22/05/2026
ফাকিবাজ শিক্ষক এবং আমার (.বিদ্যুৎ কুমার রায়) গবেষণা
আমি একটা ছোট গবেষণা করতে চাই। গবেষণার বিষয়বস্তু হলো—কারা ফাকিবাজ শিক্ষক এবং কারা দায়িত্বহীন শিক্ষক? আপনারা আপনাদের মতামত দিয়ে আমাকে সমৃদ্ধ করবেন। কারণ শিক্ষা শুধু একটি চাকরি নয়, এটি একটি জাতি গঠনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। একজন ভালো শিক্ষক একটি জাতিকে উন্নতির চূড়ায় নিয়ে যেতে পারে, আবার একজন দায়িত্বহীন ফাকিবাজ শিক্ষক একটি প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই এই বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া দরকার।
আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন কেন এই গবেষণা? একদিন এক শিক্ষককে দেখি আরেকজন শিক্ষককে বলতেছে, “আপনি তো ফাকিবাজ শিক্ষক।” যার প্রসঙ্গে বলা হলো সেই শিক্ষক তো রেগে আগুন। আমি মনে করলাম, সেই শিক্ষক কি আসলেই ফাকিবাজ এবং দায়িত্বহীন শিক্ষক? কিভাবে এটা বের করা যায়? যে শিক্ষক সম্পর্কে বলা হয়েছে, সে তো নিয়মিত ক্লাসে যায়। বাহ্যিকভাবে দেখলে মনে হবে তিনি একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক। কিন্তু পরে তার সম্পর্কে অনেক অনেক গবেষণা করে দেখলাম, সেই শিক্ষক একদিন বলেছিল—“আমরা ১০০% পাশ চাই না।”
আমি তখন বুঝলাম আসলেই সেই শিক্ষক দায়িত্বহীন এবং ফাকিবাজ শিক্ষক। কারণ সেই শিক্ষক শুধু ক্লাসে যায়, কিছু পড়ায়, ছাত্ররা পাশ করলো নাকি ফেল করলো তা তার চিন্তা নেই। যেহেতু তিনি ১০০% পাশ চায় না, তাই ১% পাশ করলেও তার যায় আসে না, ১০% পাশ করলেও তার যায় আসে না, ১৫% বা ২০% বা ৫০% পাশ করলেও তার আসে যায় না। কারণ ছাত্র পাশ করলো নাকি ফেল করলো তা তার দায়িত্ববোধের মধ্যেই নাই।
একজন প্রকৃত শিক্ষক কখনোই বলতে পারেন না—“আমি ১০০% পাশ চাই না।” কারণ শিক্ষকতা শুধু বেতন নেওয়ার পেশা নয়; এটি একটি মানবিক দায়িত্ব, নৈতিক দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। একজন কৃষক যেমন জমিতে বীজ বপন করে ভালো ফসল চায়, একজন ডাক্তার যেমন রোগী সুস্থ হোক চায়, তেমনি একজন শিক্ষকও চাইবেন তার সকল ছাত্রছাত্রী সফল হোক। এটাই স্বাভাবিক।
আচ্ছা ভাবুন তো, মনে করুন ১০০ জন অভিভাবক তাদের সন্তানকে আপনার কলেজে ভর্তি করলো। ১০০ জন অভিভাবকই তো চাইবে তার ছেলে পড়ালেখা করে মানুষের মত মানুষ হোক। কেউ হয়তো রিক্সা চালিয়ে টাকা জোগাড় করেছে, কেউ দিনমজুর, কেউ গার্মেন্টস কর্মী, কেউ ছোট ব্যবসায়ী। তারা নিজেদের সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানের পড়ালেখার খরচ চালায়। সেই অভিভাবকদের স্বপ্ন থাকে—“আমার সন্তান যেন আমার চেয়ে ভালো জীবন পায়।”
আপনি শিক্ষক। আপনার কাছে কলেজে ছেলেকে ভর্তি করালো আর আপনি চাচ্ছেন সেই ছেলে ফেল করুক। এটা কেন চাচ্ছেন? একজন শিক্ষক যদি মনে মনে ধরে নেয় যে কিছু ছাত্র ফেল করবেই, তাহলে তিনি কখনো সেই ছাত্রদের উন্নতির জন্য আন্তরিক চেষ্টা করবেন না। এটাই হলো দায়িত্বহীনতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
একজন শিক্ষক হিসেবে আপনি তো চাইবেন যে আপনার সকল ছাত্র পাশ করুক। আপনি শিক্ষক হিসেবে কেন চান যে একজন গরীব রিক্সাওয়ালার ছেলে ফেল করুক আর একজন বিসিএস ক্যাডারের ছেলে পাশ করুক? শিক্ষা তো বৈষম্য দূর করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। একজন গরীব ছাত্রের একমাত্র ভরসা হলো তার শিক্ষক। শিক্ষক যদি তাকে অবহেলা করে, তাহলে সেই ছাত্র সমাজের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
