31/07/2025
“রুহির শেষ হাসি”
(একজন বাবার ভাঙা হৃদয় আর একটা ছোট্ট মেয়ের মরিচের স্বপ্ন)
---
স্টেশনটার নাম হয়তো কেউ মনে রাখে না। কোনো ব্যস্ত জংশন না, না আছে খাবারের দোকানের ভিড়, না আছে হকারদের হইচই। একটা ফাঁকা সকালে প্ল্যাটফর্মটা নীরবতা গিলছিলো যেন।
ট্রেন আসতে তখনও খানিক দেরি। আমি ক্লান্ত হয়ে এক কোণে বসেছিলাম। সূর্য তখনও উঠছে, রোদ এখনও মৃদু, বাতাসে একটা ছুঁয়ে যাওয়া বিষণ্নতা।
হঠাৎ চোখে পড়লো, এক মধ্যবয়সী মানুষ রেল লাইনের একপাশে বসে আছেন। মুখ নিচু, গা ছেঁড়া লুঙ্গি, মলিন একটা টি-শার্ট, পায়ের স্যান্ডেল ছিঁড়ে গেছে প্রায়। পাশে একটা বড় পলিথিনের ব্যাগ—ভর্তি লাল আর সবুজ বোম্বাই মরিচে। মরিচগুলো এত টাটকা আর চকচকে যে মনে হচ্ছিলো যেন কিছুক্ষণ আগেই ক্ষেত থেকে তুলে এনেছেন।
আমি অভ্যাসবশত জিজ্ঞেস করলাম,
— “ভাই, মরিচ কত করে?”
লোকটি মাথা না তুলেই বললো,
— “ভাই, মরিচ এইগুলা বেচুম না।”
তার কণ্ঠে এক ধরনের ভার ছিলো, একধরনের ক্ষয় হয়ে যাওয়া গলা… যেন বুকের ভেতর জমে থাকা শোকের ধ্বনি।
আমি হেসে বললাম,
— “মরিচ নিয়ে বসে আছেন আর বলছেন বেচবেন না! তাহলে সঙ্গে করে এনেছেন কেন ভাই?”
সে ধীরে ধীরে মুখ তুললো। তার মুখে না ছিলো কোনো রাগ, না বিস্ময়।
শুধু দুটো কাচের মতো ভিজে চোখ… লালচে, নিস্তব্ধ।
বললো,
— “এই মরিচগুলা আমি আমার মাইয়ার জন্য আনছিলাম, ভাই… কিন্তু আমার রুহি আর নাই...”
এক মুহূর্তে আমার শরীরটা বরফ হয়ে গেলো।
কথা আটকে গেল গলায়।
আমি চুপচাপ বসে পড়লাম তার পাশে, রেললাইনের ধারে। গলা শুকিয়ে গেছে। বললাম,
— “মেয়ের জন্য মরিচ আনলেন কেন ভাই? কী হয়েছিলো?”
তার চোখ ছলছল করছিলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো, যেন তার বুকের ভারটা আকাশের মাঝেই ছেড়ে দিতে চাইছে।
তারপর বলতে লাগলেন—
---
**“আমার বাড়ি কালীগঞ্জ আড়িখোলা। খুব ছোট একটা ঘর, সামনের জমিতে মরিচ আর চালের চাষ করতাম। গরীব মানুষ আমরা, খালি একটাই আশা আছিলো—আমার রুহি।
“ওর মায়ে জন্মের সময়ই মারা যায়। আমি একাই বড় করছি। বইল্যারে কই, মাইয়া হইলেও ছেলের মত করেই বড় করছি। ফুটফুটে মুখ, দুই চোখে ঝিলিক। খালি হাসতো। আমার যত কষ্ট, যত অপমান, ওর এক হাসিতে ভুলে যেতাম। খালি বলত—‘আব্বা, তোর চুলগুলা দাঁড়ায়া গেছে!’, এই কথা শুনেই হাসতাম।
“ওর জ্বর হইলো, প্রথমে পাত্তা দেই নাই। ডাক্তার কইলো সিজনাল ভাইরাস। তিন মাস পার হইলো, জ্বর কমে না। হাসিও নাই। চাইলেও কিছু খায় না। চেহারা শুকায়ে খাটের কাঠের মতো হইয়া গেছে। ও চোখে তাকায়, কইতে পারে না—কিন্তু বোঝায় যেন ‘বাঁচতে চাই’।
“শেষে শহরে নিয়া গেছিলাম। ডাক্তার রিপোর্ট হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ কইরা থাকলো, তারপর বললো—‘Acute lymphoblastic leukemia’—রক্ত ক্যান্সার।
