24/08/2026
কুরআন মাজিদ তিলাওয়াত; অন্তর পরিশুদ্ধ করে
মানুষের দেহ যেমন খাদ্য ছাড়া দুর্বল হয়ে পড়ে, তেমনি মানুষের অন্তরও আল্লাহ তাআলার স্মরণ ও তাঁর বাণীর সুধা ছাড়া ধীরে ধীরে শুষ্ক হয়ে যায়। দুনিয়ার ব্যস্ততা, পাপের কালিমা, হতাশা, দুশ্চিন্তা, হিংসা, অহংকার ও অস্থিরতা মানুষের অন্তরকে ভারী করে তোলে। সেই ভারাক্রান্ত হৃদয়ে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দিতে পারে যে মহৌষধ, তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাম—আল-কুরআন। কুরআন শুধু একটি গ্রন্থ নয়; এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য হেদায়াতের আলো, জীবনের পথনির্দেশ এবং মুমিনের অন্তরের প্রশান্তির উৎস।
কুরআন মাজিদ তিলাওয়াতের মুহূর্তটি যেন বান্দার সঙ্গে তার রবের এক অপার্থিব কথোপকথন। যখন একজন মুমিন ধীরে ধীরে কুরআন মাজিদের আয়াত উচ্চারণ করে, তখন তার জিহ্বা উচ্চারণ করে আল্লাহর কালাম, কান শ্রবণ করে পবিত্র বাণী, আর হৃদয় সেই বাণীর আলোয় আলোকিত হতে থাকে। অশান্ত হৃদয় যেন তখন বলে ওঠে “আমি আমার আশ্রয় খুঁজে পেয়েছি।”
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” (সূরা আর-রাদ: ২৮)। কুরআন শরিফ তিলাওয়াত আল্লাহ তাআলার স্মরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। তাই কুরআনের আয়াত যখন হৃদয়ে প্রবেশ করে, তখন দুশ্চিন্তার অন্ধকার ধীরে ধীরে সরে যায়, বিষণ্ণতার মেঘ কেটে যায় এবং অন্তরে জন্ম নেয় এক গভীর প্রশান্তি, যে প্রশান্তি দুনিয়ার কোনো সম্পদ দিয়ে কেনা যায় না।
কুরআন মাজিদ তিলাওয়াত মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে। পাপের কারণে হৃদয়ে যে মরিচা জমে, কুরআনের আয়াত তা মুছে দিতে সাহায্য করে। আল্লাহর ভয় জাগায়, তওবার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে এবং নিজের ভুল ও অপরাধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কখনো একটি আয়াত মানুষকে নিজের জীবনের দিকে নতুন করে তাকাতে শেখায়; কখনো একটি সতর্কবাণী তাকে পাপের পথ থেকে ফিরিয়ে আনে; আবার কখনো আল্লাহ তাআলার রহমতের একটি আয়াত তার ভেঙে যাওয়া হৃদয়ে আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়।
কুরআন তিলাওয়াত শুধু পাপ থেকে দূরে রাখে না, মানুষের চরিত্রকেও সুন্দর করে। কুরআন মানুষকে সত্যবাদিতা, ধৈর্য, ক্ষমা, বিনয়, ন্যায়পরায়ণতা, তাকওয়া ও মানুষের প্রতি দয়া শেখায়। নিয়মিত কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হলে মানুষের কথা, চিন্তা, আচরণ ও জীবনযাপনে তার প্রভাব পড়তে থাকে। কারণ কুরআন শুধু পড়ার জন্য নাজিল হয়নি; বরং পড়া, বোঝা, চিন্তা করা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করার জন্য নাজিল হয়েছে।
