11/10/2014
শিশু ও তরুণদের অধিকার আদায়ের
সংগ্রামে অবদানের
স্বীকৃতি হিসাবে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন
তালেবান হামলায়
বেঁচে যাওয়া পাকিস্তানি কিশোরী মালালা ইউসুফজাই
এবং ভারতের শিশু অধিকার কর্মী কৈলাস
সত্যার্থী।
নরওয়ের নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান
থরবিয়ন জাগল্যান্ড শুক্রবার এক সংবাদ
সম্মেলনে চলতি বছরের নোবেল
শান্তি পুরস্কারের জন্য যৌথভাবে তাদের
নাম ঘোষণা করেন।
১৭ বছর বয়সী মালালা ইতিহাসের
সর্বকনিষ্ঠ নোবেলজয়ী, যিনি মেয়েদের
শিক্ষা বন্ধ করে দেয়ার প্রতিবাদ
করে তালেবান হামলার মুখে পড়েন
এবং গুলিবিদ্ধ হয়েও
বেঁচে ফিরে এসে নারী শিক্ষার জন্যই কাজ
করে চলেছেন।
আর ৬০ বছর বয়সী কৈলাস গত দুই দশকেরও
বেশি সময় ধরে ভারতে শিশু শ্রমের
বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছেন,
গড়ে তুলেছেন ‘বাচপান বাঁচাও’ আন্দোলন।
শান্তিতে নোবেল জয়ী এই দুইজন এমন
দুটি প্রতিবেশী দেশের প্রতিনিধি,
যে দেশগুলো ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হওয়ার পর
থেকে চারবার যুদ্ধে জড়িয়েছে; কাশ্মির
সীমান্তে দুদিন আগেও দুই দেশের
সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে।
নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান বলেন, “একজন
হিন্দু, অন্যজন মুসলমান; একদিকে একজন
ভারতীয়, অন্যদিকে একজন পাকিস্তানি;
একই লক্ষ্য নিয়ে, শিক্ষার অধিকারের
দাবিতে এবং উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম
চালিয়ে যাচ্ছেন- যা নোবেল কমিটির
কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।”
কৈলাস সত্যার্থী তার নোবেল
পুরস্কারকে উৎসর্গ করেছেন সেই শিশুদের
জন্য, দারিদ্র্যের কারণে যাদের দাসত্বের
জীবন কাটাতে হচ্ছে।
নোবেল জয়ের খবরে সিএনএন-
আইবিএনকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায়
তিনি বলেন, “যে শিশুরা আজো দাসত্বের
জীবন কাটাচ্ছে, শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছে,
অথবা পাচারের শিকার হচ্ছে-এই সম্মান
তাদের সবার জন্য।”
তাৎক্ষণিকভাবে মালালার
কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া না গেলেও
পরে তিনি বলেন, নোবেল পাওয়া খবর
শুনে তিনি অভিভূত। যখন পুরস্কার
ঘোষণা হয়, তখন তিনি রসায়ন
ক্লাসে ছিলেন।
নোবেল কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়,
“শিশুদের অবশ্যই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ
দিতে হবে এবং অবশ্যই তাদের শ্রমিক
হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না। বিশ্বের
দরিদ্র দেশগুলোর মোট জনগোষ্ঠীর ৬০
শতাংশের বয়স ২৫ বছরের কম। বিশ্বের
শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের স্বার্থেই শিশু ও
তরুণদের অধিকারকে সম্মান দেখাতে হবে।”
কৈলাস সম্পর্কে নোবেল কমিটির মূল্যায়ন,
তিনি গান্ধীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সম্পূর্ণ
শান্তিপূর্ণভাবে শিশুশ্রম বন্ধের
দাবিতে এবং আর্থিক লাভের জন্য শিশুদের
ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও আন্দোলন
চালিয়ে আসছেন অসম সাহসের সঙ্গে।
“শিশু অধিকার নিয়ে বিভিন্ন
আন্তর্জাতিক কনভেনশনেও তার গুরুত্বপূর্ণ
অবদান রয়েছে।”
মালালা সম্পর্কে নোবেল কমিটি লিখেছে,
“বয়সে তরুণ হলেও গত কয়েক বছর
ধরে তিনি নারী শিক্ষার অধিকার
আদায়ে লড়াই চালিয়ে আসছেন। শিশু ও
তরুণদের সামনে তিনি এই নজির গড়েছেন,
যে নিজেদের অবস্থার উন্নয়নের চেষ্টায়
তারাও অবদান রাখতে পারে। আর এই লড়াই
তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন
সবচেয়ে বেশি বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতির
মধ্যে থেকে।”
এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারের
মনোনয়নে মোট ২৭৮ জনের নাম আসে, যাদের
মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন নজরদারির খবর
ফাঁস করে দেওয়া এডওয়ার্ড স্নোডেন, পোপ
ফ্রান্সিস, জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন,
কঙ্গোর চিকিৎসক ডেনিস মাকোয়েজ ও
রাশিয়ার সংবাদপত্র নভোয়া গেজেটার
নামও ছিল।
রাসায়নিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার চেষ্টার
স্বীকৃতি হিসাবে গত বছর নোবেল
শান্তি পুরস্কার পায় আন্তর্জাতিক
সংস্থা 'অর্গানাইজেশন ফর দ্য
প্রোহিবিশন অফ কেমিক্যাল উইপনস
(ওপিসিডব্লিউ)। গতবারের মনোনয়নের
তালিকাতেও মালালার নাম ছিল।
গত বছর নোবেল না পেলেও জাতিসংঘ
মানবাধিকার পুরস্কার, ইউরোপীয়
ইউনিয়নের ‘শাখারভ’ মানবাধিকার
পুরস্কারসহ বেশ কয়েকটি সম্মাননা পান এই
পাকিস্তানি কিশোরী।
পুরস্কার বাবদ একটি সোনার মেডেল ও ৮০
লাখ সুইডিশ ক্রোনার (১২ লাখ ৫০ হাজার
ডলার) পাবেন মালালা ও কৈলাস।
আগামী ১০ ডিসেম্বর
অসলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের
হাতে তুলে দেওয়া হবে এ পুরস্কার।
মালালা ইউসুফজাই হলেন
পাকিস্তানে জন্ম নেয়া তৃতীয়
নোবেলজয়ী এবং এ পুরস্কার পাওয়া ৪৭তম
নারী। আর কৈলাসের সত্যার্থীর আগে মোট
সাতজন ভারতীয় নোবেল পেয়েছেন।
মালালা ইউসুফজাই
পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকার
মেয়ে মালালা ইউসুফজাইয়ের জন্ম ১৯৯৭
সালের ১২ জুলাই।
নারী শিক্ষার বিরোধী তালেবান
জঙ্গিদের এলাকায় বসে মেয়েদের
স্কুলে যাওয়ার
পক্ষে বিবিসি ব্লগে লেখালেখি করে তিনি যখন
পশ্চিমা বিশ্বের নজর কাড়েন, তখন তার বয়স
মাত্র ১১। কিন্তু নারী শিক্ষার
পক্ষে কথা বলায় তাকে পড়তে হয়
প্রাণনাশের হুমকির মুখে।
২০১২ সালের ৯ অক্টোবর সোয়াত উপত্যকার
মিনগোরাত এলাকায় ১৪ বছর
বয়সী মালালা ও তার দুই বান্ধবীকে স্কুলের
সামনেই গুলি করে তালেবান জঙ্গিরা।
পাকিস্তানে তার মাথায় অস্ত্রোপচার
করে বুলেট সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও
পরে যুক্তরাজ্যের কুইন এলিজাবেথ
হাসপাতালে তাকে উন্নত
চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ওই ঘটনা বিশ্বেজুড়ে আলোড়ন তোলে,
মালালর স্বপ্ন সফল করতে ২০১২ সালের ১০
নভেম্বরকে ‘মালালা দিবস’
ঘোষণা করে জাতিসংঘ।
তাৎক্ষণিকভাবে পাকিস্তানে ফিরতে না পারলেও
মালালা যুক্তরাজ্যে থেকে তার লড়াই
চালিয়ে যেতে থাকেন। পাকিস্তান,
নাইজেরিয়া, জর্ডান, সিরিয়া ও কেনিয়ার
মেয়েদের শিক্ষার সহায়তায় গঠন করেন
মালালা ফান্ড।
গত বছর জাতিসংঘ সাধারণ
অধিবেশনে অংশ নিয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের
উপস্থিতিতে এক বক্তৃতায় মালালা বলেন,
“চরমপন্থিরা বই আর কলমকে ভয় পায়।
তারা নারীদেরকে ভয় পায়।…
তালেবানরা ভেবেছিল বুলেট
দিয়ে আমাদের স্তব্ধ করে দেবে। কিন্তু
তারা ব্যর্থ হয়েছে।”
প্রতিটি শিশুর স্কুলে যাওয়া নিশ্চিত
করতে বিশ্ব নেতাদের জরুরি পদক্ষেপ
নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মালালা বলেন, “আসুন আমরা খাতা কলম
হাতে তুলে নেই। এগুলোই আমাদের
সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সবার আগে শিক্ষা,
শিক্ষাই সমস্যার একমাত্র সমাধান। একজন
শিশু, একজন শিক্ষক, একটি কলম ও বই
গোটা বিশ্বকে পরিবর্তন
করে দিতে পারে।”
কৈলাস সত্যার্থী
সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে কৈলাস
সত্যার্থী লিখেছেন, কেবল বাবা-মায়ের
দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা,
অজ্ঞানতা বা শিক্ষা ব্যবস্থার
অনগ্রসরতার কারণেই যে শিশুরা শ্রম
দিতে বাধ্য হচ্ছে- তা নয়। আসল বিষয় হচ্ছে,
বহু ব্যবসায়ী সস্তা শ্রম
খাটিয়ে বেশি লাভের জন্য শিশুদের
শ্রমিক হিসাবে ব্যবহার করছে।
ভারতে যারা শিশু অধিকার আন্দোলনের
নেতৃত্ব দিচ্ছেন, ১৯৫৪ সালের ১১
জানুয়ারি মধ্যপ্রদেশে জন্ম নেওয়া কৈলাস
তাদেরই একজন।
১৯৯০ এর দশক থেকে শিশু অধিকার
প্র্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ব্যাপকভাবে সক্রিয়
হলেও কৈলাস সত্যার্থীকে বিষয়টি প্রথম
নাড়া দেয় মাত্র ৬ বছর বয়সে।
স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে প্রতিদিনই তার
চেয়েও কম বয়সী এক শিশুকে দেখতেন বাবার
সঙ্গে জুতা পলিশ করতে।
বিষয়টি তাকে এতটাই নাড়া দিয়েছিল যে,
প্রতিদিনই তিনি লজ্জিত হতেন।
সেই তাড়নায় ১১ বছর বয়স থেকেই শুরু হয়
কৈলাসের চেষ্টা। দরিদ্র পরিবারের
সন্তানদের বই বা অর্থ
দিয়ে সহায়তা করতে সমবয়সীদেরও উৎসাহ
যোগাতে থাকেন ওই বয়সেই।
১৯৮০ এর দশকে ইলেক্ট্রিক্যাল
ইঞ্জিনিয়ারের
চাকরি ছেড়ে পুরোদমে শিশু অধিকারের
আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন কৈলাস। গড়ে তোলেন
‘বাচপান বাঁচাও’ আন্দোলন,
যে সংগঠনটি সারা ভারতে এ পর্যন্ত ৮০
হাজারেরও বেশি শিশুকে শ্রমের দাসত্ব
থেকে মুক্ত করেছে। এসব শিশুর পুনর্বাসন আর
শিক্ষাও নিশ্চিত করেছে ‘বাচপান বাঁচাও’।
শুধু ভারত নয়, কৈলাস
বিশ্বব্যাপী নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডেও
নিজেকে জড়িয়েছেন। গ্লোবাল মার্চ
অ্যাগেইনস্ট চাইল্ড লেবার, ইন্টারন্যাশনাল
সেন্টার অন চাইল্ড লেবার অ্যান্ড
এডুকেশনের পাশাপাশি গ্লোবাল
ক্যাম্পেইন ফর এডুকেশনের সঙ্গেও কাজ
করে যাচ্ছেন।
কম্বল ও কার্পেট প্রস্তুতকারক
প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের শ্রমিক
হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি-
না তা পর্যবেক্ষণ করে সনদ দেওয়ার জন্য
কৈলাস গড়ে তোলেন ‘রাগমার্ক’
নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন,
যা বর্তমানে ‘গুডউয়েভ নামে পরিচিত।”
তার এই সংগঠন ১৯৮০ এবং ৯০-এর
দশকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে কারখানায়
শিশুশ্রম ব্যবহারের বিষয়ে ক্রেতাদের
মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে প্রচার চালায়। এর
ফলে বিশ্বজুড়ে কার্পেট প্রস্তুত ও
সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
শিশুশ্রমকে একটি মানবাধিকার ‘ইস্যু’
হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার
পাশাপাশি একে কল্যাণ ও সেবামূলক বিষয়
হিসেবে তুলে ধরতেও সক্ষম হন কৈলাস।
তিনি দেখিয়েছেন, দারিদ্র, কর্মহীনতা,
অশিক্ষা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সামাজিক
সমস্যা সমাজে শিশুশ্রম বাড়িয়ে দেয়।
শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে ‘সবার জন্য
শিক্ষা’ আন্দোলনের সঙ্গে একীভূত করতেও
ভূমিকা রাখেন এই ভারতীয়।
শিশুশ্রম রোধ এবং শিশুদের
শিক্ষা নিশ্চিত করতে জাতীয় ও
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন,
চুক্তি স্বাক্ষরের পেছনেও তার অবদান
রয়েছে।
এসব কাজের স্বীকৃতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের
‘ডিফেন্ডার অফ ডেমোক্রেসি অ্যাওয়ার্ড
(২০০৯), স্পেনের আলফনসো কোমিন
ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড (২০০৮), মেডেল
অফ দ্য ইটালিয়ান সিনেটসহ (২০০৭) বিভিন্ন
পুরস্কার আর খেতাবে ভূষিত হয়েছেন
কৈলাস সত্যার্থী।