10/07/2025
সাহসের গল্প
মাওলানা৷ যাইনুল আবিদীন
আবু কুদামা শামী। শাম দেশের সাহসী নাগরিক। মুসলমানদের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম। তার জীবনে সবচে’ প্রিয় বিষয় ছিল আল্লাহর পথে জিহাদ। জিহাদের নাম শোনতেই তার সর্বশক্তি নেচে ওঠতো। ঝড় শুরু হতো রক্তে। একদিন তিনি পাক মদীনায় বসে আছেন। হেরেম শরীফে। এক ব্যক্তি এসে বসে পড়ল সামনে। পরম আগ্রহের সাথে জিজ্ঞেস করল- আবু কুদামা! আপনার এই বিশাল যুদ্ধজীবনে আপনাকে অবাক করেছে এমন কোন ঘটনা মনে পড়ে?
: পড়ে.......
: শুনতে পারি?
: অবশ্যই পার । শোন, সত্যিই অবাককরা গল্প । শোনতে পেলাম ‘
রিক্কায় যুদ্ধ বেঁধেছে। সীমান্তে তুমুল তোলপাড়। বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। রিককায় পৌঁছে আমি একটা উট কিনলাম। যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র বয়ে নিতে সুবিধা হবে, তাই। সেখানকার মসজিদে আমি একটা লম্বা বক্তৃতাও দিলাম । সমবেত সকলকে জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করলাম। তাছাড়া আল্লাহর দীনের জন্যে সম্পদ বিসর্জনের প্রতিও আহ্বান জানালাম। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। আমি রাতে থাকার জন্যে একটা ঘর ভাড়া নিলাম। কথাবার্তা সেরে সেখানে চলে এলাম বিশ্রাম নেব বলে। রাত তখন গভীর। হঠাৎ দরজায় করাঘাত। আমি তো বিস্ময়ে অবাক । এখানে তো আমাকে কেউ চিনবার কথা নয়। কে এলো এত রাতে? কেন? আমি সংশয়জড়ানো পায়ে দরজার কাছে গেলাম। কম্পিত হাতে দরজা খুলে দিলাম ।
একি! এক অপার্থিব সুন্দরী । নিস্পাপ লজ্জাবতী চাদরাবৃতা। যতটুকু প্রকাশিত সেখান থেকে ঠিকরে বেরুচ্ছে জোছনা। ভয়ে আমার কণ্ঠ শুকিয়ে কাঠ। বললাম, আল্লাহর বান্দী! কী চাই!
: আপনি আবু কুদামা?
: হ্যা, আমি আবু কুদামা!
: যুদ্ধের জন্যে চাঁদা সংগ্রহ করছেন আপনি?
: জী, করছি!
একথা শুনে সে আমার হাতে একটি চিরকুট আর একটি কাপড়ে বাঁধা পুটুলি তুলে দিয়ে চলে গেল। লক্ষ করলাম, যাওয়ার সময় সে কাঁদছে! আমার তো বিস্ময়ের অন্ত নেই। প্রবল উত্তেজনায় চিরকুটটি খুললাম। দেখি, এই বিদূষী লিখেছে-
‘আবু কুদামা! আপনি আমাদের জিহাদের প্রতি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমি একজন নারী। আমার পক্ষে জিহাদে যাওয়া সম্ভব নয়। আপনাকে যুদ্ধযাত্রায় সাহায্য করতে পারি এমন সম্পদও আমার নেই। আমি আমার সবচে’ সুন্দর সম্পদ- আমার বেণী দুটি কেটে রশি পাকিয়ে দিলাম। এই রশি দিয়ে আপনার ঘোড়া বাঁধবেন । আল্লাহর পথের একজন মুজাহিদের ঘোড়ার রশি হয়েছে আমার মাথার প্রিয় বেণী- হয়তো এই উসিলায় আল্লাহ আমাকে মাফ করে দিবেন। আমাকেও বেহেশত নসীব করবেন।
আমি তো অবাক! জিহাদের প্রতি একজন নারীর এমন টান। ক্ষমা ও বেহেশতের প্রতি এক অবলা নারীর এই আকুলতা- তাকে ভাবতেও দেয়নি, এভাবে মাথার বেণী কেটে ফেলার অনুমতি ইসলাম দেয়নি। তার মাথায় তো ছিল বেহশত আর মুক্তির উতলা আবেগ। আমি তার চিরকুটটি আমার ঝোলায় রেখে দিলাম।
ভোর হলো।
ফজর পড়লাম। বন্ধুদের নিয়ে রিককা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। সামনেই মাসলামা ইবনে আবদুল মালেক দুর্গ। আমরা দুর্গের যখন একেবারে কাছাকাছি তখন পেছন থেকে চিৎকার শোনতে পেলাম। ফিরে তাকালাম। আমার নাম ধরেই তো ডাকছে। হ্যা, আবু কুদামা... আবু কুদামা... একটু দাঁড়াও...
