জামিয়া পরিচিতি
[]
দক্ষিণ বঙ্গের ঐতিহ্যবাহী ইলমী বিদ্যাপীঠ মাদীনাতুল উলুম মাসনা মাদরাসা-
মণিরামপুর-যশোর এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।
[]
[]
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে অবতারিত সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ আসমানী গ্রন্থ আল-কুরআন। মানব জীবনে ইহ-পারলৌকিক সফলতা ও মুক্তির বার্তা বয়ে এনেছে এই কুরআন। কুরআন, শিক্ষার প্রতি সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছে। কুরআনে অবতীর্ণ প্রথম কথাটি-ই হলো পড় তোমার প্রভুর নামে। কেননা, শিক
্ষাই জাতির মেরুদন্ড, জাতির উন্নতির সোপান। মুর্খতার অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়ে শিক্ষা মানুষকে সুন্দর, পরিমার্জিত আদর্শ মানুষরূপে গড়ে তোলে। তবে তা মানব রচিত কোনো শিক্ষা ব্যাবস্থা নয়। বরং একমাত্র খোদা প্রদত্ত কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক শিক্ষা ও রাসূলের পূর্ণ আদর্শের অনুকরণ ও অনুসরণের মধ্যে নিহিত রয়েছে মানব জীবনের উভয় জগতের সফলতা। ব্রিটিশ বেনিয়াদের ভারতের ক্ষমতার মসনদ দখল করার পূর্বে কুরআনের শিক্ষাই ছিলো এদেশের একমাত্র শিক্ষা ব্যাবস্থা। কিন্তু তাদের আধিপত্য কায়েম হবার পর ইসলামী শিক্ষার উৎস সেসব মাদরাসা গুলো বন্ধ করে দিয়ে, নিজেদের সভ্যতা, সাংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা ও মুসলমানদের ঈমান-আকীদা, হরণের লক্ষে পাশ্চাত্য ধাচের শিক্ষা ব্যাবস্থা চালু করে। তাদের প্রবর্তিত এশিক্ষা ব্যাবস্থার বিষফল থেকে উপমহাদেশের সরলপ্রাণ মুসলমানদের ঈমান-আকীদা, শিক্ষা-সংস্কৃতি , তাহজীব তামাদ্দুনের হিফাজত ও কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষাব্যাবস্থা পুণপ্রতিষ্ঠার দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলূম দেওবন্দ। প্রতিষ্ঠাতাদের ইখলাস ও কুরবানীর বদৌলতে অতি অল্প সময়ের মধ্যে কুরআন হাদীসের জ্ঞান বিস্তার করে উপমহাদেশের সীমানা পেরিয়ে বহির্বিশ্বেও তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় দেড়শত বছর পর্যন্ত দারুল উলুম দেওবন্দ স্বীয় লক্ষ্যে অবিচল থেকে হাজার হাজার মহাপুরুষের জন্ম দিয়েছে। যারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দ্বীনের সার্বিক খেদমত আঞ্জাম দিয়ে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশের হাজার হাজার কওমী মাদরাসা দারুল উলুম দেওবন্দেরই নমূনা। আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাদীনাতুল উলুম মাসনা বিশ্ববিখ্যাত ইসলামি বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের পাঠ্যক্রমের আলোকে যুগোপযোগী শিক্ষা কারিকুলামে পরিচালিত একটি শীর্ষস্থানীয় বৃহত্তর ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯৩৭ ইং সনে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে অগ্রযাত্রা শুরু হয়। অবশেষে ২০০৬ ইং সনে সর্বোচ্চ ক্লাস দাওরায়ে হাদীস এর সূচনার মধ্য দিয়ে জামিয়া তার দীর্ঘদিনের অভিযাত্রার পূর্ণতা অর্জন করেছে। মাঝে কয়েক বছর দাওরায়ে হাদিস ক্লাস বন্ধ ছিলোা। কিন্তু আল্লাহর শোকর এ বছর (২০২০) আবার খোলা হবে।
কৃতিত্বপূর্ণ শিক্ষা-দীক্ষা তালীম-তারবিয়াতের দিক দিয়ে প্রতিষ্ঠানাটি শুধু দক্ষিণবঙ্গে নয়, বরং সারাদেশের শীর্ষস্থানীয় মাদরাসাগুলোর অন্যতম। এখানকার তালীম-তারবিয়াত সুধিমহল, আলেম-উলামা, শিক্ষানুরাগী সকলের কাছে প্রসংসনীয়। বর্তমানে কর্মচারিসহ ৭৫ জন সুদক্ষ শিক্ষক, স্টাফের সতর্ক নেগরানীতে সকল বিভাগে প্রায় ১৪০০ জন ছাত্র-ছাত্রী ইলমে নববী আহরণে মশগুল আছে।
