08/04/2026
হৃদয়ের হিজরত
পর্ব–৫
লেখক: — mohd Akram hossain
*কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ* ⛔
_____
খাদিজা এখনো কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেয়নি। বাইরে থেকে তাকালে মনে হবে—সবকিছু আগের মতোই চলছে। সে নিয়মিত কলেজে যায়, বন্ধুদের সাথে কথা বলে, বাসায় ফিরে ফোন হাতে নেয়। কিন্তু তার ভেতরে ভেতরে একটা নীরব পরিবর্তন শুরু হয়েছে—যেটা অন্য কেউ না বুঝলেও সে নিজে খুব ভালোভাবে টের পাচ্ছে। এখন সে নিজের প্রতিটা কাজ একটু একটু করে খেয়াল করে। আগে যেসব বিষয় একদমই গুরুত্ব পেত না, সেগুলোই এখন তার মনে প্রশ্ন তুলছে।
সেদিন সকালে কলেজে যাওয়ার আগে সে আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ। একটার পর একটা ড্রেস হাতে নিচ্ছিল, আবার রেখে দিচ্ছিল। কিছু পোশাক তার কাছে আগের মতোই সুন্দর লাগছিল, আবার কিছু পোশাক হঠাৎ করেই অস্বস্তিকর মনে হচ্ছিল। ঠিক তখনই তার মাথায় সেই কথাটা ভেসে উঠলো—“পর্দা শুধু কাপড় না… এটা সম্মান।”
সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকালো। নিজের চোখে নিজের একটা নতুন দিক দেখতে পেল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে খুব সাধারণ, ঢিলেঢালা একটা পোশাক বেছে নিলো। সাথে একটা ওড়না নিলো—আগের চেয়ে একটু গুছিয়ে, একটু সচেতনভাবে। এটা কোনো বড় পরিবর্তন না, এমনকি হয়তো কেউ খেয়ালও করবে না। কিন্তু তার নিজের কাছে এটা ছিল একেবারে নতুন একটা শুরু।
কলেজে ঢুকতেই তানহা অবাক হয়ে বললো, “আজকে এত সিম্পল কেন?” খাদিজা হালকা হেসে বললো, “এমনিই…” তানহা আবার বললো, “তুই তো সবসময় একটু স্টাইল করে আসিস!” খাদিজা আর কিছু বললো না। সে বুঝতে পারছিল—প্রশ্ন শুরু হয়ে গেছে, কিন্তু সে এখনো উত্তর দেওয়ার মতো জায়গায় পৌঁছায়নি।
ক্লাসের মাঝেও সে আজ অন্যরকম ছিল। আগে মাঝেমধ্যে ফোন বের করে সোশ্যাল মিডিয়া দেখতো, আজ সেটা করলো না। মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করলো। পুরোটা পারলো না, কিন্তু চেষ্টা করলো—এটাই তার কাছে নতুন। এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলোই তাকে নিজের কাছে আলাদা মনে করাচ্ছে।
বিকেলে বাসায় ফিরে সে আবার ফোন হাতে নিলো। আগের মতোই স্ক্রল করতে লাগলো। কিন্তু এবার কিছু একটা বদলে গেছে। ইসলামিক পোস্টগুলো এখন তার চোখে আটকে যায়। সে স্কিপ করে না, বরং পড়ে। একটি পোস্টে লেখা ছিল—“যে পরিবর্তন তুমি আজ শুরু করবে, কাল সেটা তোমার পরিচয় হয়ে যাবে।”
খাদিজা থেমে গেলো। সে অনেকক্ষণ সেই লাইনটার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার ভেতরে প্রশ্ন উঠলো—“আমি কি সত্যিই বদলাতে পারবো?” সাথে সাথে ভয়ও কাজ করলো। কারণ সে জানে—এই পথটা সহজ না, এই পথটা একা হাঁটতে হয়।
সন্ধ্যায় বাসায় একটা ছোট ঘটনা ঘটলো। মা রান্নাঘরে কাজ করছিলেন। খাদিজা গিয়ে বললো, “মা, আমি হেল্প করি?” মা অবাক হয়ে তাকালেন। “আজকে কী হয়েছে? তুই আবার রান্নাঘরে!” খাদিজা হেসে বললো, “এমনিই… শিখি একটু।” মা কিছু বললেন না, কিন্তু তার চোখে বিস্ময় স্পষ্ট ছিল। কারণ এই পরিবর্তনটা একদম হঠাৎ।
খাওয়ার টেবিলে বসে বড় আপুর কথা উঠলো। মা বললেন, “তোর আপু কালকে আসবে।” খাদিজা চুপচাপ শুনছিল। তার মনে হালকা একটা কৌতূহল তৈরি হলো—“আপু আমাকে এখন কেমন দেখবে?”