কুরআনের তিলাওয়াতে এমন এক মাধুর্য আছে, যা হৃদয়কে অদৃশ্যভাবে স্পর্শ করে। একজন মানুষ হয়তো ভাষার প্রতিটি শব্দের অর্থ জানে না, তবুও আল্লাহ তাআলার কালামের ধ্বনি তার অন্তরে প্রশান্তির ঢেউ তুলতে পারে। আর যখন সে অর্থ বুঝে তিলাওয়াত করে, তখন সেই অনুভূতি আরও গভীর হয়। কোনো আয়াতে আল্লাহর রহমতের ঘোষণা শুনে চোখে পানি আসে, কোনো আয়াতে জাহান্নামের ভয়াবহতা শুনে হৃদয় কেঁপে ওঠে, কোনো আয়াতে জান্নাতের কথা শুনে আত্মা আশাবাদী হয়ে ওঠে। এভাবেই কুরআন মানুষের হৃদয়ের গভীরে নীরবে কাজ করতে থাকে।
আজকের পৃথিবীতে মানুষ প্রযুক্তিতে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে, কিন্তু হৃদয়ের প্রশান্তি যেন ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠছে। হাতে অসংখ্য বিনোদনের মাধ্যম, চারপাশে অসংখ্য শব্দ- তবুও অন্তরে এক ধরনের শূন্যতা। সেই শূন্যতা দুনিয়ার ভোগ-বিলাস দিয়ে পূর্ণ হয় না। কারণ মানুষের অন্তর তার স্রষ্টাকে ছাড়া পূর্ণতা পায় না। কুরআন সেই অন্তরকে তার প্রকৃত ঠিকানা স্মরণ করিয়ে দেয়।
বিশেষ করে ফজরের নীরবতা, রাতের নিস্তব্ধতা কিংবা দিনের ব্যস্ততার মাঝখানে কিছু সময় কুরআনের জন্য নির্ধারণ করা হৃদয়ের জন্য এক অমূল্য উপহার। যখন পৃথিবীর কোলাহল কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায়, মানুষ ও তার রবের মধ্যে যেন এক নিবিড় সম্পর্কের দরজা খুলে যায়। একটি মুসহাফ, একটি শান্ত হৃদয় এবং কয়েকটি আয়াত, কখনো কখনো এতটুকুই একজন মানুষের দিনকে বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
কুরআন হাকিম তিলাওয়াতের প্রয়োজন তাই শুধু সওয়াব অর্জনের জন্য নয়; বরং আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। যেমন প্রতিদিন শরীরকে খাবার দিতে হয়, তেমনি অন্তরকেও প্রতিদিন কুরআনের আলো দিতে হয়। আজ একটি পৃষ্ঠা, কাল আরেকটি পৃষ্ঠা, এভাবেই কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হতে থাকে। একসময় কুরআন শুধু ঘরের তাকের একটি পবিত্র গ্রন্থ থাকে না; বরং জীবনের পথচলার সঙ্গী হয়ে ওঠে।
তাই আসুন, আমরা কুরআনকে শুধু রমজানের সঙ্গী না বানিয়ে জীবনের প্রতিদিনের সঙ্গী করি। শুধু তিলাওয়াত নয়, বরঞ্চ তিলাওয়াতের সাথে সাথে অর্থ বুঝি, আয়াত নিয়ে চিন্তা করি এবং জীবনে প্রয়োগ করার চেষ্টা করি। যখন হৃদয় কঠিন হয়ে যাবে, কুরআনের কাছে ফিরে আসি; যখন দুশ্চিন্তা আমাদের ঘিরে ধরবে, কুরআনের কাছে ফিরে আসি; যখন পথ হারিয়ে ফেলব, কুরআনের কাছে ফিরে আসি।
কারণ কুরআন এমন এক আলো, যা পথ দেখায়; এমন এক সুধা, যা হৃদয়কে সিক্ত করে; এমন এক আয়না, যাতে মানুষ নিজের অন্তরকে দেখতে পায়; আর এমন এক রহমতের দরজা, যার দিকে ফিরে গেলে মানুষ তার রবের নৈকট্য অনুভব করতে পারে।
হে আল্লাহ, আমাদের জিহ্বাকে কুরআনের তিলাওয়াতে সিক্ত করুন, আমাদের কানকে তার শ্রবণে আনন্দিত করুন, আমাদের অন্তরকে তার আলোয় পরিশুদ্ধ করুন এবং আমাদের জীবনকে কুরআনের আদর্শে সুন্দর করে দিন। কুরআনকে আমাদের হৃদয়ের বসন্ত, জীবনের পথপ্রদর্শক এবং আখিরাতের নাজাতের মাধ্যম বানিয়ে দিন।
আমিন!
লিখেছেন-
মুফতি ইজহারুল ইসলাম মিসবাহ্