[]
একনজরে জামিয়া
[]
অবস্থান:
বাংলাদেশের যশোর জেলার অন্তর্গত মণিরামপুর থানার এক নিভৃত পল্লী মাসনা গ্রামে প্রায় ৭২ বছর ধরে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের পতাকা ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাদীনাতুল উলুম মাসনা।
[]
প্রতিষ্ঠাতা:
অলিকুল শিরমণী হযরত মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ (হাফিজ্জী হুজুর রহ.) এর বিশিষ্ট খলীফা হযরত মাওলানা ইরশাদ আলী রহ. ১৯৩৭ সনে জামিয়ার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপণ করেন।
[]
আদর্শ:
জামিয়া ইসলামিয়া মাদীনাতুল উলুম মাসনা মুসলিম জাহানের ইলমী প্রাণকেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দের পদাঙ্ক অনুসারী আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত এক ঐতিহ্যবাহী আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
[]
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য:
* আল্লাহর সন্তুষ্টি আর্জনই এ প্রতিষ্ঠানের একমাত্র উদ্দেশ্য।
* সাহাবায়ে কিরাম, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন, আকাবিরে দ্বীন ও সালাফে সালেহীনের আকীদা, আমল ও গবেষনা প্রসূত জ্ঞানের আলোকে ছাত্রদের কুরআন ও সুন্নাহর পরিপূর্ণ শিক্ষা প্রদাণ করে তাদেরকে আল্লাহর খাঁটি বান্দা ও নায়েবে রাসুল রূপে গড়ে তোলা।
ইলমে দ্বীন হাসিলের সাথে সাথে আমালে সালিহা শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনে ফুটিয়ে তোলা। যাতে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবায়ে কিরাম ও আকাবিরে উম্মতের সার্থক ও যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
* কুরআন সুন্নাহর আলোকে যুগজিজ্ঞাসার উত্তরদান এবং বর্তমান ইজম বিভ্রান্তি রুখে দিয়ে মানব সমাজের সামনে ইসলামের আদর্শ ও শিক্ষা আকর্ষণীয় রূপে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণ প্রদান।
* ছাত্রদেরকে দ্বীনে ইসলামে আত্মনিবেদিত মুআল্লিম, মুবাল্লিগ, মুসলিহ, মুযাক্কি ও মুজাহিদ রূপে গড়ে তোলা।
[]
জামিয়ার শিক্ষা প্রকল্প:
১। মক্তব বিভাগ: মাত্র দুবছরের কোর্সে সহীহ শুদ্ধভাবে কুরআন শরীফ তেলাওয়াত ও আমপারা মুখস্থসহ নামাজের বাস্তব প্রশিক্ষণ, মাসনুন দুআ মুখস্থ ও অত্যাবশ্যকীয় মাসআলা-মাসায়িল এ বিভাগে শিক্ষা দেওয়া হয়।
২। হিফজ বিভাগ: অনুর্ধ্ব চার বছরে সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ তাজবীদসহ বিশুদ্ধরূপে শিক্ষা দেওয়া হয়।
৩। কিরাত বিভাগ: কমপক্ষে হিদায়ার যোগ্যতাসম্পন্ন আগ্রহী ছাত্রদেরকে কিরাতে হাফছ ও সাবআ-আশারা শিক্ষা দেওয়া হয়। এবং দ্বীনের জরুরী জ্ঞান অর্জনকারী যে ছাত্ররা মক্তব বিভাগে খিদমত করতে ইচ্ছুক, তাদেরকে কিরাতে হাফছ শিক্ষাদানসহ মক্তবের যোগ্য উসতাযরূপে গড়ে তোলা হয়।
৪। ইবতিদায়ী বিভাগ: শিশু শ্রেণী থেকে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত কওমী মাদরাসা বোর্ডের সিলেবাস অনুযায়ী আরবী ও বাংলা সকল বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়।
৫। খুছুছি জামাআত: যারা হিফজ শেষ করেছে আথবা বয়স বেশী, কিন্তু তাদের আরবী বিষয়ের যোগ্যতা আছে কিন্তু বাংলা বিষয়ের যোগ্যতা নেই, অথবা বাংলা বিষয়ের যোগ্যতা আছে কিন্তু আরবী বিষয়ের যোগ্যতা নেই তাদেরকে এক বছরে ৫ম শ্রেণীর যোগ্যতাসম্পন্ন করে গড়ে তোলার জন্য খুছুছি জামাত খোলা হয়েছে।