বন্ধুদের বললাম, তোমরা যাও। দেখি এই অশ্বারোহী কী চায়! আমার একেবারে কাছে চলে এলো ঘোড়সওয়ার । হাঁপাতে হাঁপাতে বলল- আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ আমাকে তোমার সঙ্গ থেকে বঞ্চিত করেননি। ব্যর্থ হয়ে আমাকে ঘরে ফিরে যেতে হল না।
: তুমি কি চাও? বললাম আমি ।
: তোমার সাথে জিহাদে যাব!
: মুখোশ সরাও। যুদ্ধের বয়স হলে আপত্তি করব না। ছোট হলে অবশ্যই ফিরে যেতে হবে।
মুখোশ সরালো সে । আল্লাহ! এ যেন পূর্ণিমার চাঁদ। বয়স সতের।
: তোমার বাবা আছেন বাপু?
: বাবাকে ক্রুসেডাররা হত্যা করেছে। যারা আমার বাবাকে খুন করেছে আমি তাদের প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে বেরিয়েছি।
: তোমার মা বেঁচে আছেন?
: বেঁচে আছেন।
: মায়ের কাছে ফিরে যাও। মায়ের সেবা কর । ভালোমত মায়ের সেবা করলে তার পায়ের নিচেই তোমার বেহেশত। এবার সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। বলল, আমার মাকে চেনেন না আপনি?!
: না তো!
: যিনি আমানত রাখলেন!
: আমানত মানে?
: মানে রশি!
: বুঝিয়ে বল!
: সুবহানাল্লাহ! এত দ্রুত ভুলে গেছেন। গত রাতেই একজন মেয়ে মানুষ আপনার কাছে এসেছিলেন । তিনি একটি চিরকুট আর একটি থলে দিয়েছেন। থলের মধ্যে ছিল আপনার ঘোড়া বাঁধার রশি। মনে পড়েছে?
: হ্যা, মনে পড়েছে । কিন্তু তার বিষয়টা কি বল তো!
: এই আমার মা। আমাকে জিহাদে যাবার আদেশ দিয়েছেন। খোদার কসম দিয়ে বলেছেন- আমি যেন আর তার কোলে ফিরে না যাই। আর বলেছেন ‘যখন বেঈমানদের মুখোমুখি দাঁড়াবে তখন কাউকে পালিয়ে যেতে দেবে না। আল্লাহর জন্যে জীবন বিলিয়ে দিবে। আল্লাহর সান্নিধ্যই কেবল প্রার্থনা করবে। তোমার বাবা ও মামাদের সাথে বেহেশত চাইবে। আল্লাহ যদি তোমাকে শাহাদাত দান করেন তাহলে আমার জন্যে সুপারিশ করবে। তারপর মা আমাকে বুকে টেনে নিলেন। আকাশের দিকে তাকালেন। বললেন,এলাহী! ওগো আমার মনিব ও মালিক! এ আমার আত্মজ। আমার আত্মার কুসুম । আমার হৃদয়ের ফল। তোমার কাছে সঁপে দিলাম। একে তার বাবা ও মামাদের পাশে ঠাই দাও!
