11/01/2014
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার (Pritilata Waddedar): (জন্ম: মে ৫, ১৯১১; মৃত্যু সেপ্টেম্বর ২৪, ১৯৩২) প্রীতিলতা একটি নাম, বিপ্লব ও সংগ্রামের, যে নামটি শুনলে চেতনা মুহূর্তেই থমকে দাড়ায়। ভারত উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নারী মুক্তিযোদ্ধা ও প্রথম বিপ্লবী মহিলা শহীদ ব্যক্তিত্ব। তৎকালীন পূর্ববঙ্গে জন্ম নেয়া এই বাঙালি বিপ্লবী তখনকার ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং জীবন বিসর্জন করেন।
জন্মঃ
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ১৯১১ সালের ৫ই মে মঙ্গলবার চট্টগ্রামের ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল অফিসের প্রধান কেরানী। মাতা প্রতিভা ওয়াদ্দেদার, তিনি ছিলেন গৃহিণী। প্রীতিলতার ডাক নাম ছিল রানী।
শিক্ষাজীবনঃ
পড়াশুনার হাতেখড়ি বাবা মায়ের কাছে। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারন। যে কারনে জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার মেয়েকে ১ম ও ২য় শ্রেণীতে ভর্তি না করে সরাসরি ৩য় শ্রেণীতে ভর্তি করে দেন। ১৯১৮ সালে ডাঃ খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রীতিলতা প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। স্কুলে আর্টস এবং সাহিত্য প্রীতিলতার প্রিয় বিষয় ছিলো। ১৯২৬ সালে তিনি সংস্কৃত কলাপ পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করেন। ১৯২৮ সালে তিনি কয়েকটি বিষয়ে লেটার মার্কস পেয়ে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। আই.এ. পড়ার জন্য তিনি ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজ়ের ছাত্রী নিবাসের মাসিক থাকা খাওয়ার খরচ ছিল ১০ টাকা এবং এর মধ্যে কলেজের বেতন ও হয়ে যেত। এ কারনেই অল্প বেতনের চাকুরে জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার মেয়েকে আই.এ. পড়তে ঢাকায় পাঠান। ১৯৩০ সালে আই.এ. পরীক্ষায় তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সবার মধ্যে পঞ্চম স্থান লাভ করে। এই ফলাফলের জন্য তিনি মাসিক ২০ টাকার বৃত্তি পান এবং কলকাতার বেথুন কলেজ়ে বি এ পড়তে যান। বানারসী ঘোষ স্ট্রীটের হোস্টেলের ছাদে বসে প্রীতিলতার বাশীঁ বাজানো উপভোগ করত কলেজের মেয়েরা। প্রীতিলতার বি.এ. তে অন্যতম বিষয় ছিল দর্শন। দর্শনের পরীক্ষায় তিনি ক্লাসে সবার চাইতে ভাল ফলাফল লাভ করতেন। এই বিষয়ে তিনি অনার্স করতে চেয়েছিলেন কিন্তু বিপ্পবের সাথে যুক্ত হবার তীব্র আকাঙ্ক্ষার কারনে অনার্স পরীক্ষা তাঁর আর দেয়া হয়নি। ১৯৩২ সালে ডিসটিংশান নিয়ে তিনি বি.এ. পাশ করে যোগ দেন চট্টগ্রামের নন্দকানন অপর্ণা চরণ স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে। কিন্তু, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় কৃতিত্বের সাথে স্নাতক পাস করলেও তিনি এবং তাঁর সঙ্গী বীণা দাসগুপ্তের পরীক্ষার ফল স্থগিত রাখা হয়। অবশেষে তাঁদেরকে ২২ মার্চ, ২০১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মরণোত্তর স্নাতক ডিগ্রী প্রদান করা হয়।
বিপ্লবী চেতনার বিকাশঃ
প্রীতিলতা যখন শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা রেখেছেন, চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা তখন মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন শেষে সক্রিয় হচ্ছিলেন। বিপ্লবীদের আস্তানায় সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী গ্রেফতার হন তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রেলওয়ে ডাকাতি মামলায়। এই ঘটনা কিশোরী প্রীতিলতার মনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। স্কুলের প্রিয় শিক্ষক ঊষাদির দেয়া “ঝাঁসীর রাণী” বইটি পড়ার সময় ঝাঁসীর রাণী লক্ষীবাইয়ের জীবনী তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। এছাড়া দশম শ্রেনীর ছাত্রী থাকাকালে সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত কিছু গোপন বই “দেশের কথা”, “বাঘা যতীন”, “ক্ষুদিরাম” আর “কানাইলাল” লুকিয়ে লুকিয়ে পড়েন যা তাঁকে বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে।
