17/05/2023
শেরপুর জেলার সবার আকুতি একটাই
কমরেড রবি নিয়োগী বিশ্ববিদ্যালয় চাই
শেরপুর জেলা ময়মনসিংহ বিভাগের একটি সীমান্তবর্তী জনপদ। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কোল ঘেঁষা গারো পাহাড়ের পাদদেশে এটি পাঁচটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এ অঞ্চলে মানুষ মিলেমিশে বসবাস করছে। রয়েছে নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বসবাস: গারো, হাজং, কোচ, ডালু, হদি, বর্মণ, বানাই প্রভৃতি সম্প্রদায় মিলে এই নৃ-গোষ্ঠীর প্রায় ২০ হাজার জনমানুষ বাস করেন এই জেলায়। যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের কারণে শেরপুর আজ পাঁচ জেলার প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের মিলনস্থল। শেরপুরে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে অত্র অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীরা আলোকিত মানুষ হয়ে দেশসেবায় নিজেকে ব্রত রাখার সুযোগ পাবে।
আমাদের প্রাণের দাবি উচ্চশিক্ষায় অনগ্রসর শেরপুর জেলায় কমরেড রবি নিয়োগী নামে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হোক। শেরপুরে কমরেড রবি নিয়োগীর নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি কেন? এমন একটি জিজ্ঞাসা আসতে পারে।আসুন সবাই কবি মহাদেব সাহার একটি কবিতা পড়ি।
'আমরা এখন সবাই অনন্ত বরফ নদী পাড়ি দিচ্ছি
এখন আপনার মতো অগ্নিযুগের কোনো বীর নেই আমাদের,
শুধু যার যার ভীরু জীবন আঁকড়ে আছি সবাই।...
আজ একে একে যখন সব ভেঙ্গে পড়ছে, পৃথিবী হচ্ছে অন্ধকার
তখন কেউ কি আবার সেই অগ্নিযুগের অভয় গান গাইবে,
আবার এই মাটিতে দাঁড়ানো মানুষের মাথা ঠেকবে আকাশে?
কবে আসবে সেই অগ্নিযুগ?'
(রবি নিয়োগী স্মরণে কবি মহাদেব সাহা)
অগ্নিযুগের বিপ্লবী, উপমহাদেশের বৃটিশ বিরোধী লড়াই সংগ্রামের কিংবদন্তি মানুষ, বাঙালীর স্বাধীকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, শোষণহীন সমাজ বিনির্মাণ এর সংগ্রামী নেতা রবি নিয়োগী।
তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার শেরপুর (বর্তমান জেলা) টাউনের গৃদানারায়ণপুর (পুরাতন গরুহাটী) এলাকায় এক বর্ধিষ্ণু ভূস্বামী পরিবারে বাংলা ১৩১৬ সালের ১৬ বৈশাখ, ১৯০৯ সনের ২৯ এপ্রিল রবি নিয়োগী'র জন্ম। তাঁর পুরো নাম রবীন্দ্র চন্দ্র নিয়োগী। পিতা রমেশ চন্দ্র নিয়োগী ও মাতা সুরবালা নিয়োগী।
তিরানব্বই বছরের জীবনের আট দশকের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক পথ পরিক্রমায় প্রায় চৌত্রিশ বছর কাটে কারার অন্তরালে। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ রাজ, দ্বিজাতি তত্ত্বের পাকিস্তান, এমনকি স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বৈরশাসকদের দৃষ্টিতে 'ভয়ংকর রাষ্ট্রদ্রোহী' হয়ে উঠেছিলেন রবি নিয়োগী। দীর্ঘ কারাবাস ছাড়াও গৃহে অন্তরীণ ও আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে জীবনের অনেকটা সময়। বিপ্লবী সংগঠন ‘অনুশীলন সমিতি’র মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ এবং আজীবন যুক্ত ছিলেন রাজনীতিইে-সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। রাজশাহী জেলে থাকাবস্থায় জেলের সুপারিনটেন্ডেন্টকে গুলি করে হত্যা প্রচেষ্টার জন্য তাঁকে শাস্তি হিসেবে এবং একজন বিপদজনক বন্দী হিসেবে আন্দামান সেলুলার জেলে (দ্বীপান্তর) পাঠিয়ে দেয়া হয়। আন্দামান তখন কালাপানির দ্বীপ। সেখানে তিনি সাড়ে পাঁচ বছর বন্দিজীবন যাপন করেন। আন্দামান জেলে আটক থাকা অবস্থায়ই সাম্যবাদে দীক্ষিত হন রবি নিয়োগী। তাঁর মতো ৩২ জন সমমনা ও রূপান্তরিত চেতনার বন্দিদের নিয়ে আন্দামানের 'মার্ক্সবাদী বিশ্ববিদ্যালয়'-এ গড়ে ওঠে ‘সাম্যবাদী সংহতি’ (Communist Consolidation)-জেলখানায় কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম শাখা।