আমি তার কথায় অবাক! তারপর ছেলেটি আমাকে বলল- চাচা! আল্লাহর দোহাই! আমাকে ফিরিয়ে দিবেন না। আমাকে আপনার সাথে যুদ্ধে নিয়ে চলুন। ইনশাআল্লাহ, আমি হব শহীদের পুত্র শহীদ। আমি আল্লাহর কালাম হেফয করেছি। ঘোড়া চালাতে জানি। তীর নিক্ষেপেও প্রশিক্ষণ নিয়েছি। বয়স একটু কম বলে অবহেলা করবেন না। সত্যি কথা কি, আমি তার সাথে তর্কে হেরে গেলাম। তাকে ফিরিয়ে দিতে পারলাম না। দেখলাম, সে মিথ্যা কিছু বলেনি। কর্মে তার উদ্যমতা কাফেলায় সবার শীর্ষে। ঘোড়দৌড়ে তাকে কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারে না। কোথাও নোঙর করার পর দেখি- সেই চঞ্চল প্রাণ । ঠোট তার আল্লাহর যিকিরে সদা কম্পমান।
আমরা সীমান্তে পৌছলাম। তখন বেলা ডুবে গেছে। আমরা ছিলাম রোযাদার। ইফতার তৈরি করতে হবে। খাবার রান্না করতে হবে। কাফেলা নোঙর করতেই সে আমাকে খোদার দোহাই দিয়ে বলল, আজ আমাদের খাবার সেই রান্না করবে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হয়েছে। ছেলেটি ক্লান্ত। আমরা তাকে বাধা দিতে চাইলাম। কিন্তু সে মানতে নারাজ। সে আমাদের তাঁবুগুলো ছেড়ে খানিকটা দূরে চলে গেল। রান্নার ধূম যেন আমাদের যন্ত্রণা না দেয়। আমরা বসে আছি ।
খানিকটা দেরি হয়ে গেল।
বন্ধুরা বলতে লাগল- আবু কুদামা! দেখ না তোমার বন্ধুর কী খবর! নাশতা ও খাবার কদ্দূর!
আমি পা বাড়ালাম। এগিয়ে গিয়ে দেখি- আগুন জ্বেলেছে। চুলোয় হাড়িও চড়িয়েছে। তার শরীর জুড়ে ছিল ক্লান্তি । কখন যে পাথরে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে বেচারা টেরও পায়নি।
ভাবলাম- একে জাগানো ঠিক হবে না। ফিরে গিয়ে রান্না হয়নি বলব- এটাই বা কেমন দেখাবে। তারচে ভালো আমিই শুরু করে দিই। আমি রান্নায় নেমে পড়লাম। আড়চোখে তাকে দেখছি । হঠাৎ লক্ষ করলাম, ছেলেটি নরোম করে হাসছে। হাসিটা তার ক্রমাগত বাড়ছে। আমি তো অবাক। ঘুমের মধ্যে এভাবে ক্রমাগত হাসছে । তারপর তো বিস্ময়ের আর অন্ত রইল না। এখন আর নরোম করে নয়। রীতিমত অট্টহাসি। আমি খাবার রান্না করছি। পাশেই ছেলেটি হাসছে। কী মুখর মুগ্ধ পরিবেশ! হঠাৎ করেই ছেলেটির ঘুম ভেঙে গেল। ওঠে বসল সে। তারপর আমাকে দেখেই চমকে উঠল। বলল, চাচাজান! আমি দেরি করে ফেলেছি। ছাড়ুন, আমিই রান্না করছি । বললাম, মোটেও দেরি করোনি। অস্থির হবার কিছুই নেই।
না, আমাকে চুলো ছাড়ুন। আমি আপনাদের খাদেম।
বললাম, খেদমত করতে দেব- তার আগে বলতে হবে, ঘুমের মধ্যে মিটমিট করে হাসছিলে কেন?
: এটা একটা খাবমাত্র ।
: খোদার দোহাই, কি খাব বল!
: এটা আমার ও আল্লাহর মাঝে ছেড়ে দিন।
: আল্লাহর দোহাই দিচ্ছি, তোমাকে এটা বলতেই হবে।
: চাচাজান! তাহলে শুনুন! স্বপ্নে দেখলাম আমি বেহেশতে চলে গেছি। আহ্, কী যে তার রূপ সৌন্দর্য দীপ্তি । ঠিক কুরআনে যেমনটি আছে তেমনি। আমি হাঁটছি। বেহেশতের সৌন্দর্য বিভায় আমি অসীম মুগ্ধ। হঠাৎ দেখি একটি আলো ঝলমল মহল। সোনা-রূপার ইট দিয়ে তৈরি। বেলকনি আর বারান্দাগুলো মণিমুক্তা, হীরা-জহরতে তৈরি। দরজাগুলো স্বর্ণনির্মিত। জানালার ওপর অসাধারণ পর্দা দুলছে। সেই পর্দা ঠেলে উঁকি দিল ক’টি মুখ। মুখ তো নয় পূর্ণিমার চাঁদ। আমি তাদের রূপ দেখে তো আত্মহারা। তাদের মধ্যে সবচে’ রূপবতী যে রমণী সে তার ডান পাশের রূপসীকে আমার দিকে ইঙ্গিত করে বলছে- এটা মারদিয়্যার স্বামী । আমি তো মারদিয়্যাকে চিনি না। তাই তাকেই জিজ্ঞেস করে বসলাম- আচ্ছা, তুমিই কি মারদিয়্যাহ?