অনেক সময় দেখা যায়, কিছু শিক্ষক শুধু মেধাবী ছাত্রদের গুরুত্ব দেয়। যারা আগে থেকেই ভালো, তাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে। কিন্তু যে ছাত্র দুর্বল, পিছিয়ে আছে, ভয় পায়, লজ্জা পায়—তার দিকে নজর দেয় না। অথচ প্রকৃত শিক্ষক সেই, যিনি দুর্বল ছাত্রকে শক্তিশালী করে তোলেন। একজন ছাত্র যদি ফেল করার অবস্থায় থেকেও পরে এ প্লাস পায়, তাহলে সেটাই একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
আপনি শিক্ষক হিসেবে আপনার প্রথম চাওয়া থাকবে আপনার সকল ছাত্র এ প্লাস পাক। কোন ছাত্র ক্লাসে না আসলে তার বাসায় যান। কোন ছাত্র ফেল করলে গবেষণা করেন সেই ছাত্রকে পাশ করানোর জন্য আপনার কি কি পদক্ষেপ নিতে হবে। একজন শিক্ষক শুধু বই পড়িয়ে দায়িত্ব শেষ করতে পারেন না। তাকে ছাত্রের মানসিক অবস্থা বুঝতে হবে, পারিবারিক সমস্যা বুঝতে হবে, অর্থনৈতিক সমস্যা বুঝতে হবে। কোন ছাত্র কেন পড়ালেখা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে তা খুঁজে বের করতে হবে।
একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক কখনো বলবেন না—“ও তো খারাপ ছাত্র।” বরং তিনি বলবেন—“এই ছাত্রকে কিভাবে ভালো করা যায়?” কারণ শিক্ষক মানে শুধু লেকচার দেওয়া না, শিক্ষক মানে একজন গাইড, একজন অভিভাবক, একজন অনুপ্রেরণাদাতা।
নাকি ভাবছেন ছাত্র ফেল করলে তো আপনার বেতন বন্ধ হবে না? এটাই হলো সবচেয়ে ভয়ংকর চিন্তা। একজন শিক্ষক যদি শুধু মাস শেষে বেতনের কথা চিন্তা করেন, তাহলে তিনি কখনো প্রকৃত শিক্ষক হতে পারবেন না। একজন শিক্ষককে ভাবতে হবে—“আমার ছাত্র ফেল করলে আমার ব্যর্থতা কোথায়?” কারণ ছাত্রের ব্যর্থতার পিছনে শিক্ষক, পরিবার ও সমাজ—সবার কিছু না কিছু দায় থাকে।
বাংলাদেশের সকল ছাত্র যদি ভালো করে পড়ালেখা করে ভালো রেজাল্ট করে, বাংলাদেশ একদিন আমেরিকাকেও নেতৃত্ব দিতে পারবে। আজকে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো উন্নত হয়েছে শিক্ষার কারণে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর—তাদের মূল শক্তি হলো দক্ষ মানবসম্পদ। আর দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করেন শিক্ষকরা। তাই একজন শিক্ষক যদি আন্তরিক হন, তাহলে পুরো জাতি উপকৃত হবে।
অনেকে বলবেন ছেলেমেয়েরা ক্লাসে আসে না। আচ্ছা, কোন ছাত্র ক্লাসে এসে যদি তার প্রত্যাশিত লেকচার না পায় তাহলে তো ক্লাসে আসতে ইচ্ছা করবে না। ক্লাসে কেন আসে না তা কি ভেবে দেখেছেন? অনেক সময় ক্লাসকে আকর্ষণীয় করা হয় না, শিক্ষার্থীদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা হয় না, তাদের স্বপ্ন নিয়ে কথা বলা হয় না। ফলে ছাত্ররা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
যে ছাত্র ক্লাসে আসে না তার কি বাড়ি গিয়েছেন? তাকে কি মোটিভেশন দিয়েছেন? তাকে কি বুঝিয়েছেন যে জীবন পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম শিক্ষা? একজন শিক্ষক যদি একটি ছাত্রের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে সেই ছাত্র নতুনভাবে বাঁচার সাহস পায়।
শিক্ষক হিসেবে ১০০% পাশ আপনাকে চাইতেই হবে। তারপরে কেউ হয়তো অসুস্থতার জন্য পরীক্ষা দিতে পারলো না, সে ফেল করতে পারে। কিন্তু আপনাকে ছাত্রছাত্রীকে এমনভাবে পড়াতে হবে যাতে সব ছাত্রছাত্রী এ প্লাস পায়। লক্ষ্য বড় না হলে অর্জনও বড় হয় না। একজন শিক্ষক যদি শুরুতেই বলেন “সবাই পাশ করবে না”, তাহলে তিনি কখনো শতভাগ সফলতার জন্য কাজ করবেন না।
এখন প্রশ্ন হলো—আপনি কিভাবে চিনবেন ফাকিবাজ শিক্ষক বা দায়িত্বহীন শিক্ষক কারা?