১৯৩৮ সনে সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নেতাজী সুভাষ বসু শেরপুরে এক জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন। সভাপতিত্ব করেছিলেন সদ্য আন্দামান ফেরত বিপ্লবী রবি নিয়োগী।
উপমহাদেশের কিংবদন্তী কমিউনিস্ট কমরেড মোজাফফর আহমদের উদ্যোগে ১৯৩৯ সালে একটি গোপন বৈঠকে গঠিত হয় ময়মনসিংহে কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম জেলা কমিটি। সে কমিটির সদস্য ছিলেন রবি নিয়োগী। সাথে পেয়েছিলেন মণি সিংহ, খোকা রায়, আলতাব আলী,পুলিন বকসী, ক্ষিতীশ চক্রবর্তী, সুনির্মল সেন প্রমুখ অনেক লড়াকু মানুষকে।
১৯৪১ সনে রবি নিয়োগী বিপ্লবী জ্যোৎস্না মজুমদার (নিয়োগী) এর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তাঁরা প্রকৃত অর্থেই একজন আরেকজনের সহধর্মী হয়ে উঠেছিলেন।
মানুষের মুক্তির কথা বলি,
এরচেয়ে বেশি তো নয়...
১৯৪৫ সালে নেত্রকোণায় ঐতিহাসিক সর্বভারতীয় কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, রবি নিয়োগী সেই সম্মেলন আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের টংকপ্রথা বিলোপ এবং তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি। পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরের মধ্যে ২০ বছরই কারাগারে ছিলেন রবি নিয়োগী । জেল-জীবন নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত শুধু বঙ্গবন্ধু সরকার ছাড়া সব সরকারই আমাকে জেলে নিয়েছে। আমি কি ওদের জন্য এতই ভয়ঙ্কর? মানুষের মুক্তির কথা বলি, এরচেয়ে বেশি তো নয়।’
এদেশ ছেড়ে আমি যাবো না,
মরতে হয় এদেশেই মরবো...
'৫০ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর এদেশের সনাতন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনেকেই ভারতে চলে যাচ্ছিলেন। সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান সরকারের নীতিনির্ধারকদের দিক থেকেও এ ব্যাপারে অলিখিত কিন্তু শক্ত চাপ ছিল। পারিবাকিভাবে তাঁকে এ বিষয়ে বলা হলে, উত্তরে রবি নিয়োগী বলছিলেন, ‘যেতে হয় তোমরা যাও। এদেশ ছেড়ে আমি যাবো না, মরতে হয় এদেশেই মরবো।’
রাজনৈতিক দূরদর্শিতা
মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরে ১৯৭২ সালে জামালপুরে অনুষ্ঠিত ন্যাপের এক সম্মেলনে দেশ গঠন প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘যুদ্ধে পরাজিত শক্তি বসে থাকবে না, তারা বসে নেই। তারা পরাজিত ও অদৃশ্য হলেও তাদের শক্তিকে খাটো করে দেখার বোকামি যেন আমরা না করি। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়, নেতৃত্বের গৌরব মহিমা,দলীয় গুরুত্ব ও প্রাধান্য বিস্তার নিয়ে মগ্ন থেকে বিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের কর্তব্য যেন আমরা কেউ ভুলে না যাই।... হুশিয়ার বঙ্গবন্ধু, হুশিয়ার জাতির পিতা, শনির ছিদ্রপথ এখন বন্ধ করতে না পারলে শত্রুপক্ষের বুদ্ধির আঘাতে জাতির পিতাসহ গোটা জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে।’
দেশের মানুষকে ভালোবাসার কথাই বলতেন...
