فلا بأس بأن يخرج ويدخل، وإن كان عنده أنه لو خرج نجا ولو دخل ابتلي به كره له ذلك) فلا يدخل ولا يخرج صيانة لاعتقاده.
অর্থঃ যখন কোন ব্যক্তি মহামারী সংক্রমিত এলাকা থেকে বাহির হয়ে পড়ে এবং তার এ বিশ^াস থাকে যে সব কিছু আল্লাহ তা’য়ালার হুকুমেই হয়, তখন সতর্কতামূলক সেখান থেকে বাহির হওয়া বা প্রবেশ করার মধ্যে কোন অসুবিধা নেই। আর যদি তার বিশ্বাস এমনি হয় যে, সেখান থেকে বের হয়ে গেলে রোগ থেকে সম্পূর্ণ নাজাত পাবে। আর প্রবেশ করলে আক্রান্ত হয়ে যাবে তাহলে তার জন্য তা মাকরুহ হবে অতএব প্রবেশও করবে না ও বাহিরও হবেনা। (আদ্দুররুল মুখতার মা’আশ শামিয়া ৬/৭৫৭)
২. সরকারী পক্ষের ঘোষিত সেই ফর্মূলা ও বিধি-নিষেধ পালনে ও অবলম্বনে শরীয়তের আবশ্যকীয় কোন মৌলিক বিধানের সংঙ্গে সাংঘর্ষিক না হতে হবে, এবং তাতে গুণাহ ও আল্লাহ তা’য়ালার নাফরমানীতে লিপ্ত হওয়ার শঙ্কা না থাকতে হবে। কারণ, রসূল -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- ইরশাদ করেন, "لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ"
অর্থঃ সৃষ্টি কর্তার (আল্লাহ তা’য়ালার) না ফরমানীতে কোন মাখলুকের অনুগত্য নেই। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ, খঃ৬ পৃঃ৫৪৫ হাঃ৩৩৭১৭)
উপমা স্বরূপ, ইসলামী শরীয়তে রোগীর সেবা করা মুসলমানের হক, ও আবশ্যকীয় বিধান তেমনি মুসলিম মায়্যিতের জানাযা পড়া কাফন-দাফন করা মুসলমানের হক্ব ও আবশ্যকীয় বিধান, এবং সে হক্বগুলো খুন্ন করা, নষ্ট করা কবীরা গুণাহ, অতএব এখন লক ডাউন মানার দ্বারা যদি সে হক্বগুলো নষ্ট হয়, রোগীর ভোগান্তী হচ্ছে সেবাকারী কেউ নেই, মায়্যিতের লাশ পড়ে আছে জানাযা পড়নে ওয়ালা ও কাফন-দাফনকারী কেউ নেই তখন আমার জন্য লক ডাউন মেনে বসে থাকার অনুমতি নেই। অনুরূপ জু’মা ও নামাজের জামাত আবশ্যকীয় বিধান কোন উযর বিহীন জুমা ও জামাত ছেড়ে দেওয়া কবীরা গুণাহ, অতএব লক-ডাউন পালন করাতে যদি জুমা ও জামাত ছাড়তে হয়, তখন তা মানা যাবেনা।
৬. প্রশ্নঃ আমরা জানি যে এক মুসলমান অপর মুসলমানের সাথে মুসাফাহা করার বিধানটি একটি মুস্তাহাব বিধান, আবশ্যকীয় নয়। ওদিকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমন থেকে বাঁচার জন্য সরকারী ভাবে মুছাফাহা না করার প্রতি তাগীদ দিয়েছেন, এখন আমাদের করণীয় কি? কোন কোন আলিম ফতওয়া দিয়েছেন, মুছাফাহা না করা উত্তম হবে, দলীল হিসেবে পেশ করেছে যে মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে,
عَنْ الشَّرِيدِ، قَالَ: كَانَ فِي وَفْدِ ثَقِيفٍ رَجُلٌ مَجْذُومٌ، فَأَرْسَلَ إِلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّا قَدْ بَايَعْنَاكَ فَارْجِعْ
