05/09/2026
পঞ্চব্রীহি ধানের উদ্ভাবক জিনবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী
কুলাউড়ার মাটি থেকে বিশ্ববিজ্ঞানের অঙ্গনে
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের কানিহাটি গ্রামের সন্তান ড. আবেদ চৌধুরী বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান জিনবিজ্ঞানী, ধান গবেষক, বিজ্ঞানলেখক ও কবি। আন্তর্জাতিক গবেষণাঙ্গনে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় কাজ করার পাশাপাশি নিজের জন্মভূমির কৃষি, কৃষক ও দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে চলেছেন তিনি। তাঁর সবচেয়ে আলোচিত উদ্ভাবনগুলোর একটি ‘পঞ্চব্রীহি ধান’, যা একই গাছ থেকে একাধিকবার ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
কুলাউড়ার এই কৃতি সন্তান একই সঙ্গে পাবলিক ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব কুলাউড়া (পুসাক)-এর অ্যালামনাই যা কুলাউড়ার তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য নিঃসন্দেহে গর্বের একটি পরিচয়।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন :
ড. আবেদ চৌধুরী ১৯৫৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের কানিহাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সময়ই প্রকৃতি, জীবজগৎ ও কৃষির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। তিনি মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক এবং পরবর্তীতে ঢাকার নটর ডেম কলেজে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।
এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। রসায়নের শিক্ষার্থী হলেও তাঁর আগ্রহ ধীরে ধীরে জীববিজ্ঞান ও জিনতত্ত্বের দিকে বিস্তৃত হয়। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনে মলিকুলার বায়োলজিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (NIH) ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT)-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গবেষণা করেন।
জিনবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান :
ড. আবেদ চৌধুরীর গবেষণা জীবনের শুরুতেই তিনি জেনেটিক্সের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ করেন। ১৯৮৩ সালে পিএইচডি গবেষণার সময় তিনি ‘RecD’ নামের জেনেটিক রিকম্বিনেশনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জিন আবিষ্কার করেন। তাঁর এই কাজ পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক গবেষণাঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে।
পরবর্তীতে তিনি apomixis বা নিষেক ছাড়াই বীজ উৎপাদনের প্রক্রিয়া নিয়েও দীর্ঘদিন গবেষণা করেন। এই গবেষণার লক্ষ্য ছিল এমন ফসলের সম্ভাবনা তৈরি করা, যেখানে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মেও স্থায়ীভাবে ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে। তাঁর এই গবেষণা উদ্ভিদ প্রজনন ও কৃষি বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত।
আন্তর্জাতিক গবেষণা জীবন :
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি তিনি অস্ট্রেলিয়ার CSIRO (Commonwealth Scientific and Industrial Research Organisation)-এ প্রায় দুই দশক গবেষণা বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেন। তাঁর গবেষণার অন্যতম ক্ষেত্র ছিল উদ্ভিদের জিনতত্ত্ব ও ধানের প্রজননবিজ্ঞান। চার দশকেরও বেশি সময়ের গবেষণা অভিজ্ঞতায় তিনি জেনেটিক্স, কৃষি এবং জলবায়ু-সম্মত কৃষি নিয়ে কাজ করেছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়লেও নিজের শিকড় ও জন্মভূমির প্রতি তাঁর টান কখনো কমেনি। বরং বিদেশে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে তিনি দেশের কৃষি উন্নয়নে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন।
জন্মভূমি কানিহাটিতে কৃষি গবেষণা :
২০১০ সালে ড. আবেদ চৌধুরী কৃষাণ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। কুলাউড়ার হাজীপুর ইউনিয়নের কানিহাটি গ্রামের নিজ এলাকায় কৃষক ও গবেষকদের সমন্বয়ে তিনি কৃষি গবেষণার কার্যক্রম শুরু করেন। ধান ছাড়াও রঙিন ভুট্টা, জোয়ার, বাজরা, রাগি ও বিভিন্ন শস্য নিয়ে সেখানে গবেষণা পরিচালিত হয়েছে।
