21/06/2026
এক মুষ্টি দাঁড়ি লম্বা রাখা ওয়াজিব
শায়খ মুফতী হাফীজুদ্দীন দা.বা.
ইসলামী শরিয়তের সুস্পষ্ট বিধান অনুযায়ী প্রত্যেক মুসলিম পুরুষের জন্য দাঁড়ি রাখা ও তা কমপক্ষে এক মুষ্টি পরিমাণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা আবশ্যক। দাঁড়ি মুন্ডন করা কিংবা এক মুষ্টির কম করে ছেঁটে ফেলা ফুকাহায়ে কেরামের নিকট নাজায়েজ, হারাম এবং কবীরা গুনাহ। দাঁড়ি রাখা এবং তা এক মুষ্টির কম কর্তন না করার নির্দেশ অসংখ্য সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এ বিষয়ে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করা হলো,
১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
خَالِفُوا الْمُشْرِكِينَ، أَوْفُوا اللَّحَى وَأَحْفُوا الشَّوَارِبَ
" মুশরিকদের বিরোধিতা করো; দাঁড়ি বৃদ্ধি করো এবং গোঁফ ছোট করো।" (সহীহ বুখারী, ২/৮৭৫)
২. হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
جُزُوا الشَّوَارِبَ وَأَرْخُوا اللَّحَى، خَالِفُوا الْمَجُوسَ
"গোঁফ ছোট করো, দাঁড়ি বৃদ্ধি করো এবং মাজুসীদের বিরোধিতা করো।" (সহীহ মুসলিম, ১/১২৯)
৩. হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
عَشْرٌ مِنَ الْفِطْرَةِ: قَصُّ الشَّارِبِ وَاعْفَاءُ اللَّحْيَةِ
"দশটি বিষয় ফিতরতের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে গোঁফ ছোট করা এবং দাঁড়ি বৃদ্ধি করা।" (সহীহ মুসলিম, ১/১২৯)
৪. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত,
كَانَ ابْنُ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُمَا إِذَا حَجَّ أَوِ اعْتَمَرَ قَبَضَ عَلَى لِحْيَتِهِ فَمَا فَضَلَ أَخَذَهُ
অর্থ: "হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা যখন হজ বা উমরা করতেন, তখন তিনি তাঁর দাঁড়ি মুষ্টিবদ্ধ করে ধরতেন; অতঃপর এক মুষ্টির অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলতেন।” (সহীহ বুখারী হা. ৫৮৯২)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুমা এর আমল থেকে জানা যায়, কমপক্ষে দাঁড়ি এক খুষ্টি পরিমাণ রাখা ওয়াজিব। তার নিচে কর্তন করা জায়েজ নেই, হারাম।
চার মাযহাবের ফকীহগণের দৃষ্টিতে দাঁড়ির পরিমাণ:
হানাফী মাযহাব:
১. আল্লামা ইবনে হুমাম রহ. লিখেছেন,
وَأَمَّا الْأَخْذُ مِنْهَا وَهِيَ دُونَ ذَلِكَ كَمَا يَفْعَلُهُ بَعْضُ الْمَغَارِبَةِ وَمُخَنَّثَةِ الرِّجَالِ فَلَمْ يُبِحْهُ أَحَدٍ
অনুবাদ: "দাঁড়ি ছেঁটে এক মুষ্টির কম করে ফেলা যেমন কিছু পশ্চিমাঞ্চলীয় লোক এবং নারীর সাদৃশ্য গ্রহণকারী পুরুষেরা করে থাকে এটিকে কোনো আলেমই বৈধ বলেননি।" (ফাতহুল কাদীর, শরহে হিদায়াহ, ২/২৭০)
২.
