01/01/2018
#সফলতার_গল্প👌
ক্লাস এইটের কোন এক সময় আমাদের বাড়িতে আব্বুর এক ফ্রেন্ড তার তিন মেয়েসহ বেড়াতে আসে।দুপুরের খাবার শেষে আব্বু বড় মেয়েটার সামনে আমাকে ডাক দিয়ে বসতে বলে।আমি ছোটটার পিছনে ঘুরঘুর করতে থাকলেও আব্বু কেন বড়টার সামনে বসালো সেটার মাজেজা বুঝতে পারলাম না।শুরুতেই বলে দিল তোমার এই আপু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে পড়ছে।ব্যস!স্টোরি ক্লিয়ার।
সেদিনের একটা কনভারসেশনের পর দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি নেশাটা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠে।
ছোটবেলা থেকেই ঢাবির গল্প আব্বুর কাছে বেশি শুনতাম।আম্মুর কাছে বুয়েট মেডিকেলই প্রাধান্য পেত। পড়াশুনা কোন আমলেই খারাপ ছিল না।তাই পিএসসি,জেএসসি ভালোভাবেই উতরে যাই।ক্লাস নাইন-টেনে রেজাল্ট ভাল করার পেছনে একটা তাড়না ছিল ঢাবির।কারণ জিপিএ মার্কটা খুবই দরকার।আর দশজনের এটাও ভালোভাবেই পার করে ফেলি।
কলেজ লাইফটাই ভার্সিটি লাইফের বীজ বোনার সময়।বাড়ির পাশের কলেজটাতে শুরুতে ব্যাপারটা ভুলে গিয়েছিলাম মনে হয়।তবুও বই পত্রে একটু বেশিই সময় দিয়ে শুরুর শূণ্যতা খুব ভালোভাবেই পূরণ করেছিলাম।কলেজের শুরুতে বাইরের অনেকেই জিজ্ঞাসা করত,বাবা কোন কলেজে পড়ো?
-সুন্দরগঞ্জ ডি.ডব্লিউ. ডিগ্রি কলেজ
-সমস্যা নাই বাবা।এই কলেজ থেকেও ভাল রেজাল্ট করা যায়।
আসলে এটা ছিল তাদের সূক্ষ্ম বিদ্রূপ। কানে আসলেও কানে নেই নি।কারণ এদের এখন কিছুই বলার নেই।ভাল রেজাল্টের পর একটা ভাল ভার্সিটি অর্থাৎ স্বপ্নের ঢাবিই পারে এদের কনভার্ট করতে।
এক দিকে স্বপ্ন পূরণের অদম্য ইচ্ছা অন্যদিকে সামাজিক অবস্থা দুটো ব্যাপারই এইচএসসি পরীক্ষার উপর চেপে বসেছিল।সেকেন্ড ইয়ারে অনেক চাপাচাপি করে আব্বুর কাছে বাইক কিনে নেই।এলাকায় অনেকটা হইহই রব ওঠে ছেলেটা এবার বোধহয় বখে গেল। আব্বু চাপ নিতে দেয় নি।ফলাফল এইচএসসিতেও জিপিও পয়েন্ট অতিব সম্মানজনক।
এইচএসসির পর মনে হয় এখন পর্যন্ত লাইফের সবচেয়ে ক্রিটিকাল সিচুয়েশনে পড়েছিলাম।আম্মু বলে মেডিকেলের জন্য প্রিপারেশন নাও,মামা বলে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর দিকে তাকাও,ফুপি বলে মেডিকেলে চান্স পেলে লাইফে আর কোন পেইন থাকবে না।কেউই আমার স্বপ্ন,আমার ইচ্ছার কথা জানতে চায় নি।কিন্তু আমি ছোটবেলা থেকেই কাউকে আমার উপর ডমিনেট করতে দেই নি। 'ডি' ইউনিট নিয়ে কনফিডেন্স ছিল।ছিল মানে ভালো লেভেলেই ছিল।সো আমার ডিসিশনই ফাইনাল। আব্বুও কেন জানি আমার ইচ্ছাটাকেই সাপোর্ট করে। যেভাবেই হোক ঢাবিতে পা রাখব এরকম কষা লেভেলের ডিটারমাইন্ড হয়েই ঢাকায় কোচিং করতে আসি।কোচিং-এ পারফরমেন্স মোটামুটি ভালোই ছিল।তবে এই পারফরমেন্সের পিছনে ছিল বহু ঘুমহীন রাত।
সেপ্টেম্বরে ঈদের ছুটিতে তিনদিনের জন্য বাসায় এসেছিলাম।দাওয়াত
ে গিয়েছিলাম এক আত্মীয়ের বাসায়।একজন বলল, বাবা জেনারেল লাইনে পড়ে কি পড়বা?শুধু ভার্সিটি প্রিপারেশন নিচ্ছো কিন্তু চান্স পাবা তো??