: না না! আমি মারদিয়্যা হব কেন!
: তাহলে!?
: আমি তার দাসীদের একজন।
: মারদিয়্যা কোথায়?
: তুমি মারদিয়াকে দেখবে?
: হোঁ।
: তাহলে মহলে ঢুকে পড়।
আমি মহলে ঢুকে পড়লাম। দেখি কি, মহলের উপর তলায় একটি লাল রঙের সোনার তৈরি কক্ষ। সবুজ যবরজদ পাথরের একটি পালঙ্ক । পালঙ্কের খুঁটিগুলো শুভ্র রূপোর। তাতে উপবিষ্ট এক কুমারী। মুখ তার সূর্যের মত উজ্জ্বল। আল্লাহ দয়া করেছেন- নইলে আমার চোখ অন্ধ হয়ে যেত। তার রূপ-লাবণ্যে আমার বিবেক-বুদ্ধি ছাই হবার দশা। আমাকে দেখেই অপরূপা কথা বলতে শুরু করল আমার সাথে। বলল, আল্লাহর বন্ধু, তোমাকে স্বাগতম! আমি তোমার আর তুমিও আমার!
আমি তাকে দেখে, তার কথা শোনে এগিয়ে গেলাম। তার শরীরে যেই হাত রাখতে গেছি অমনি বলে উঠল, প্রিয় বন্ধু আমার! আল্লাহ তোমাকে সংযমী করুন। তোমার হায়াত এখনো সামান্য বাকি। কাল যোহরের সময় তোমার সাথে আমার সাক্ষাৎ হবে । চাচা! তার এই কথা শোনেই আমি হেসেছি । আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছি। বললাম, তুমি ভালো স্বপ্ন দেখেছো!
তারপর আমরা ইফতার করলাম। ইফতার শেষে সকলে মিলে রওনা হলাম। সীমান্তের উদ্দেশে। সীমান্তে আমাদের যোদ্ধা বন্ধুরা অপেক্ষা করছিলেন। আমরা তাদের সাথে রাত কাটালাম। যথাসময়ে ফজর পড়লাম। সূর্যটা সবে উঁকি দিয়েছে।
দেখলাম, শত্রুপক্ষ হাজির। আমাদের সিপাহসালার সবাইকে সারিবদ্ধ দাঁড় করিয়ে দিলেন। তারপর পবিত্র কুরআন থেকে সূরা আনফালের কিছু আয়াত তেলাওয়াত করে শোনালেন। আল্লাহর পথে জেহাদের প্রতিদানের কথা বললেন। বললেন শাহাদাতের অসীম প্রতিদানের কথা। সিপাহসালার বলে যাচ্ছেন- জীবনদানের ভেতর দিয়েই হেসে ওঠে জীবন... লক্ষ করলাম চারদিকে প্রাণের চাঞ্চল্য।
সবাই ভাই বন্ধু স্বজনকে কাছে টেনে নিচ্ছে।
? কিন্তু সেই নওল যোদ্ধা...
তার তো কাছে টানবার মতো বাবা নেই ।
পাশে এসে দাঁড়াবার মত এখানে চাচা নেই, ভাই নেই। আমি অপলক তাকিয়ে আছি তার দিকে। দেখলাম- যুদ্ধের প্রথম সারিতে সে। আমি সৈনিকের কাতার ভেঙে চলে গেলাম সামনে। দাঁড়ালাম তার পাশে। বললাম, যুদ্ধের কোন অভিজ্ঞতা আছে তোমার? : না। জীবনে এই প্রথম যুদ্ধে এসেছি।
: বিষয়টি তুমি যেমন ভেবেছ তেমন নয়। এখানে শুধু লড়াই- রক্ত গর্জন বীর্যবানের নর্তন আর তীর বর্শার শাঁ শাঁ সাঁতার ।
: মানে!