يَحْرُمُ عَلَى الرَّجُلِ قَطْعُ لِحْيَتِهِ وَفِيهِ السُّنَّةُ فِيهَا الْقَبْضَةُ
অনুবাদ: "পুরুষের জন্য দাঁড়ি কেটে ফেলা হারাম। আর দাঁড়ির সুন্নত পরিমাণ হলো এক মুষ্টি।” (দুররে মুখতার, ৪/২২৩)
৩. শাইখ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহ. 'আশিআতুল লামআত'-এ লিখেছেন,
حلق کردن لحیہ حرام است و گذاشتن آن بقدر قبضہ واجب است
অনুবাদ: " দাঁড়ি মুণ্ডন করা হারাম এবং এক মুষ্টি পরিমাণ দাঁড়ি রাখা ওয়াজিব।" (আশিআতুল লামআত, ১/২২৮)
৪. খাতামুল মুহাদ্দিসীন আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. বলেন,
أَمَّا قَطْعُ مَا دُونَ ذَلِكَ فَحَرَامٌ إِجْمَاعًا بَيْنَ الْأَئِمَّةِ অনুবাদ: "এক মুষ্টির কম দাঁড়ি রাখা হারাম। এ বিষয়ে ইমামগণের সর্বসম্মত ঐকমত্য রয়েছে।" (ফয়যুল বারী, ৪/৩৮০)
শাফেয়ী মাযহাব:
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ আবদুর রউফ মুনাভী শাফেয়ী রহ. লিখেছেন, "দাঁড়িকে বাড়তে দিতে হবে এবং এমনভাবে রাখতে হবে যাতে তা মর্যাদা ও গাম্ভীর্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। তবে এতটা ছোট করা যাবে না যে তা কামানো দাঁড়ির ন্যায় মনে হয়। আবার এত দীর্ঘও করা যাবে না যে তা কুশ্রী ও বেমানান দেখায়। বরং মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা উত্তম। কেননা প্রত্যেক বিষয়ে ভারসাম্য ও পরিমিতিই সৌন্দর্য।" (ফিকহুস সুন্নাহ, ১/৩৮)
মালেকী মাযহাব:
মালেকী মাযহাবের বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ কাজী ইয়ায মালেকী রহ. বলেন, "দাঁড়ি মুণ্ডন করা এবং অতিরিক্ত কাটাছেঁড়া করা মাকরূহ। তবে দাড়ির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ থেকে কিছু অংশ ছেঁটে নেওয়া উত্তম। যেমন দাঁড়িকে অতিরিক্ত ছাঁটা মাকরূহ, তেমনি অস্বাভাবিক দীর্ঘ দাড়ির কারণে খ্যাতি লাভের মানসিকতাও মাকরূহ।" (শরহে মুসলিম, ইমাম নববী, ১/১২৯)
অর্থাৎ, এক মুষ্টির কম কিংবা অস্বাভাবিকভাবে তার চেয়ে বেশি রাখা সুন্নতের পরিপন্থী; আর এক মুষ্টি পরিমাণ দাঁড়িই সুন্নতের অনুকূল ও মধ্যম পন্থা।
হাম্বলী মাযহাব:
শাইখ মনসুর ইবনে ইউসুফ হাম্বলী রহ. লিখেছেন,
وَيُعْفِي لِحْيَتَهُ وَيَحْرُمُ حَلْقُهَا
অনুবাদ: "দাঁড়িকে সুন্নতসম্মত পরিমাণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা আবশ্যক এবং তা মুণ্ডন করা হারাম।" (আর-রাওদুল মুরাব্বা', ১/১৯; মুখতাসারুল মুকনি', পৃ. ৯৬)
উপরোক্ত হাদীস, সাহাবায়ে কিরামের আমল এবং চার মাযহাবের ফকীহদের উদ্ধৃতি থেকে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, সুন্নতসম্মত পরিমাণ দাঁড়ি কমপক্ষে এক মুষ্টি রাখা ওয়াজিব। তার নিচে কর্তন করা বা ছেঁটে রাখা হারাম ও কবিরা গুনাহ।
আর আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাঁড়ি মুবারক ছিল পূর্ণ ও সুদীর্ঘ। তাঁর মহান আদর্শের অনুসারী সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমও দাঁড়িকে ইসলামী শিআর ও পরিচয়ের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং আমৃত্যু তা রেখেছেন। অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসার দাবি করে, তার জন্য এ মহান সুন্নতকে অবহেলা করা কীভাবে সম্ভব!। ব্লেড, ক্ষুর বা অন্যান্য উপায়ে দাঁড়ি মুন্ডন করা কিংবা এমনভাবে ছেঁটে ফেলা যাতে তা শরিয়ত নির্ধারিত সীমার নিচে নেমে আসে; এমন কাজ আমাদের বোধগম্য নয়। একজন মুমীন হিসেবে এমন গর্হিত কাজ সত্যিই বিস্ময়কর!। মূলত এ ধরনের প্রবণতা মুসলিম সমাজে বিজাতীয় সংস্কৃতি ও জীবনধারার প্রভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দাঁড়ি মুন্ডন ও তা এক মুষ্টির কম ছেঁটে রাখার এই প্রবণতা মূলত মুশরিক, ইয়াহুদ-নাসারা এবং পরবর্তীকালে পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাব থেকে মুসলিম সমাজে বিস্তার লাভ করেছে। অথচ ইসলামে বিজাতীয় জাতির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের অন্ধ অনুসরণ কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এ কারণে আমাদের কর্তব্য হলো, যুবক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সকল মুসলিম পুরুষ যেন দাঁড়ি রাখার অভ্যাস গড়ে তুলি, নবী-রাসূলদের আদর্শকে আপন জীবনে ধারণ করি এবং ইসলামের এই মহান শিআরকে যথাযথ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করি। আল্লাহতালা আমাদের সকলকে তৌফিক দান করুন। আমীন।