“আমি বুঝতেও পারি নাই প্রথমে। ডাক্তার বললো—চিকিৎসা করাতে হবে, কেমোথেরাপি, ব্লাড ট্রান্সফিউশন। ওর বয়স কম, হয়তো বাঁচার সম্ভাবনা আছে, যদি সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
“ঘরে যা ছিলো সব বিক্রি করলাম। জমি গেলো, গরু গেলো, মায়ের পুরনো গয়নাও গেলো। ধার করলাম, সোনা বন্ধক দিলাম, পা ধরলাম মানুষজনের। তবুও পেরে উঠছিলাম না।
“রুহি একদিন বললো—‘আব্বা, আমি যদি মরি না, আমি বড় হইয়া ডাক্তার হমু। গরীব মানুষগুলারে বাঁচামু।’
আমি বুকের মধ্যে লুকায়ে কান্দলাম… কিন্তু মুখে বললাম—‘তুই বাঁচবি মা, তুই কিচ্ছু হবি।’
“সেইদিন হাসি দিছিলো রুহি। হয়তো শেষ হাসি আছিলো সেটা। এরপর ওর চুল পইড়া গেলো, হাত পা চিকন কাঠির মত হইয়া গেলো, মুখে শক্তি নাই, কিন্তু চাহনিতে তখনও আশার আলো।
“শেষবার বাড়ি গেছিলাম দুইদিন আগে—ধার করার চেষ্টা করতে। যাওয়ার সময় বললো, ‘আব্বা, লাল-সবুজ বোম্বাই মরিচ আনবা আমার লাইগা, খাইতে মন চায়।’
“আমি বললাম—ব্যাগ ভইরা আনমু মা, তুই খাইয়া খাইয়া হাসবি… ঠিক আগের মত।
“আজকেই ফিরার সময় মরিচ কিনলাম। ব্যাগ ভর্তি। হাতে নিয়া ভাবতেছিলাম—মাইয়া খুশি হইবে। ট্রেনে উঠার আগেই ফোন আসলো—‘রুহি আর নাই’।
মরে গেছে আমার মাইয়া…।”
---
তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না। মাথা নিচু করে কাঁদছিলেন… কোনো শব্দ নেই, শুধু শরীর কাঁপছিলো।
আমি পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে বললাম—“আপনি নিয়ে যান ভাই, অন্তত বাড়ি ফিরতে পারবেন…”
তিনি আমার হাতটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন। বললেন—
— “টাকা দিয়ে আমি আর কি করমু ভাই? আমার কিছু নাই, কেউ নাই… এই ব্যাগভর্তি মরিচ ছাড়া। মাইয়ার ইচ্ছা আছিলো খাওয়ার, এখন এই মরিচের মধ্যে তার গন্ধ আছে, তার হাসি আছে, আমি এগুলা কাওরে দিব না… কাওরে না।”
আমি তখন শুধু তার হাতটা ধরেছিলাম শক্ত করে। বললাম—
— “রুহির নামে আমি একটা বোম্বাই মরিচের গাছ লাগাবো ভাই।
আর সবাইকে বলবো লাগাতে। ও বেঁচে থাকবে গাছের ডালে, পাখির ছায়ায়, মরিচের ঝাঁজে… আমাদের হৃদয়ে।”
সে কিছু বললো না। শুধু কেঁদে কেঁদে মাথা ঝাঁকাচ্ছিলো—‘আমার রুহি… আমার রুহি…’
---
ট্রেন চলে এলো। বাঁশি বাজলো।
আমি উঠলাম। জীবিকা তাড়া করছিলো, যেমন করে করে আমাদের সবাইকে তাড়া করে।
আর সে?
সে রেল লাইনের ধারে এক ব্যাগ মরিচ আর একটা মৃত স্বপ্ন নিয়ে বসে রইলো।
আমরা রুহিকে হয়তো ভুলে যাবো। সময়ের বালুতে হারিয়ে যাবে তার নাম, তার ছোট্ট জীবন, তার মরিচের আবদার।
কিন্তু কেউ যদি ভালোবাসতে জানে, যদি চোখে পানি জমে ছোট ছোট কষ্টে, তবে একটা করে মরিচগাছ রুহির নামে লাগিয়ে যাওয়া উচিত।
রুহির গন্ধ থাকবে সেই পাতায় পাতায়।
তার হাসি থাকবে সেই লাল-সবুজ মরিচের ঝাঁজে।
কারণ রুহি হারায় না। রুহি বেঁচে থাকে—যে ভালোবাসে, তার মনে। 🌶️💔🌱