: তুমি একেবারে পেছনে চলে যাও। যদি আমরা জয় লাভ করতে পারি তুমিও জয়ী হবে আমাদের সাথে । আর যদি হেরে যাই তাহলে অন্তত প্রথমেই মারা পড়বে না। সে আমার দিকে তাকাল। তার চোখে সাত আকাশ বিস্ময়।
: চাচা, আমাকে আপনি এই কথা বলছেন?
: হ্যাঁ, তোমাকে আমি এই কথাই বলছি।
: আপনি চান আমি দোযখে যাই?
: খোদার কসম, অবশ্যই না।
: চাচা, বেহেশত পাওয়ার আশায়ই তো ছুটে এসেছি এতদূর।
তারপর সে আমাকে তেলাওয়াত করে শোনাল
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوهُمُ الْأَدْبَارَ (15) وَمَنْ يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ} [الأنفال: 15، 16]
হে মুমিনগণ! তোমরা যখন কাফের বাহিনীর মুখোমুখি হবে তখন তোমরা
তাদের পিঠ দেখাবে না। সেদিন যুদ্ধ কৌশল অবলম্বন কিংবা দলে স্থান গ্রহণ ছাড়া কেউ তাদের পিঠ দেখালে সে তো আল্লাহর বিরাগভাজন হবে এবং তার আশ্রয় হবে জাহান্নাম- আর তা কত যে নিকৃষ্ট আশ্রয় । [আনফাল: ১৫-১৬]
চাচা! আপনি কি চান আমি শত্রুদের পিঠ দেখিয়ে দোযখে যাই!?
জেহাদের প্রতি তার আগ্রহ আর পবিত্র কুরআনের আবেগ-মথিত উদ্ধৃতি শোনে তো আমি অবাক! বললাম, বাবা, কুরআনে কিন্তু আমি যা বলেছি তার বিরুদ্ধে কিছু বলা হয়নি। কিন্তু সে তার কথায় অটল। পেছনে ফিরবার নয়।
আমি তাকে হাত ধরে শেষ সারিতে নিয়ে আসতে চাইলাম। আর সে তার হাত ছাড়িয়ে নিচ্ছে।
শুরু হলো যুদ্ধ।
উত্তেজিত তেজস্বী ঘোড়া আমাদের দুইজনকে দুই দিকে তাড়িয়ে দিল। উভয় পক্ষ থেকে বীরযোদ্ধারা অবতীর্ণ হলো মাঠে। শুরু হলো তীরবৃষ্টি। ক্রমে তরবারী কোষমুক্ত হলো। সৈন্য ছত্রভঙ্গ হলো। হাত পা দ্রুত রক্তমুখর । লড়াই রূপ নিল ভীষণ । আমরা সকলেই তখন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত । দিন বাড়ছে। বাড়ছে যুদ্ধের তেজ।
মনে হচ্ছিল, আমাদের মাথার উপর চুলো জ্বলছে। হাতে তরবারি ধরে রাখাই দায়। মুখ ব্যদান করে আছে শত্রুর তরবারী। কে কার দিকে তাকাবে? তুমুল যুদ্ধের ভেতর দিয়েই গড়িয়ে গেল সূর্যটা। যোহর নামাযের সময়। আল্লাহ ক্রুসেডারদের পরাজিত করলেন। বিজয় নিশ্চিত হবার পর আমরা যোহর নামায আদায় করলাম। নামায শেষে সবাই নিজ নিজ আপনজনের খুঁজে নেমে পড়ল । কিন্তু এই ছেলেকে খুঁজবে কে? ভাবলাম, আমিই খুঁজব । ছেলেটা শহীদ হলো, আহত হলো- না দুশমনরা আবার ধরে নিয়ে গেল! আমি আহত ও শহীদদের মাঝে তাকে খুঁজতে লাগলাম। আমি যখন অস্থির চিত্তে তাকে খুঁজছি তখনই পেছন থেকে শোনতে পেলাম কে যেন চিৎকার করে বলছে- কে আছো, আমার চাচা আবু কুদামাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও!'
আমি আওয়াজটা অনুসরণ করে ছুটে গেলাম। দেখি, এই তো সোনামুখ কিশোরের দেহ! তীর বিধে আছে শরীরে। ঘোড়া তার শরীর থেতলে দিয়েছে। শরীরের মাংস পিষে ফেলেছে। আপন রক্তে স্নাত তার মুখ । হাড়গোড় ভেঙে গেছে। পাশে দাঁড়াবার কেউ নেই। আমি তার সামনে গিয়ে হাঁটু পেতে বসে পড়লাম। চিৎকার করে বললাম- এই তো আমিই আবু কুদামা! আমিই আবু কুদামা!! কী আশ্চর্য! তার কণ্ঠে জড়তা নেই। বলল- আলহামদুলিল্লাহ! আমি বেঁচে থাকতেই চাচাজান আপনি এলেন। আমার কিছু অসিয়ত । মন দিয়ে শুনুন!