পরদিন নাঈমা আপু আসলো আগের মতোই—স্টাইলিশ, আত্মবিশ্বাসী, নিজের জগতে অভ্যস্ত। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, তার জীবনে কোনো পরিবর্তন নেই। কিছুক্ষণ পর সে খাদিজার দিকে তাকিয়ে বললো, “তুই এত চুপচাপ কেন?” তারপর ড্রেসের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলো, “এত সিম্পল কেন? তুই তো আগে এমন ছিলি না!”
কথাগুলো মজা করে বলা হলেও, তার ভেতরে একটা খোঁচা ছিল। খাদিজা একটু অস্বস্তি অনুভব করলো। সে বুঝতে পারলো—এটাই শুরু। মানুষ প্রশ্ন করবে, বিচার করবে, কিন্তু বুঝতে চাইবে না।
সন্ধ্যায় আবার আপু বললো, “লাইফটা এনজয় কর। এত সিরিয়াস হওয়ার কিছু নাই। এই বয়সে এসব ভাবলে পরে আফসোস করবি।” কথাটা খাদিজার মনে গেঁথে গেলো। কারণ কিছুদিন আগেও সে নিজেও এমনটাই ভাবতো।
রাতে নিজের রুমে এসে সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকলো। একদিকে শিফার কথা—ধীরে শুরু করার উপদেশ, আরেকদিকে আপুর কথা—জীবন উপভোগ করার আহ্বান। দুটো দিক, দুটো পথ, আর সে মাঝখানে দাঁড়িয়ে।
সে আয়নার সামনে গিয়ে নিজের চোখের দিকে তাকালো। আগের মতো অস্থিরতা এখনো আছে, কিন্তু সাথে নতুন কিছু যোগ হয়েছে—চিন্তা, উপলব্ধি, প্রশ্ন। সে ধীরে বললো, “আমি আসলে কী চাই?”
এই প্রশ্নটা এখন আর ফাঁকা না। এর ভেতরে গভীরতা আছে।
সেদিন রাতে সে একটা ছোট কাজ করলো। ঘুমানোর আগে ফোনটা পাশে রেখে দিলো। কোনো ভিডিও দেখলো না, কোনো গান শুনলো না। শুধু চুপচাপ শুয়ে থাকলো। তারপর খুব আস্তে বললো—
“আল্লাহ… যদি এই পথটা সত্যিই ভালো হয়… তাহলে আমাকে বুঝিয়ে দিন…”
দোয়াটা খুব ছোট ছিল, কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে সত্য, সবচেয়ে আন্তরিক দোয়া ছিল হয়তো।
সেদিন প্রথমবার—খাদিজা শুধু ভাবেনি, সে খুঁজতে শুরু করেছে। আর সেই খোঁজটাই হয়তো তার হিজরতের আসল শুরু।
___
পড়ার পর অবশ্যই একটি রিয়েক্ট দিবেন ইনশাআল্লাহ। আর আপনার অনুভূতি ও সবচেয়ে ভালো লাগা অংশটা জানাবেন ইনশাআল্লাহ।একটা ছোট রিয়েক্ট আর রিভিউও আমার জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা
(চলবে ইন শা আল্লাহ…)