১) দীপালী সঙ্ঘঃ
ঢাকায় লীলা রায়ের এর নেতৃত্বে “শ্রীসংঘ” নামে একটি বিপ্লবী সংঘঠনের “দীপালী সঙ্ঘ” নামে একটি মহিলা শাখা ছিল। ইডেন কলেজে পড়ার সময় বিপ্লবী সংগঠন ‘দীপালী সঙ্ঘ’-র সাথে যুক্ত হন। ইডেন কলেজের শিক্ষক নীলিমাদির মাধ্যমে লীলা রায়ের সাথে প্রীতিলতার পরিচয় হয়েছিল। তাঁদের অনুপ্রেরণায় দীপালী সঙ্ঘে যোগ দিয়ে প্রীতিলতা লাঠিখেলা, ছোরাখেলা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি লিখেছিলেন “আই এ পড়ার জন্য ঢাকায় দু’বছর থাকার সময় আমি নিজেকে মহান মাস্টারদার একজন উপযুক্ত কমরেড হিসাবে নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়েছি”।
২) বিপ্লবী কর্মকান্ডঃ
বেথুন কলেজে ছাত্রীবস্থায় ছাত্রী সঙ্ঘ-র সক্রিয় কর্মী ছিলেন। চট্টগ্রামে বিপ্লবী দলের মেয়ে সদস্য ও ছাত্রীদের নিয়ে একটি চক্র গড়ে তোলেন। সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বোমা তৈরির খোল আনার দায়িত্ব দেয়া হয় প্রীতিলতার নেতৃত্বের চক্রকে। তারা সুটকেসে লুকিয়ে খোল নিয়া আসেন যা পরবর্তী বিপ্লবী কর্মকান্ডে ব্যবহৃত হয়। ১৯৩২ সালের ১৩ই জুন চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের প্রধান কেন্দ্র ধলঘাটের ঘাঁটিতে সূর্যসেনের সাথে সাক্ষাৎ করেন। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করলে সূর্যসেন ও প্রীতিলতা বাড়ির পেছন দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। সেখানে বিপ্লবীদের সাথে বন্দুক যুদ্ধে বিপ্লবী নির্মলকুমার সেন নিহত হন। এর পরে বিপ্লবীরা চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলে প্রীতিলতা এতে অংশগ্রহন করেন। চট্টগ্রাম ইউরোপীয়ান ক্লাবের ফটকে লেখা ছিল “কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ।”
৩) ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ এবং মৃত্যুঃ
১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলে সূর্য সেন অভিযানের নেতৃত্ব প্রীতিলতাকে দেন। সেদিন রাতে তিনি সফলভাবে অভিযান পরিচালনা করেন। সেই অভিযানে হতাহত হয় অনেক ইংরেজ নরনারী। আভিযানের শেষে ফেরার সময় আত্মগোপনকারী এক ইংরেজ তরুণের গুলিতে আহত হন। আহতাবস্থায় ধরা পড়ার চাইতে আত্মাহুতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাৎক্ষণিক ভাবে পটাসিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করে মাত্র ২৩ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন। কারন ধরা পড়লে বিপ্লবীদের অনেক গোপন তথ্য ব্রিটিশ পুলিশের মারের মুখে ফাঁস হয়ে যেতে পারে। তাঁর আত্মদান বাংলা ও ভারতের বিপ্লবীদের আরও উদ্দীপিত ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে সক্রিয় করে তোলে। তার মৃতদেহের পোশাকে নিজ হাতে লেখা বিবৃতিতে এক জায়গায় লেখা ছিল,
"আমরা দেশের মুক্তির জন্যে এই সশস্ত্র যুদ্ধ করিতেছি। অদ্যকার পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি অংশ। ব্রিটিশরা জোর পূর্বক আমাদের স্বাধীনতা ছিনাইয়া লইয়াছে। ............ সশস্ত্র ভারতীয় নারী সমস্ত বিপদ ও বাধাকে চূর্ণ করিয়া এই বিদ্রোহ ও সশস্ত্র মুক্তি আন্দোলনে যোগদান করিবেন এবং তাহার জন্য নিজেকে তৈয়ার করিবেন- এই আশা লইয়া আমি আজ আত্মদানে অগ্রসর হইলাম।"
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শহীদ হওয়া এই স্বদেশপ্রেমী বিপ্লবী নারীর প্রতি রইল আমার গভীর শ্রদ্ধা ও সহস্র সালাম।