আমি কান্না ধরে রাখতে পারলাম না। তার চরিত্র ও সৌন্দর্য আমাকে কাঁদাচ্ছে । তার মায়ের কথা আমার অশ্রুনদে ঝড় তুলছে। আহা! কীভাবে মহিয়সী প্রার্থনা করে দিলেন তার ছেলে যেন গিয়ে মিলিত হয় শহীদ বাবা ও মামাদের সাথে । চোখের সামনে আমি তাই দেখছি। কাপড়ের আঁচলে আমি তার আভাদীপ্ত মুখখানি মুছে দিতে গেলাম। টের পেল । চোখ তুলে তাকাল। বলল, চাচাজান! আপনার কাপড় দিয়ে আমার রক্ত মুছছেন? আমার কাপড় দিয়ে মুছুন।
আমি কেবল কাঁদলাম।
কোন জবাব খুঁজে পেলাম না।
তারপর ক্ষীণকণ্ঠে বলল, খোদার দোহাই চাচা! যদি রিককায় ফিরে যান তাহলে আমার মাকে এই সুসংবাদটুকু দেবেন- ‘আল্লাহ তাঁর উপহার গ্রহণ করেছেন। তাঁর ছেলে আল্লাহর পথে শাহাদাত বরণ করেছে। যুদ্ধ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি।
চাচাজান! মা হয়তো আপনার কথা মানতে চাইবে না। আমার রক্তমাখা কিছু কাপড় সঙ্গে নিয়ে যান। মা আমার রক্তমাখা কাপড় দেখলে বিশ্বাস করবেন তার ছেলে আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছেন। বলবেন- আমাদের দেখা হবে। বেহেশতে।
চাচাজান! আপনি আমাদের ঘরে গেলে দেখবেন আমার ছোট্ট একটি বোন আছে। তার বয়স এখন নয় বছর। আমি যখনই ঘরে যেতাম সে আনন্দে নেচে ওঠতো। ঘর থেকে বের হতে দেখলেই কষ্ট পেত, কেঁদে ফেলত। গেল বছর বাবার শাহাদাত তাকে কষ্ট দিয়েছে। এবার আমার শাহাদাত! আমার গায়ে সফরের পোশাক আর মা আমাকে সাজিয়ে দিচ্ছেন দেখে বলেছিল- ভাইয়া! বেশি দেরি করো না। তাড়াতাড়ি ফিরে এসো! তাকে একটু সান্ত্বনা দেবেন। বলবেন- তোমার ভাইয়া বলেছে তার হয়ে আল্লাহই তোমাকে দেখবেন।
আমি তাকিয়ে আছি।
তার শ্বাস ঘন হয়ে ওঠছে। কণ্ঠ ক্ষীণতর হয়ে আসছে। ঠোটের কম্পন দেখি। বুঝি না কি বলতে চায়! তারপর হঠাৎ করেই বলতে লাগল- চাচা! আল্লাহ আমার স্বপ্নটা সত্য করেছে । কাবার মালিকের কসম! এই তো আমার মাথার কাছে মারদিয়্যা! আমি তার সুবাস পাচ্ছি।
তারপর তার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল। ঘামে কপালটা চিকচিক করছে। বড় করে ক’টা শ্বাস নিল। নীরবে থেমে গেল কম্পন।
আমি অবাক বিস্ময়ে পাথর!!
গর্ব হয়, আমাদের ইতিহাসটা এতদূর হেঁটে এসেছে এই সাহসিনীদের হাত ধরেই । যে জাতির মায়েরা তাদের কলজেহেঁড়া ধন আপন আত্মজকে এভাবে সাজিয়ে দিতে পারে যোদ্ধার বেশে তাদের দমিয়ে রাখতে পারে না কেউ।
বি.দ্র; গল্পটি মাওলানা যাইনুল আবিদীন সাহেব এর বিখ্যাত বই
"সাহসের গল্প" বই থেকে সংগৃহীত