15/05/2017
বিসিএস ক্যাডার জাহিদ ভাইয়ের জিবনের গল্প:-
অনিবার্য কারনেই শরীফ ভাই আমার পুরো গল্পটি লিখতে পারেনি, একটা অসীম যুদ্ধের গল্প......।
টিউশনি করা এদেশের প্রতিটি ছেলেই দিনমজুর অথবা কাবিখা প্রজেক্টের. তাই শিরোনাম এটাও হতে পারতো "গাবতলি পশু হাটের চায়ের দোকানের আমির এখন বিসিএস ক্যাডার জাহিদ"
প্রকৃতি ঝলসানো চৈত্রের এক দাবদাহে যেদিন আমাদের ঘরবাড়ি পুড়ে কয়লা আর ভস্ম হয়ে যায় ,সম্পদ বলতে ছিল শুধু আমাদের শরীরের পোশাক! আগুনে যে সংসারটা সেদিন ছাই হয়ে গিয়েছিল সেটি ছিল আমার মায়ের ঘাম আর রক্ত দিয়ে তৈরি করা গরীবের রাজপ্রাসাদ। যে সংসারটা বানাতে মা জোসনা রাতে আমাদেরকে পাশে পাটিতে বসিয়ে শাস্ত্র শুনাতেনআর কোদাল দিয়ে খেত কোপাতেন! লাঙ্গল দেয়ার সামর্থ্য ছিলনা তাই! ফজরের নামাজ পরে ফসল কাটা শুরু করতেন সুর্যোদয়ের পুর্বে শেষ করতেন যেন পাশের জমির কাজের লোক বা এলাকার মানুষ না দেখে আর না জানে যে অমুকের বউ মাঠে পুরুষের কাজ করে। নানার পুরনো পাঞ্জাবীটা গায়ে পরে মা আখ ক্ষেতের আখ আটি বেধে দিতেন। মা যখন ঘামে চিপচিপে শরীর নিয়ে বলতো "আয়তো, আব্বা ঘামাচিগুলো গেলে দেতো, মরে গেলাম" প্রিয় কাজটি করতে গিয়ে দেখতাম মায়ের হাতে, পায়ে আর শরীরে আখ পাতার ধারে কাটা শতশত দাগ! সেদিন বুঝিনি সে ক্ষত কতটা বেদনার সন্তানের জন্য।
আগুন সেদিন শুধু সংসার পোড়ায়নি একটি সংসারের স্বপ্ন আর হিসেব-নিকেষও পাল্টে দিয়েছিল। বড় ভাইয়ার ঠাঁই হয়েছিল দর্জির দোকানে আর মেজো ভাইয়া সাইকেলের গ্যারেজ! তারা দুজনই প্রাইমারি স্কুলে ১/২ রোলের অধিকারী ছিলেন। বছর দুই পর আমাকেও অভাব ছুঁড়ে ফেলে দেয় ঢাকা। ১০ বছর বয়সেই কাজ শুরু করি গাবতলি পশু হাটে চায়ের দোকানের হেল্পার হিসাবে। রাতে ঘুমাতাম মশা আর জোনাকির দখলে থাকা দোকানের সরু বেঞ্চে । সেখানে দেশি বিদেশি নানা জাতের গোবরের সুঘ্রান ম’ ম’ করতো। গভীর ঘুম হতো সেখানে। সে বছর ঈদের ছুটিতে বাড়ি গিয়ে বড় ভাইয়া বললেন " আমির স্কুলে পড়বে, আমরা সব ভাইই কি মূর্খ থাকবো? " ভর্তির সময় শেষ হওয়াতে ক্লাস সিক্সে আর ভর্তি হতে পারিনি অগত্যা পঞ্চম উর্ত্তীর্ণ আমির আবার পঞ্চম শ্রেনীতেই ভর্তি! রবি স্যারের(আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক) শর্ত, "ওর নাম পরিবর্তন করতে হবে আর ও খুব দুষ্টু ওকে ভালো করে পড়াশুনা করে বৃত্তি পেতে হবে" ।ব্যাস!গাবতলির চায়ের দোকানের আমির হয়ে গেল আজকের জাহিদ!