অর্থঃ আশ্-শারীদ ছাক্বাফী রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন যে “ছক্বীফ গোত্রের প্রতিনিধি দলের মধ্যে এক কুষ্ট রোগী ব্যক্তি ছিল, অতঃপর রসূল -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর নিকট খবর পৌছাইলেন যে, আমি তোমাকে হাত স্পর্শকরা ব্যতিত বাইয়াত করে নিলাম। অতএব তুমি আপন গোত্রে ফিরে যাও। (মুসলিম শরীফ, খঃ৪ পৃঃ১৭৫২ হাঃ২২৩১)
এতে স্পষ্ট যে রসূল কুষ্টরোগ সংক্রমন থেকে হেফাজতে থাকার লক্ষে হাত স্পর্শ করে সরাসরী বাইয়াত করান নি। অতএব সংক্রমন থেকে হেফাজতের জন্য মুছাফাহা ও না করা চাই এবং রসূলের অনুসরণে তাই উত্তম।
উত্তরঃ এক মুসলমান অপর মুসলমানের সঙ্গে মুছাফাহা করার দ্বারা করোনা সংক্রমনের শঙ্কার বিষয়টি নিছক ধারণা মাত্র, তার কোন প্রমান ও নেই, চিহ্ন ও নেই। মুছাফাহা করার কারণে সংক্রমন হয়েছে সেরকম সু-নিশ্চিত ঘটনা পাওয়া যায়নি, বরং সংক্রমন না হওয়ার পক্ষে হাজারো সাক্ষি ও প্রমান রয়েছে, কারণ সমাজে শতশত লোক একে অপরের সঙ্গে মুছাফাহা করে চলছে, উঠা-বসা ও লেনদেনে একে অপরের হাত বা শরীরের স্পর্শ হচ্ছে। এতে কোন ধরণের সংক্রমনের ঘটনা পরিলক্ষিত নয়।
অতএব বুঝা গেল মুছাফাহা করার দরুন করোনা সংক্রমনের শ^ংকার বিষয়টি ভিত্তিহীন নিছক ধারণা মাত্র, ইসলাম নিছক ধারণার কোন তোয়াক্কা করে না।
আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, {وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ}
অর্থঃ (হে নবী) যে বিষয়ে আপনার নিশ্চিত জ্ঞান বা প্রবল ধারণা নেই তার পিছে পড়বেন না। (সূরা ঈসরা, আয়াতঃ ৩৬)
অতএব একটি নিছক ধারণার উপর ভিত্তি করে মুছাফাহার মত একটি ফজীলত পূর্ণ কাজকে বাদ দেওয়া ঠিক হবে না বরং মুছাফাহা করাটাই উত্তম হবে।
রসূল -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- ইরশাদ করেন,
إِذَا الْتَقَى الْمُسْلِمَانِ فَتَصَافَحَا، وَحَمِدَا اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ، وَاسْتَغْفَرَاهُ غُفِرَ لَهُمَا
অর্থঃ যখন দুজন মুসলিম পরস্পর সাক্ষাত করে মুছাফাহা করে , এবং আল্লাহ তা’য়ালার প্রসংশা করে ও তাঁর নিকট গুণাহ মাপ চায় তখন আল্লাহ পাক উভয়ের গুণাহ মাফ করে দেন। (আবু দাউদ শরীফ: ৫/২৪৩ হা. ৫২১১)
মুসলিম শরীফে বর্ণিত ছাক্বীফ গোত্রের প্রতিনিধি দলের মধ্যে জনৈক কুষ্ট রোগীর হাত স্পর্শ না করে বাইয়াত গ্রহণ করার ঘটনাকে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে মুছাফাহা ছেড়ে দেওয়া উত্তম হওয়ার পক্ষ্যে দলীল হিসাবে পেশ করা অনুচিত। কারণ আলোচিত ঘটনায় জনৈক ব্যক্তিটি নিশ্চিত কুষ্টরোগে আক্রান্ত ছিল, তার থেকে রোগ সংক্রমন হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতে মুসলমান পরস্পর মুছাফাহা করার মধ্যে করোনা সংক্রমনের সে রকম সম্ভাবনা নেই। তবে নিদৃষ্ট করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে মুছাফাহা না করার ব্যাপারে আমরাও বলি তা উত্তম হবে। যেহেতু তখন সংক্রমনের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।