-কিচ্ছু বলিনি।আসলে বলার কিছুই ছিল না।তবে করার ছিল।সেটার পিছনেই ছিলাম।
আরেকদিন একজন বলছে,বাবা এত ভাল একাডেমিক রেজাল্ট নিয়েও 'ডি' ইউনিটের প্রিপারেশন নিচ্ছো যে?
এবারও যে কিচ্ছু বলি নি তা না। জাস্ট বলেছিলাম, হুমম।
ঈদের ওই ছুটিটা শিখিয়ে দিয়েছিলো, চান্স না পেলে এসব একাডেমিক রেজাল্ট মূল্যহীন।
পরীক্ষার আগ পর্যন্ত আর কোন কিছুই ভাবিনি। জাস্ট লক্ষ্য পূরণের প্রচেষ্টা। এর মাঝে অন্যদের মেডিকেল পরীক্ষার রেজাল্ট হয়ে যাওয়ায় নিজের উপর চাপটা বুঝতে পাচ্ছিলাম।নিজের নিঃশ্বাসের শব্দটাও কানে লাগছিলো। তবে কখনোই আত্মবিশ্বাস হারাইনি।
জাহাঙ্গীরনগর দিয়ে পরীক্ষার সিজন শুরু হয়ে গেল।ফলাফলে সম্মানজনক অবস্থান।কিন্তু স্বপ্নটা তো ঢাবি।
অক্টোবরের ২০তারিখ। বেশ বৃষ্টি হচ্ছিল।আব্বু সহ পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির পানি লাগাচ্ছিলাম।সবা
রই ফেস বোঝার চেষ্টা করছিলাম।কেউ ভয়ে তো আবার কেউ নিয়ম রক্ষার খাতিরে আবার কেউ স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশ্যে।
যাহোক ১ঘণ্টার পরীক্ষা খুব ভালোভাবেই দিলাম।কিন্তু পরীক্ষার পর মনে হয়েছে,আমার মত বোকা এই দুনিয়ায় আর দ্বিতীয় কেউ নেই।দুটো সিলি মিসটেক।তবুও পরীক্ষা ভাল হয়েছিল তাই অতটা টেনশনেও ছিলাম না।কারণ টেনশন করার কারণ পাইনি।
২২তারিখে রেজাল্ট পাবলিশড হবে।সময় কাটবে না জেনে ২১তারিখ রাত থেকে ২২তারিখ দুপুর পর্যন্ত চারটা মুভি দেখে ফেললাম।
রেজাল্ট আমার legendary primo rm2 তেই দেখে ফেললাম।হাত কাঁপছে।আব্বুকেও ফোন দিয়ে জানালাম।আব্বুর এক্সপ্রেশন দেখতে পারি নি।আমার রেজাল্ট শুনেই কেটে দিয়েছে শুভাকাঙ্ক্ষীদের জানানোর জন্য।
আমার পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস আমার স্বপ্নকে নষ্ট হতে দেয় নি।
এখন আর কেউ বিদ্রুপ করার সাহস পায় না ভাই।আর কেউ বলে না চান্স পাবা তো?
জ্বি ভাই,পরিশ্রম করতে থাকো সফলতা আসবেই।
এখন অনেকেই জানতে চায়,ভাই ডেইলি কতক্ষণ পড়াশুনা করেছেন?
ভাই আমি বইপোকা না।বইয়ের বাইরেও জগত আছে।চান্স পেয়েছি কারণ আমার আত্মবিশ্বাস ছিল এবং একটা স্বপ্ন ছিল।বাকিটা পরিশ্রম।
"when you want something, all the universe conspires in helping you to achieve it"- Paulo Coelho, The Alchemist
ভাই জাস্ট এইটা ফলো করো তাহলে আর কখনোই পিছনে ফিরে তাকাতে হবে না।
-Nur Nawaz Ahmed Mahin
Department of English Language and Literature
University of Dhaka.