৬। কিতাব বিভাগ: এটি জামিয়ার পূর্ণাঙ্গ ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থাপনা সমৃদ্ধ প্রধান বিভাগ। ছাত্রদেরকে ইসলামি কার্যক্রমের ক্লাস পদ্ধতিতে মাত্র ৯ বছরে যাবতীয় বিষয়ে পূর্ণ পারদর্শী বিজ্ঞ আলেম রূপে গড়ে তোলা হয়। এ বিভাগে উত্তীর্ণ আলেমগণ মাওলানা উপাধি লাভ করেন। এ বিভাগে চারটি স্তর রয়েছে:
(ক) ছানুভী বা মাধ্যমিক স্তর
(খ) মুতাওয়াসসিতাহ বা উচ্চমাধ্যমিক স্তর
(গ)ফজিলত বা স্নাতক স্তর
(ঘ)তাকমীল বা দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স) স্তর।
৭। তাখাসসুস ফী উসূলিল ফিকহি ওয়াল ইফতা : তিন বছর (২ বছর বাধ্যতামূল আর এক বছর ঐচ্ছিক) মেয়াদী কোর্স। এটি হলো উচ্চতর ইসলামি মূলনীতি ও আইন গবেষণা বিভাগ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহ এর আলোকে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদানের যোগ্য আলেম গড়ে তোলার একটি কার্যকরী পদক্ষেপ।
এ বিভাগের মুশরিফ হলেন, জামিয়ার সুযোগ্য মহাপরিচালক আল্লামা মুফতি ইয়াহইয়া বিন ইরশাদ দা: বা:।
৮। মহিলা শাখা : সম্পূর্ণ শরয়ী পর্দার সাথে এযুগের মেয়েদেরকে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার লক্ষ্যে মহিলা মাদরাসা চালু করা হয়েছে। কোলাহলমুক্ত নিরিবিলি পৃথক স্থানে ও পুরুষ শাখা থেকে নিরাপদ দূরত্বে গড়ে তোলা হয়েছে মহিলা শাখা। বর্তমানে সেখানে কদুরী জামাত পর্যন্ত চলমান রয়েছে। ক্রমান্বয়ে উপরের জামাতগুলোও খোলা হবে। ইনশা আল্লাহ। কেবল মহিলা শিক্ষিকার মাধ্যমে দরস প্রদাণ করা হয়।
[]
ছাত্র প্রশিক্ষণ কর্মসূচী
সিলেবাসভুক্ত কিতাবপত্রের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বহুমুখী প্রতিভার বিকাশ সাধন ও তাদের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাসমূহের পরিস্ফুটনের লক্ষ্যে ছাত্রপ্রশিক্ষণের নিমিত্তে নিম্নোক্ত কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে।
(ক) ছাত্র পাঠাগার
(খ) মাসিক দেয়ালিকা
(গ) বক্তৃতা প্রশিক্ষণ
(ঘ) বিষয়ভিত্তিক তরবিয়ত।
[]
জামিয়ার সেবা প্রকল্প:
এ প্রকল্পের আওতায় কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয়।:
ক) ফাতাওয়া বিভাগ: এ বিভাগ থেকে দক্ষ মুফতিয়ানে কিরাম ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিভিন্ন ধরণের উদ্ভুত জটিল সমস্যার শরয়ী সমাধান প্রদান করে থাকেন।
খ) ফারায়েজ বিভাগ: মৃত ব্যক্তির পরিত্যাক্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ওয়ারিসগণের মাঝে শরীয়াতের বিধান মোতাবেক সুষ্টু বন্টনের রূপরেখা প্রদান করা হয়।
গ) দাওয়াত ও তাবলীগ: এলাকার মানুষকে দ্বীনমুখী ও আখেরাতমুখী করা, তাদের আমলী জিন্দেগী গড়ার লক্ষ্যে সাপ্তাহিক ও মাসিক বিভিন্নমুখী দ্বীনী প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া রমজানসহ বিভিন্ন ছুটিতে ছাত্র ও উসতাযগণ নিয়মিত দাওয়াতী প্রোগ্রামে শরীক হন।
ঘ) মাসিক দ্বীনী মাহফিল : প্রতি ঈংরেজী মাসের তৃতীয় শুক্রবার সর্বসাধারণের মাঝে সঠিক দ্বীনের চর্চাকে ব্যাপকতা প্রদানের জন্য নিয়মিত এই প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়।
ঙ) খেদমতে খলক ফাউন্ডেশন : বর্তমানের ও অতীতের গরীব ছাত্র এবং ষ্টাফ দের চিকিৎসা ইত্যাদি সেবা সহ দেশের বিভিন্ন দূর্যোগ মুহুর্ত পরিবেশে মানবিক সাহায্য নিয়ে এগিয়ে যায় এ ফাউন্ডেশন।
আল্লাহ তায়ালা এ প্রান প্রিয় জামিয়াকে কবুল করেন, তার খাদেমদেরকেও কবুল করেন।
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল লিংক
https://youtube.com/channel/UCi2kPW_WbiBb2kgcvGIxDTw