এখানে তাঁর দর্শন ছিল কৃষি গবেষণা শুধু গবেষণাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং কৃষকের মাঠেই গবেষণার ফলাফল পরীক্ষা ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
পঞ্চব্রীহি ধান: এক গাছ থেকে বারবার ফলনের স্বপ্ন :
ড. আবেদ চৌধুরীর সবচেয়ে বেশি আলোচিত কৃষি উদ্ভাবন হলো ‘পঞ্চব্রীহি ধান’। সাধারণত ধান কাটার সময় পুরো গাছ কেটে ফেলা হয় এবং পরবর্তী মৌসুমে নতুন করে ধান রোপণ করতে হয়। কিন্তু ড. আবেদ চৌধুরীর দীর্ঘ গবেষণার লক্ষ্য ছিল ধানগাছকে এমনভাবে উন্নত করা, যাতে একবার রোপণের পর একই গাছ থেকে আবারও ধান পাওয়া যায়।
প্রায় ১৪ বছর ধরে তিনি এই ধারণা নিয়ে গবেষণা করেন। প্রথমে এমন কিছু দেশীয় ধানের জাত নির্বাচন করা হয়, যেগুলো কাটার পর একই গাছ থেকে আবার নতুন শীষ দিতে পারে। এরপর সেগুলো নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ, নির্বাচন ও সংকরায়ণের মাধ্যমে গবেষণা এগিয়ে নেওয়া হয়।
দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফল হিসেবে আসে পঞ্চব্রীহি ‘পঞ্চ’ অর্থ পাঁচ এবং ‘ব্রীহি’ অর্থ ধান। ধারণাটি হলো, একটি ধানগাছকে একবার রোপণ করে বিভিন্ন সময়ে পাঁচবার পর্যন্ত ধান উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করা। প্রচলিত বর্ণনায় এর উৎপাদনচক্রে বোরো, আউশ ও আমন মৌসুম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই উদ্ভাবনের সম্ভাবনা শুধু একই জমিতে বারবার ধান উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সফলভাবে প্রয়োগ করা গেলে এতে কৃষকের বীজ, চারা রোপণ, জমি প্রস্তুত ও শ্রমের প্রয়োজন কমতে পারে এবং একই জমি থেকে দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তাঁর নিজের ভাষায়, পঞ্চব্রীহি কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার একটি সূচনা ভবিষ্যতে আরও বেশি বার একই গাছ থেকে ফলন পাওয়ার সম্ভাবনাও তিনি দেখেছেন।
ধান নিয়ে তাঁর গবেষণা পঞ্চব্রীহিতেই শেষ নয়। দেশীয় ধানের বৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নতুন জাতের উদ্ভাবন এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষি নিয়েও তিনি কাজ করেছেন। বিভিন্ন দেশীয় ও উন্নত জাতের সংকরায়নের মাধ্যমে নতুন বৈশিষ্ট্যের ধান তৈরির চেষ্টা করেছেন তিনি।
রঙিন ভুট্টা, বিভিন্ন শস্য এবং বহুবর্ষজীবী বা একাধিকবার ফলনশীল ফসল নিয়েও তাঁর গবেষণা রয়েছে। তাঁর কাজের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের কৃষিকে আরও বৈচিত্র্যময়, টেকসই ও কৃষকবান্ধব করে তোলা।
বিজ্ঞানী, লেখক ও কবি :
ড. আবেদ চৌধুরীর পরিচয় শুধু একজন বিজ্ঞানী হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দিতে তিনি বাংলা ও ইংরেজিতে লিখেছেন। পাশাপাশি তিনি একজন কবিও।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ও লেখার মধ্যে রয়েছে ‘মানুষের জিন, জিনের মানুষ’, ‘অণুভবের নীলনকশা’, ‘শৈবাল ও অন্তরীক্ষ’, ‘দুর্বাশিশির ও পর্বতমালা’, ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘স্বপ্ন সত্তা নদী ও অন্যান্য কবিতা’ এবং ইংরেজি ভাষায় Paradigm Shift ও Anguished Rivers and Other Designs প্রভৃতি।
কুলাউড়ার জন্য অনুপ্রেরণার নাম
একজন মানুষ আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিজ্ঞানী হওয়ার পরও নিজের জন্মগ্রামকে গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন—এটি ড. আবেদ চৌধুরীর জীবনের অন্যতম অনন্য দিক।
কুলাউড়ার হাজীপুর ইউনিয়নের কানিহাটির মাটি থেকে তাঁর যাত্রা শুরু হয়ে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক গবেষণাগারে। আবার সেই আন্তর্জাতিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি ফিরে এসেছেন নিজের গ্রামের কৃষকের কাছে।
তাই ড. আবেদ চৌধুরী শুধু একজন বিজ্ঞানীর নাম নন; তিনি কুলাউড়ার মাটি, কৃষি ও মানুষের সঙ্গে যুক্ত এক অনুপ্রেরণার নাম।
কুলাউড়ার সন্তান হিসেবে তাঁর অর্জন আমাদের গর্বিত করে। আর পুসাকের অ্যালামনাই হিসেবে তাঁর পথচলা আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য আরও বড় অনুপ্রেরণা—সুযোগ পেলে কুলাউড়ার একজন শিক্ষার্থীও যে বিশ্ববিজ্ঞানের অঙ্গনে নিজের জায়গা করে নিতে পারেন, তাঁর জীবন তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।
কুলাউড়া থেকে বিশ্বমঞ্চ—ড. আবেদ চৌধুরীর এই পথচলা তাই শুধু একজন বিজ্ঞানীর জীবনী নয়; এটি কুলাউড়ার মাটি থেকে উঠে আসা এক স্বপ্ন, গবেষণা ও সম্ভাবনার গল্প।