দলমত নির্বিশেষে যারা মন্ত্রী হয়েছেন, তারাও এই বিপ্লবী নেতার আটপৌরে বাড়ির দ্বারস্থ হয়েছেন দেখা করে আর্শীবাদ নিতে। তিনি হাসিমুখে তাঁদের সাথে কথা বলেছেন, শুভাশিষ জানিয়েছেন। তবে একটা কথা তাদেরকে সবসময়ই বলেছেন, ‘মন্ত্রী হইছেন খুশি হইছি। দেশকে-দেশের মানুষকে ভালোবাসেন, তাদের পাশে দাঁড়ান। তাদের একটু ভালো করেন’।
বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞাসা করেন, 'কোন শেরপুর?
রবি নিয়োগীর শেরপুর কি?’
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রাবস্থা থেকেই বিপ্লবী রবি নিয়োগীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। শেরপুর জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি এবং সাবেক সাংসদ আনিসুর রহমান স্মৃতিচারণে বলেন, ছাত্রাবস্থায় একবার শেখ মুজিবের সাথে দেখা হলে তাঁকে জানান, তাঁর বাড়ি শেরপুর। শেখ মুজিব তখন জিজ্ঞাসা করেন, ‘কোন শেরপুর? রবি নিয়োগীর শেরপুর কি?’ আনিসুর রহমান ‘হ্যাঁ’ বাচক উত্তর দিলে শেখ মুজিব ধন্য ধন্য করে উঠেন। জেল খেটেছেন একসাথে। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু এক রাজনৈতিক সফরে শেরপুর এসে রবি নিয়োগীর বাড়িতে গিয়েছিলেন। রবি নিয়োগী তখন জেলে থাকায় জ্যোৎস্না নিয়োগীর সাথে দেখা করেছিলেন।
সমাজতন্ত্র বাদ দিয়া করবাডা কী? ধনতন্ত্র? কাড়াকাড়ি, মারামারি?...সমাজতন্ত্র একটা বিজ্ঞান...
সমাজতন্ত্রের প্রতি অবিচল আস্থা ছিল রবি নিয়োগীর । এজন্য কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সম্পর্ক ছিল নিরবচ্ছিন্ন। প্রকাশ্যে ন্যাপের সাথে যুক্ত থাকলেও মূলতঃ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যই ছিলেন রবি নিয়োগী। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। নব্বই দশকের শুরুতে পেরোস্ত্রোইকা (পূণর্গঠন) আর গ্লাসনস্তের (উদারীকরণ বা মুক্ত হাওয়া) ঝড় চলছে সোভিয়েত ইউনিয়নে আর এর দাপটে কাঁপছে সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহ তো বটেই, সারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত। এর থেকে বাদ যায় না বাংলাদেশ-শেরপুরও। অনেকেই তাদের মনের ঝড় থামাতে না পেরে সান্ত্বনা কিংবা সমাধান খুঁজতে শরনাপন্ন হন পোড় খাওয়া কমিউনিস্ট রবি নিয়োগীর। এ সম্পর্কে একদিন তাঁর এক সহকর্মী তাঁকে প্রশ্ন করেন-‘দাদা, সোভিয়েতে এসব কী হচ্ছে? মৌলিকত্ব ঠিক রেখে সংস্কার বড় কঠিন কাজ, সাম্রাজ্যবাদীরা সক্রিয়, মূল সমাজতন্ত্রই শেষ পর্যন্ত মারা যাবে না তো?' একটুও দ্বিধা না করে রবি নিয়োগী সেই প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন-‘আরে না, না, সমাজতন্ত্রের বিকল্প নাই। সমাজতন্ত্র বাদ দিয়া করবাডা কী? ধনতন্ত্র? কাড়াকাড়ি, মারামারি? ওই ব্যবস্থায় কিচ্ছু হবো না, সমাজতন্ত্র থাকবই।...এরা পারবো না, কয়দিন বুং-বাং করবো আরকি। হ্যাঁ? কেমনে পারবো? পারবো না, সমাজতন্ত্র একটা বিজ্ঞান। এর কোনো বিকল্প নাই। মানুষ বাঁচাইতে হইলে, সভ্যতা টিকাইতে হইলে এছাড়া আর কোনো পথ নাই, এখানে আসতেই হবে। হ্যাঁ, আসতেই হবে,সমাজতন্ত্র ছাড়া কিচ্ছু হবো না।’
শোষণ থাকলে, শোষণ মুক্তির লড়াই থাকবে..