Photo: প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার (Pritilata Waddedar): (জন্ম: মে ৫, ১৯১১; মৃত্যু সেপ্টেম্বর ২৪, ১৯৩২) প্রীতিলতা একটি নাম, বিপ্লব ও সংগ্রামের, যে নামটি শুনলে চেতনা মুহূর্তেই থমকে দাড়ায়। ভারত উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নারী মুক্তিযোদ্ধা ও প্রথম বিপ্লবী মহিলা শহীদ ব্যক্তিত্ব। তৎকালীন পূর্ববঙ্গে জন্ম নেয়া এই বাঙালি বিপ্লবী তখনকার ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং জীবন বিসর্জন করেন। জন্মঃ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ১৯১১ সালের ৫ই মে মঙ্গলবার চট্টগ্রামের ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল অফিসের প্রধান কেরানী। মাতা প্রতিভা ওয়াদ্দেদার, তিনি ছিলেন গৃহিণী। প্রীতিলতার ডাক নাম ছিল রানী। শিক্ষাজীবনঃ পড়াশুনার হাতেখড়ি বাবা মায়ের কাছে। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারন। যে কারনে জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার মেয়েকে ১ম ও ২য় শ্রেণীতে ভর্তি না করে সরাসরি ৩য় শ্রেণীতে ভর্তি করে দেন। ১৯১৮ সালে ডাঃ খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রীতিলতা প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। স্কুলে আর্টস এবং সাহিত্য প্রীতিলতার প্রিয় বিষয় ছিলো। ১৯২৬ সালে তিনি সংস্কৃত কলাপ পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করেন। ১৯২৮ সালে তিনি কয়েকটি বিষয়ে লেটার মার্কস পেয়ে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। আই.এ. পড়ার জন্য তিনি ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজ়ের ছাত্রী নিবাসের মাসিক থাকা খাওয়ার খরচ ছিল ১০ টাকা এবং এর মধ্যে কলেজের বেতন ও হয়ে যেত। এ কারনেই অল্প বেতনের চাকুরে জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার মেয়েকে আই.এ. পড়তে ঢাকায় পাঠান। ১৯৩০ সালে আই.এ. পরীক্ষায় তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সবার মধ্যে পঞ্চম স্থান লাভ করে। এই ফলাফলের জন্য তিনি মাসিক ২০ টাকার বৃত্তি পান এবং কলকাতার বেথুন কলেজ়ে বি এ পড়তে যান। বানারসী ঘোষ স্ট্রীটের হোস্টেলের ছাদে বসে প্রীতিলতার বাশীঁ বাজানো উপভোগ করত কলেজের মেয়েরা। প্রীতিলতার বি.এ. তে অন্যতম বিষয় ছিল দর্শন। দর্শনের পরীক্ষায় তিনি ক্লাসে সবার চাইতে ভাল ফলাফল লাভ করতেন। এই বিষয়ে তিনি অনার্স করতে চেয়েছিলেন কিন্তু বিপ্পবের সাথে যুক্ত হবার তীব্র আকাঙ্ক্ষার কারনে অনার্স পরীক্ষা তাঁর আর দেয়া হয়নি। ১৯৩২ সালে ডিসটিংশান নিয়ে তিনি বি.এ. পাশ করে যোগ দেন চট্টগ্রামের নন্দকানন অপর্ণা চরণ স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে। কিন্তু, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় কৃতিত্বের সাথে স্নাতক পাস করলেও তিনি এবং তাঁর সঙ্গী বীণা দাসগুপ্তের পরীক্ষার ফল স্থগিত রাখা হয়। অবশেষে তাঁদেরকে ২২ মার্চ, ২০১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মরণোত্তর স্নাতক ডিগ্রী প্রদান করা হয়। বিপ্লবী চেতনার বিকাশঃ প্রীতিলতা যখন শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা রেখেছেন, চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা তখন মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন শেষে সক্রিয় হচ্ছিলেন। বিপ্লবীদের আস্তানায় সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী গ্রেফতার হন তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রেলওয়ে ডাকাতি মামলায়। এই ঘটনা কিশোরী প্রীতিলতার মনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। স্কুলের প্রিয় শিক্ষক ঊষাদির দেয়া “ঝাঁসীর রাণী” বইটি পড়ার সময় ঝাঁসীর রাণী