১. যারা বলে “১০০% পাশ চাই না”
২. যারা শুধু ক্লাসে উপস্থিতি দেখিয়ে দায় শেষ করে
৩. যারা দুর্বল ছাত্রদের অবহেলা করে
৪. যারা ছাত্র ফেল করলে নিজের দায় স্বীকার করে না
৫. যারা ক্লাসকে আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করে না
৬. যারা ছাত্রদের মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করে না
৭. যারা শুধু কোচিং বা প্রাইভেট নিয়ে ব্যস্ত থাকে
৮. যারা কলেজ বা স্কুলের ফলাফল খারাপ হলেও চিন্তিত হয় না
৯. যারা মনে করে “বেতন তো ঠিকই পাচ্ছি”
১০. যারা ছাত্রদের স্বপ্ন দেখানোর পরিবর্তে হতাশ করে
আবার একজন ভালো শিক্ষককে কিভাবে চিনবেন?
১. তিনি ছাত্রদের নিয়ে স্বপ্ন দেখেন
২. দুর্বল ছাত্রদের আলাদা সময় দেন
৩. ক্লাসকে আনন্দময় করেন
৪. ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করেন
৫. ফলাফল খারাপ হলে নিজেকে প্রশ্ন করেন
৬. অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ রাখেন
৭. ছাত্রদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান
৮. নিজের দায়িত্বকে মানবসেবা মনে করেন
৯. নিয়মিত নিজেও পড়াশোনা ও গবেষণা করেন
১০. ছাত্রদের সফলতা দেখে আনন্দ পান
অনেক শিক্ষক আছেন যারা বলেন—“আমরা ১০০% পাশ চাই না।” কত বড় বর্বর কথাটা। ফাকিবাজ শিক্ষকরা তো চাইবেন না যে ১০০% পাশ হোক। কারণ ১০০% পাশের লক্ষ্য মানে কঠোর পরিশ্রম, আন্তরিকতা, পরিকল্পনা, ছাত্রদের পেছনে সময় দেওয়া, নতুন নতুন পদ্ধতিতে পড়ানো এবং প্রতিটি ছাত্রকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া। যারা এসব করতে চান না, তারাই নানা অজুহাত দাঁড় করান।
আমার এই গবেষণার উদ্দেশ্য কাউকে ছোট করা না। বরং শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও দায়িত্বশীল করা। কারণ একজন ভালো শিক্ষক হাজারো শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিতে পারেন। আবার একজন দায়িত্বহীন শিক্ষক হাজারো স্বপ্ন ধ্বংস করতে পারেন। তাই আমাদের সবার উচিত—শিক্ষকতা পেশাকে শুধু চাকরি না ভেবে জাতি গঠনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হিসেবে দেখা।
আপনারা আপনাদের মতামত দিয়ে এই গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ করবেন।
বিদ্যুৎ কুমার রায়
আইডি নং: ০১২৫২৫
অধ্যাপক (রসায়ন)
২২তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা
পল্লবী সরকারি কলেজ, ঢাকা
মোবাইল: ০১৭১৬-৫৭৪৯৪৪
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর
কলেজ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট
প্রোগ্রাম অফিসার (শিক্ষক প্রশিক্ষণ)
ইমেইল: [email protected]
ফেসবুক পেজ: Easy Learning by Biddut Sir
ফেসবুক আইডি: Biddut Kumer Ray
জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর: ৭৬২১৯০১৬২২৮২৩
রক্তের গ্রুপ: O +ve
জন্ম তারিখ: ৩১/১২/১৯৭৫
পিতার নাম: হরেন্দ্র নাথ রায়
মাতার নাম: রেখা রানী রায়
উত্তর মেন্দা, ভাঙ্গুরা, পাবনা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে বি.এসসি (অনার্স) (১৯৯৬)
প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান ও স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে এম.এসসি (১৯৯৭)
প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন।
NAEM এ ৩য় অবস্থান, ৪র্থ ওরিয়েন্টেশন প্রশিক্ষণ
NAEM এ ৮৫টি ফাউন্ডেশন ট্রেনিং কোর্স সম্পন্ন।
এনসিটিবি’র নবম ও দশম শ্রেণির এবং একাদশ দ্বাদশ শ্রেণির রসায়ন পাঠ্যবই লেখক।
বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক মিরপুর, ঢাকায় শ্রেষ্ঠ শিক্ষক পুরস্কারপ্রাপ্ত।
সাবেক সহকারী শিক্ষক, শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজ, মিরপুর, ঢাকা (২০০০–২০০৩)
সাবেক প্রভাষক (রসায়ন), ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ, পাবনা (২০০৩–২০০৯)
সাবেক সহকারী অধ্যাপক (রসায়ন), সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা (২০০৯–২০১৪)
সাবেক সহকারী অধ্যাপক (রসায়ন), বাসন্তেক সরকারি কলেজ, ঢাকা (২০১৪–২০১৮)
জাতীয়তা: বাংলাদেশি