তিনি বিশ্বাস করতেন শান্তির আন্দোলন ও মানব মুক্তির আন্দোলন একই ধারায় প্রবাহিত। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, ‘শোষণ থাকলে, শোষণ মুক্তির লড়াই থাকবে।’ আজীবন থেকেছেন সেই লড়াইয়ে, দেখিয়ে গেছেন লড়াইয়ের পথ। রবি নিয়োগী হয়ে উঠেছিলেন মানব সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতিষ্ঠান।
সাংবাদিকথার সাথে জড়িত ছিলেন দীর্ঘদিন, ছিলেন শেরপুর জেলা প্রেসক্লাবের আজীবন সভাপতি। যুক্ত ছিলেন লেখালেখির সাথে।
পাননি কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বা পুরস্কার...
মানুষের কাছ থেকে পেয়েছেন অপরিসীম ভালোবাসা, সম্মান; এখনো পান। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি অদ্যাবধি প্রদান করা হয়নি তাঁকে। চাইলে এখনো মরণোত্তর স্বীকৃতি প্রদান করা যায়।
২০০২ সালের ১০ মে শেরপুরের একটি ক্লিনিকে এই বিপ্লবী নেতার মহাপ্রয়াণ ঘটে।
আলো দিয়ে আলো জ্বালানোই তো তাঁর উত্তরপুরুষের দায়িত্ব...
'রবি নিয়োগীর রেখে যাওয়া মরণজয়ী আলো নিয়ে অতিশয়োক্তি করার কোনো অবকাশ নেই, প্রয়োজনও নেই। এ আলো একান্তই স্বতঃপ্রকাশ। প্রজন্ম থেকে প্রজান্মান্তরে এ আলোর শিখাটিকে বহন করে নিয়ে যাওয়া আর আলো দিয়ে আলো জ্বালানোই তো তাঁর উত্তরপুরুষের দায়িত্ব।আমরা কতোটা পালন করছি সেই দায়িত্ব?
শেরপুরের পরিচয় ও গর্ব
ময়মনসিংহ বিভাগের উত্তরে সীমান্তবর্তী প্রান্তিক জেলা শেরপুর। কিন্তু ব্রিটিশদের কাছে উন্নয়নের নানা মাত্রায় শেরপুর আর ময়মনসিংহ একদিন সমকাতারে ছিল। কৃষিনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত্র ও নিরুপদ্রব শস্যসংগ্রহে শেরপুর ছিল ঈর্ষণীয় এক জনপদ। তাই ১৮৬৯ সালে ময়মনসিংহ ও শেরপুর দুটো শহরকেই মিউনিসিপ্যালটি ঘোষণা করে ইংরেজরা। শেরপুরের সংস্কৃতিবান্ধব জমিদার হরচন্দ্র রায়চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮৬৫ সালে গঠিত হয় ‘বিদ্যোন্নতি সভা’ নামের একটি সংগঠন। যে সংগঠন শুধু সাহিত্যই নয়, পাঠাগার বিস্তৃতি, সংস্কৃতিচর্চা ইত্যাদিতেও ভূমিকা রাখে। ‘বিদ্যোন্নতি সাধিনী’ (১৮৬৫) নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করার ব্যবস্থা হয় এবং এর সম্পাদক ছিলেন বিশিষ্ট পণ্ডিত মহামহোপাধ্যায় চন্দ্রকান্ত তর্কালঙ্কার। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে এটিই প্রথম পত্রিকা। এই পত্রিকা ছেপে আনা হতো মূলত কলকাতা থেকে।
হরচন্দ্র রায়চৌধুরী ১৮৮০ সালে নিজের তত্ত্বাবধানে শেরপুরে ‘চারুযন্ত্র’ (প্রেস) নামে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখান থেকেই একই বছর তার নিজের সম্পাদনায় ‘সাপ্তাহিক চারুবার্তা’ নামে পত্রিকা প্রকাশ পায়। তখন রংপুর, ঢাকা, যশোর, কুষ্টিয়া ছাড়া পূর্ববঙ্গে কোনো ছাপাখানা ছিল না। যশোরের ‘অমৃত প্রবাহিণী যন্ত্র’টি (প্রেস) আবার ছিল কাঠের তৈরি। বিলেত থেকে আনা অপেক্ষাকৃত আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় শেরপুরে। ভাই গিরিশচন্দ্র সেন তখন কর্মসূত্রে ময়মনসিংহে। ১৮৮১ সালে কোরআন শরিফ বাংলায় প্রথম অনুবাদ করে সেটি প্রকাশের জন্য তিনি শেরপুর আসেন এবং চারুযন্ত্র (প্রেস) থেকে তা প্রথম ছাপা হয়। টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার এস্টেটে কর্মরত মীর মশাররফ হোসেন ‘বিষাদ-সিন্ধু’ নিয়ে আসেন শেরপুরে। ১৮৮৫ সালে ‘চারুযন্ত্র’ থেকে প্রকাশ পায় ‘বিষাদ-সিন্ধু’র প্রথম খণ্ড ‘মহরম পর্ব’।
উনিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে ময়মনসিংহের প্রথম বিদ্যালয় স্থাপনের (১৮৫৩) সঙ্গে শেরপুরের জমিদার হরচন্দ্রও একটি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যেটিকে ১৮৮৭ সালে ‘ভিক্টোরিয়া একাডেমি’ নামকরণ করে সাধারণ হাইস্কুলে উন্নীত করা হয়। উনিশ শতকের মধ্যভাগে শেরপুরে প্রতিষ্ঠিত ‘হেমাঙ্গ লাইব্রেরি’ বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকায় ছিল উল্লেখযোগ্য। পাঁচশ বছরের পুরোনো পুথি থেকে সাম্প্রতিক গ্রন্থ সবই ছিল সেখানে। ১৮৮৩ সালে ময়মনসিংহে টেলিগ্রাফ স্থাপিত হয়, শেরপুরে তা সম্প্রসারিত হয় মাত্র দু বছরের মধ্যে, ১৮৮৫ সালে। ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন বলতে সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহেকে ধরা হয়। ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধের পর মিরজাফর ক্ষমতাগ্রহণ করে খাজনা তোলার ভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে অর্পণ করলে প্রথমে ১৭৬০ সালের সন্ন্যাসীরা বিদ্রোহ করেন এবং ১৭৭১ সালে বিদ্রোহ করেন ফকিররা। এই বিদ্রোহ দুটো হয়েছিল শেরপুর অঞ্চলেও।
তাছাড়া পাকিস্তান শাসনামল আরম্ভ হলে ১৯৪৯ সালের নানকার বিদ্রোহে শরিক হয় শেরপুরের মানুষ এবং ১৯৫০ সালের টঙ্ক প্রথাবিরোধী আন্দোলনে শেরপুরের গণমানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ আজ ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। কিন্তু পাকিস্তান আমল থেকেই শেরপুর প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। উপরন্তু ব্রহ্মপুত্র নদের উত্তর দিকে সীমান্তবর্তী অবস্থানের কারণে যোগাযোগের ব্যবস্থা আধুনিকীকরণের দিকে প্রশাসন উদ্যোগ গ্রহণ করে না। তাই যে শেরপুর একদিন অর্থনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি, জীবনাচার, প্রশাসন, আন্দোলন-বিদ্রোহে ময়মনসিংহের সঙ্গে সমান তালের জনপদ ছিল এবং ক্ষেত্র বিশেষে অগ্রসর ছিল– মাত্র একশ বছরের কম সময়ের মধ্যে ময়মনসিংহ থেকে শেরপুরের সার্বিক পার্থক্য আকাশ-পাতাল হয়েছে এবং শেরপুর যেন গভীরতর অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে বসেছে।
শেরপুরে কেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন
কোনো প্রতিযোগিতার তুলনা নয়, বুঝবার সুবিধার জন্য আমরা শুধু শিক্ষাক্ষেত্রের দৃষ্টান্তই দিতে চাই: যে ময়মনসিংহ আর শেরপুর ছিল একদিন সমানতালে অগ্রবর্তী, সেই ময়মনসিংহে আজ একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ, একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, একটি প্রকৌশল কলেজ, দুটি শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়, একটি ক্যাডেট কলেজ, একটি শিক্ষাবোর্ড। পক্ষান্তরে শেরপুরে