লক্ষীবাইয়ের জীবনী তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। এছাড়া দশম শ্রেনীর ছাত্রী থাকাকালে সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত কিছু গোপন বই “দেশের কথা”, “বাঘা যতীন”, “ক্ষুদিরাম” আর “কানাইলাল” লুকিয়ে লুকিয়ে পড়েন যা তাঁকে বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে। ১) দীপালী সঙ্ঘঃ ঢাকায় লীলা রায়ের এর নেতৃত্বে “শ্রীসংঘ” নামে একটি বিপ্লবী সংঘঠনের “দীপালী সঙ্ঘ” নামে একটি মহিলা শাখা ছিল। ইডেন কলেজে পড়ার সময় বিপ্লবী সংগঠন ‘দীপালী সঙ্ঘ’-র সাথে যুক্ত হন। ইডেন কলেজের শিক্ষক নীলিমাদির মাধ্যমে লীলা রায়ের সাথে প্রীতিলতার পরিচয় হয়েছিল। তাঁদের অনুপ্রেরণায় দীপালী সঙ্ঘে যোগ দিয়ে প্রীতিলতা লাঠিখেলা, ছোরাখেলা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি লিখেছিলেন “আই এ পড়ার জন্য ঢাকায় দু’বছর থাকার সময় আমি নিজেকে মহান মাস্টারদার একজন উপযুক্ত কমরেড হিসাবে নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়েছি”। ২) বিপ্লবী কর্মকান্ডঃ বেথুন কলেজে ছাত্রীবস্থায় ছাত্রী সঙ্ঘ-র সক্রিয় কর্মী ছিলেন। চট্টগ্রামে বিপ্লবী দলের মেয়ে সদস্য ও ছাত্রীদের নিয়ে একটি চক্র গড়ে তোলেন। সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বোমা তৈরির খোল আনার দায়িত্ব দেয়া হয় প্রীতিলতার নেতৃত্বের চক্রকে। তারা সুটকেসে লুকিয়ে খোল নিয়া আসেন যা পরবর্তী বিপ্লবী কর্মকান্ডে ব্যবহৃত হয়। ১৯৩২ সালের ১৩ই জুন চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের প্রধান কেন্দ্র ধলঘাটের ঘাঁটিতে সূর্যসেনের সাথে সাক্ষাৎ করেন। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করলে সূর্যসেন ও প্রীতিলতা বাড়ির পেছন দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। সেখানে বিপ্লবীদের সাথে বন্দুক যুদ্ধে বিপ্লবী নির্মলকুমার সেন নিহত হন। এর পরে বিপ্লবীরা চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলে প্রীতিলতা এতে অংশগ্রহন করেন। চট্টগ্রাম ইউরোপীয়ান ক্লাবের ফটকে লেখা ছিল “কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ।” ৩) ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ এবং মৃত্যুঃ ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলে সূর্য সেন অভিযানের নেতৃত্ব প্রীতিলতাকে দেন। সেদিন রাতে তিনি সফলভাবে অভিযান পরিচালনা করেন। সেই অভিযানে হতাহত হয় অনেক ইংরেজ নরনারী। আভিযানের শেষে ফেরার সময় আত্মগোপনকারী এক ইংরেজ তরুণের গুলিতে আহত হন। আহতাবস্থায় ধরা পড়ার চাইতে আত্মাহুতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাৎক্ষণিক ভাবে পটাসিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করে মাত্র ২৩ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন। কারন ধরা পড়লে বিপ্লবীদের অনেক গোপন তথ্য ব্রিটিশ পুলিশের মারের মুখে ফাঁস হয়ে যেতে পারে। তাঁর আত্মদান বাংলা ও ভারতের বিপ্লবীদের আরও উদ্দীপিত ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে সক্রিয় করে তোলে। তার মৃতদেহের পোশাকে নিজ হাতে লেখা বিবৃতিতে এক জায়গায় লেখা ছিল, "আমরা দেশের মুক্তির জন্যে এই সশস্ত্র যুদ্ধ করিতেছি। অদ্যকার পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি অংশ। ব্রিটিশরা জোর পূর্বক আমাদের স্বাধীনতা ছিনাইয়া লইয়াছে। ............ সশস্ত্র ভারতীয় নারী সমস্ত বিপদ ও বাধাকে চূর্ণ করিয়া এই বিদ্রোহ ও সশস্ত্র মুক্তি আন্দোলনে যোগদান করিবেন এবং তাহার জন্য নিজেকে তৈয়ার করিবেন- এই আশা লইয়া আমি আজ আত্মদানে অগ্রসর হইলাম।" ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শহীদ হওয়া এই স্বদেশপ্রেমী বিপ্লবী নারীর প্রতি রইল আমার গভীর শ্রদ্ধা ও সহস্র সালাম।