জাহিদ প্রথম স্থান নিয়েই ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয়। প্রধান শিক্ষক হাফ ফ্রি করে দিলেন স্কুলের বেতন। টাকার অভাবে প্রাইভেট পড়তে পারিনি। অষ্টম শ্রেনীতে গিয়ে চিনু স্যারের দর্শন পাই যিনি নিজেই চাকরি না পেয়ে টিউশনি দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পুরোটা সময় বলতে গেলে ফ্রি পড়িয়েছেন। সামান্য ২০০ টাকার জন্য পিকনিকে যেতে পারিনি স্যার নিজে টাকা দিয়ে বলেছে যা তুইও সবার সাথে আনন্দ কর।ভুলিনি আমি, মনে রেখেছি পরম শ্রদ্ধা ভরে।
মা যখন মাথায় খড়ির বোঝা, কয়েকটি লেবু, বা আঙ্গিনার কোন সবজি কিংবা গোবরের লাঠি দিয়ে বলেছে বিক্রি করে নিয়ে আয়, বাজারে নিয়ে বিক্রি করে এসেছি। ঈদেরছুটি? মন চেয়েছে ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়াই, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেই, ক্রিকেট খেলি। কিন্তু ভাইয়ের দোকানে ভীষন কাজ! ঈদের আগের সারা রাত পর্যন্তও কাজ! রমজানে বাজারে বন্ধুদের সামনেই ছোলা মুড়ি বেচতাম, আতর,সুরমা বেচতাম। একেবারে লজ্জা লাগেনি তা না আমিওতো এই সমাজেরই সামাজিক জীব নাকি?
২০০৩ সাল জাহিদ আশেপাশে অনেকগুলো বিদ্যালয়ের মধ্যে সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট করেছে, সাইন্স নিয়ে পড়তে চায় কিন্তু খরচ? আবারও সেই ফাজিল অভাবটা পথেরকাঁটা। সুতরাং, পড়াশোনা বাদ, ঢাকায় গমন পেটের ধান্দা অন্বেষণ। স্থানীয় কলেজগুলো থেকে শিক্ষকদের আবদার, বাজারের বিভিন্ন শ্রেনীর মানুষের জিজ্ঞাংসা "ছেলেকে কোথায় ভর্তি করাবেন?" ফুটপাতের দোকানদার বাবা এতদিন পর বুঝতে পেরেছিল ছেলে বুঝি ভালো কিছু করেছে! অতএব সম্মানের ব্যাপার, ঝুঁকি নিয়ে রাজবাড়ি সরকারি কলেজে ভর্তি হলাম। বাসা থেকে চাল আনি, টিউশনি করি। এক বছর পর বাবা টাকা দিতে অপারগতা জানালেন! সুতরাং সাইক্লোনটা আবার মায়ের ঘাড়ে! কমল স্যার, তপন স্যার অন্যদের তুলনায় সামান্য টাকা নিয়ে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি পড়িয়েছেন আমাকে। এইচএসসি পাশ করলাম এ গ্রেডে।বিশ্ববিদ
্যালয় ভর্তি? টাকার অভাবে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফর্ম তুলতে পারিনি, কোচিং খরচের মুরোদ নেই, একটা ভর্তি গাইডও নেই তবুও ওয়েটিং এ ছিলাম জাহাংগীরনগরে (পরিবেশ বিজ্ঞান, ভূতাত্বিক বিজ্ঞানে)। অনার্সের ফর্ম টাও তুলতে পারিনি! সুতরাং এখানেও পড়াশোনার যাত্রা বিরতি!
ছাত্রত্ব রক্ষা করতে ভর্তিহলাম পাশ কোর্সে, পাংশা কলেজে। আর এলাকায় টিউশনির রাজত্ব কায়েম করলাম।ভালোই আয়, অনেক ছাত্রছাত্রী অনেকসুনাম আমার , সবাই মাস্টার সাপ বলে ডাকে, ক্যারিয়ার বুঝি এটাতেই গড়বো ধরে নিলাম । পুরো বছর বইয়ের সাথে সম্পর্কহীন তবুও সেবছর ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হই আল্লাহর কৃপায়!