এর একটিও নেই। শেরপুরের ছাত্রছাত্রীদের একটু উন্নত শিক্ষা নিতে হলেও যেতে হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অথবা মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ হলে সেটিও জামালপুরে বা নেত্রকোণায়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছেন (২৫ জুলাই, ২০১৫), প্রতিটি উপজেলায় সরকারি স্কুল এবং প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে। এই ধারাবাহিকতায় ময়মনসিংহের পাশাপাশি জামালপুরে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নেত্রকোণায় শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে এবং কিশোরগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য সংসদে বিল পাস হয়েছে। অথচ, জামালপুর, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ কোনো জেলার চেয়েই পশ্চাৎপদ নয় বা ছিল না শেরপুর জেলা।
বর্তমান প্রশাসনের সুদৃষ্টি পেলে শেরপুর আবার পাকিস্তানপূর্ব অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের কারণে শেরপুর আজ পাঁচ জেলার প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের মিলনস্থল। যেমন, শেরপুরের পূর্বদিকের ময়মনসিংহ জেলার সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট উপজেলা, পশ্চিমদিকের জামালপুর জেলার বকসিগঞ্জ উপজেলা এবং তার পাশের গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার অনেক মানুষ আজ শেরপুরের যে-কোনো সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে। উল্লিখিত অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতিসাধনের কারণে শেরপুরে যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় তাহলে সেখানে ছাত্রছাত্রীর অভাবতো হবেই না বরং পাকিস্তান আমল থেকে প্রশাসনের বৈষম্যের কারণে পিছিয়ে পড়া এই অঞ্চলের মানুষের সার্বিক উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশল্যকরণীর কাজ করবে। আমরা বিশ্বাস করি, এখানে উচ্চশিক্ষার একটি আলোক শিখা জ্বালালেই তার প্রভাব পড়বে শেরপুরের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি, সমাজের নানাস্তরে। বর্তমান সরকার প্রান্ত থেকে উন্নয়ন কেন্দ্রমুখী নিয়ে যাওয়ার যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, শেরপুরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সে উদ্যোগের উপাদান হিসেবে কাজ করবে।
অতএব, প্রতিজেলায় বিশ্ববিদ্যালয়- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ঘোষণা অনুসারেই বিভিন্ন আন্দোলন-বিদ্রোহের পীঠস্থান, ঐতিহাসিক ও সমৃদ্ধ শেরপুর জেলাতে অনতিবিলম্বে ‘’কমরেড রবি নিয়োগী বিশ্ববিদ্যালয়‘’ স্থাপন করা প্রয়োজন। আশাকরি, সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
অবনী অনিমেষ
সাবেক সভাপতি
জাতীয় ছাত্র ঐক্য
সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ
সভাপতি
গণতন্ত্রী পার্টি শেরপুর জেলা কমিটি
গণতন্ত্রী পার্টি
সদস্য
কেন্দ্রীয় কমিটি
আহ্বায়ক
কমরেড রবি নিয়োগী বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন গণ কমিটি