01/04/2026
অনুমতি ছাড়া মাদরাসা পরিবর্তন প্রসঙ্গে
-মাওলানা আব্দুল মালেক হাফি.
যাঁদের কাছে ও যে প্রতিষ্ঠানে আমি তালীম হাসিল করছি সেখানে যদি পরবর্তী পড়াশোনার ব্যবস্থা থাকে তা হলে শরাফতের দাবি, পরবর্তী পড়াশোনাও সেখানে সমাপ্ত করা। এরপর ঐ উস্তাদগণের সাথে মশোয়ারা করে তাঁদের অনুমতি ও সন্তুষ্টি অনুযায়ী অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে যাওয়া। কোনো অসুবিধা বা অপারগতার কারণে আগেই যদি মাদরাসা পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে সন্তুষ্টি না হোক, অনুমতি তো অবশ্যই নেওয়া উচিত। উস্তাদগণেরও কর্তব্য, তালিবে ইলমের কল্যাণ ও সুবিধাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া এবং মাদরাসা পরিবর্তন যদি তার জন্য কল্যাণকর হয় তা হলে খুশির সাথে অনুমতি দেওয়া।
হযরত পাহাড়পুরী দামাত বারাকাতুহুম তাঁর নিজের ঘটনা শুনিয়েছেন যে, পাহাড়পুর মাদরাসায় (মুরাদনগর, কুমিল্লা) ঐ সময়ের সর্বশেষ জামাতের পড়াশোনা যখন সমাপ্ত হল, তখন আমরা সবাই মাদরাসাতেই বসেছিলাম যে, উস্তাদগণই ফয়সালা করবেন, আমরা কখন যাব এবং কোথায় যাব। শেষে উস্তাদগণ ফয়সালা করেছেন এবং আমাদেরকে স্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেছেন।
মাদরাসা আরাবিয়া খেড়িহরে এখনও শেষ জামাত মিশকাত। শা’বান ১৪০৭ হিজরীর শুরুতে (১৯৮৭ঈ.) আমাদের অত্যন্ত পেরেশানীর বিষয় এই ছিল যে, ঐ উস্তাদগণের কাছেই দাওরা পড়ার কোনো ব্যবস্থা হল না! আমরা অনেক মিনতি করেছি যে, একবছরের জন্য হলেও দাওরা খুলুন, যেন আমরা দাওরা এখানেই পড়তে পারি। কিন্তু তাঁরা মঞ্জুর করেননি। এটা তাঁদের নীতি যে, ব্যক্তি ও উপকরণের যথেষ্ট ব্যবস্থা হওয়া ছাড়া নতুন কোনো জামাত খোলা হবে না, বিশেষত যখন অন্যান্য বড় মাদরাসার দ্বারা প্রয়োজন পূরণ হচ্ছে। এই ঘটনায় মাদরাসার জিম্মাদারগণের জন্যও এই অনুসরণীয় আদর্শ আছে যে, যথাযথ ব্যবস্থা ছাড়া নতুন জামাত খুলে ছাত্রদেরকে পরীক্ষায় ফেলা ঠিক নয়।
হযরত হারদুয়ী রাহ. থেকে সরাসরি শুনেছি, লোকেরা বারবার বলে যেন এখানে, মাদরাসা দাওয়াতুল হক হারদুয়ীতে দাওরা খুলি। আমরা বলি, ‘ভাই প্রতিষ্ঠান কি কম? দেওবন্দ আছে, সাহারানপুর আছে, ওখানে চলে যাও।’
এখন তো গোটা দুনিয়া থেকে ছাত্ররা দেওবন্দমুখী হয়ে থাকে। কিছু হাসিল করার পরিবর্তে সম্ভবত বরকত গ্রহণের নিয়তই প্রধান হয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃত বরকত তো হাসিল করার মাঝেই রয়েছে। দেওবন্দি চিন্তা-চেতনাই যদি হাসিল না হয় তাহলে এই কষ্টের ফল কী?
যাক, একসময় তো এটিও ছিল নতুন মাদরাসা। মিশকাতের পর দাওরা পড়ার জন্য কেউ গাঙ্গুহ, কেউ দিল্লী ... কিন্তু (হাকীমুল উম্মত) আশরাফ আলী (রাহ.) বললেন, আমাদের কাছে এটা গায়রতের খেলাফ মনে হল যে, এ পর্যন্ত যাঁদের কাছে পড়লাম তাদের কাছে দাওরা পড়ব না! তো দাওরা এখানেই পড়লাম।
গতকালের ঘটনা। এক তালিবে ইলম এসেছেন, তিনি ইফতা বিভাগে দাখেলা নিতে চান। মশোয়ারা চাইলেন, কোথায় দাখেলা নিবেন। তা’লীমী মুরব্বীর বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে বললেন, তিনি এ বিষয়ে পরামর্শ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। এরপর কথাপ্রসঙ্গে জানা গেল, তিনি হিফয থেকে দাওরায়ে হাদীস, এরপর উলূমুল হাদীস একই মাদরাসায় পড়েছেন। আমি তাকে মোবারকবাদ দিলাম এবং আরজ করলাম, অবশিষ্ট তালীমও ওখানেই হাসিল করুন। সামান্যই বাকী আছে। এটার জন্য অন্য কোথাও যেয়ে এই কীর্তির অঙ্গহানী করা থেকে বিরত থাকুন। ওখানে হযরত মাওলানা সাদেকুল ইসলাম ছাহেব আছেন, যিনি হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ. এর যমানায় দারুল উলূম করাচীতে ইফতা বিভাগে তালীম হাসিল করেছেন। তাঁর সোহবতকে গনীমত মনে করুন।
জানিনা, আজকাল ছাত্রদের বারবার মাদরাসা পরিবর্তনের এত আগ্রহ কেন। এর একটি বড় দায় তো এই যে, এতে উস্তাদ অনেক বেশি হয়ে যান, যার ফলে হক্ব আদায়ের পরিধিও অনেক বেড়ে যায়। হক্ব আদায়ের বিষয়ে আমাদের অলসতা ও উদাসীনতা তো এখন অবর্ণনীয়। এরপরও এত হক নিজের উপর কেন আরোপ করছি? উপযুক্ত কারণ ছাড়া আমরা যেন মাদরাসা পরিবর্তন না করি। উপযুক্ত কারণ থাকলেও ইস্তিখারা ও মশোয়ারার পরই যেন পরিবর্তন করি।
- মাসিক আল কাউসার