21/03/2026
Number Station : কোল্ড ওয়ার যুগের গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থা
=================================
রাত তখন গভীর। তেহরানের কোনো এক অলিগলিতে একজন মানুষ কানে হেডফোন গুঁজে চুপচাপ বসে আছে। তার হাতে একটি নোটবুক, আঙুলে একটি কলম। সে অপেক্ষা করছে। ঠিক এই মুহূর্তে, পশ্চিম ইউরোপের কোনো এক দেশ থেকে একটি শর্টওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সি জেগে উঠছে নীরবে। এরপর একটি শান্ত, ভাবলেশহীন পুরুষকণ্ঠ ফারসিতে বলতে শুরু করে: তিন, সাত, চার, দুই, পাঁচ। একটু বিরতি। তারপর তিনবার উচ্চারিত হয় একটিমাত্র শব্দ: "তাভাজ্জোহ।" মনোযোগ দাও। আবার সংখ্যার সারি। আবার নীরবতা।
বারো ঘণ্টা পর, একই দৃশ্য। একই কণ্ঠ। একই সংখ্যা। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিন থেকেই এই ফ্রিকোয়েন্সিটি সক্রিয়। শুনলে মনে হয় কেউ হয়তো বিকারগ্রস্ত হয়ে রেডিওতে অর্থহীন সংখ্যা আওড়াচ্ছে। কিন্তু না, এটি অর্থহীন নয়। এটি আসলে যুদ্ধের সবচেয়ে নিষ্ঠুর এবং সবচেয়ে অদৃশ্য মাত্রার একটি জীবন্ত প্রমাণ। এই সংখ্যাগুলো একটি বার্তা বহন করছে, এবং সেই বার্তা শুনলে মানচিত্র বদলে যেতে পারে।
এস্পায়োনেজ পরিভাষায় এটির নাম "নাম্বার স্টেশন।"
পদ্ধতিটি পুরনো, প্রায় একশো বছরের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধোঁয়াটে রণক্ষেত্রে যখন শত্রুর মাটিতে পাঠানো গুপ্তচরদের সঙ্গে নিরাপদে যোগাযোগ রাখা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, তখন নাৎসি আবওয়ের, ব্রিটিশ এমআই-৬ এবং সোভিয়েত কেজিবি প্রত্যেকেই এই একই পথে হেঁটেছিল। শর্টওয়েভ রেডিওতে সংখ্যার মাধ্যমে পাঠানো বার্তা।
কোল্ড ওয়ারের সময় পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়। সেই যুগে ইউরোপ ও আমেরিকার রেডিও তরঙ্গ রীতিমতো এইসব রহস্যময় কণ্ঠস্বরে ভরে গিয়েছিল। বিবিসির আর্কাইভে এখনও সেই সময়ের অনেক রেকর্ডিং সংরক্ষিত আছে। একবার শুনলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, কারণ প্রতিটি সংখ্যার পেছনে হয়তো লুকিয়ে আছে কোনো মানুষের জীবন মৃত্যুর ফয়সালা।
আমেরিকার ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিতে কর্মরত কিউবান ডাবল এজেন্ট আনা মন্টেজের কথা মনে করুন। যারা আমার "স্পাই স্টোরিজ" বইয়ে তাঁর গল্প পড়েছেন, তাঁরা জানেন কাহিনীটা কতটা শীতল।
হাভানা থেকে একটি শর্টওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সি, ওয়াশিংটনের অ্যাপার্টমেন্টে বসে কান পেতে সেই কণ্ঠ শোনা, নোটবুকে সংখ্যা টুকে নেওয়া, তারপর পূর্বনির্ধারিত কোড দিয়ে বার্তার অর্থ উদ্ধার করা। বছরের পর বছর ধরে আমেরিকার সবচেয়ে সংরক্ষিত গোপন তথ্য এভাবেই পাচার হয়ে গেছে, অথচ সিআইএর সদর দপ্তরে কেউ টেরও পায়নি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, স্যাটেলাইট, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং এবং ডার্ক ওয়েবের এই যুগে এত পুরনো একটি পদ্ধতি কেন এখনও কার্যকর? উত্তরটা লুকিয়ে আছে এই পদ্ধতির সবচেয়ে অসাধারণ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে। এটি সম্পূর্ণ একমুখী। প্রেরক পাঠাচ্ছে, গ্রাহক শুনছে, কিন্তু দুজনের মধ্যে কোনো সংকেত বিনিময় নেই। কোনো ইন্টারনেট সংযোগ নেই, কোনো ডিজিটাল পদচিহ্ন নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক সাইবার নজরদারি ব্যবস্থাও একটি সাধারণ রেডিও রিসিভারকে শনাক্ত করতে পারে না।
নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি হলো "ওয়ান-টাইম প্যাড" নামের একটি কোড পদ্ধতি, যাকে গণিতবিদ ক্লড শ্যানন গাণিতিকভাবে অভেদ্য বলে প্রমাণ করেছিলেন। পদ্ধতিটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী। এজেন্টকে মাঠে নামানোর আগেই তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি কোডবুক বা ডিক্রিপশন কী। রেডিওতে সংখ্যাগুলো প্রচারিত হলে সে সেগুলো টুকে নেয়, কোড মিলিয়ে বার্তার অর্থ বের করে।
কিন্তু সেই কোড না থাকলে? পুরো বার্তাটাই নিছক একগুচ্ছ অর্থহীন সংখ্যা। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটারও সেটি ভাঙতে পারবে না, কারণ ব্রুট ফোর্স ক্রিপ্টোঅ্যানালাইসিস দিয়ে ওয়ান টাইম প্যাড উন্মোচন করা তাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব। বার্তাটি সবার সামনে প্রকারান্তরে পাবলিকলি প্রচারিত হচ্ছে, অথচ মাত্র একজন মানুষ ছাড়া গোটা দুনিয়ার কাছে সেটি সম্পূর্ণ অন্ধকার।
এখন যে বিষয়টি একটু থেমে ভাবার, সেটি হলো সময়কাল। এই ফ্রিকোয়েন্সি কখন থেকে সক্রিয় হয়েছে? ঠিক যেদিন থেকে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হয়েছে, সেদিন থেকে। এবং বার্তাগুলো পড়া হচ্ছে ফারসি ভাষায়। এই দুটো তথ্য পাশাপাশি রাখলে যে চিত্র ভেসে ওঠে, সেটি শুধু উদ্বেগজনক নয়, রীতিমতো শিহরণ জাগানো।
ইরানের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে ঘাপটি মেরে থাকা সিআইএ বা মোসাদের স্লিপার এজেন্টরা এই মুহূর্তে হয়তো জেগে উঠছে। হয়তো কোনো পারমাণবিক স্থাপনার স্থানাঙ্ক পাঠানো হচ্ছে, হয়তো কোনো সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের নির্দেশ, হয়তো কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে টার্গেট করার সংকেত। ঠিক কী পাঠানো হচ্ছে, সেটা বলা সম্ভব নয়। কিন্তু সম্ভাবনাগুলো উড়িয়ে দেওয়ার উপায়ও নেই।
ইরানও বসে থাকেনি। তারা শক্তিশালী জ্যামিং সিস্টেম দিয়ে ফ্রিকোয়েন্সিটি বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু যখনই জ্যামিং শুরু হয়েছে, প্রচারকারীরা অন্য একটি ফ্রিকোয়েন্সিতে সরে গেছে। এই বিড়াল ইঁদুর খেলা এখনও চলছে, এবং এখন পর্যন্ত প্রচারকারীরাই এগিয়ে আছে।
যুদ্ধের ময়দানে বোমার আঘাত দেখা যায়, বোমার শব্দ শোনা যায়,লাশ গণনা করা যায়। কিন্তু এই অদৃশ্য যুদ্ধের কোনো সাক্ষী নেই। ইসলামী চিন্তাদর্শে যুদ্ধকে সর্বদা একটি শেষ আশ্রয় হিসেবে দেখা হয়েছে, যেখানে নিরীহ মানুষের ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরের আগে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন আত্মরক্ষার জন্য। এটি শুধু আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন নয়, মানবিক মর্যাদার প্রতিও একটি নিষ্ঠুর আঘাত।
রেডিও তরঙ্গে ভেসে আসা এই সংখ্যাগুলো শুনতে নিরীহ। কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নির্দেশগুলো হয়তো কোনো মানুষের মৃত্যু পরোয়ানা, হয়তো কোনো শহরের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের নকশা। যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ানক মাত্রা সেটা নয় যেটা আমরা দেখতে পাই। সবচেয়ে ভয়ানক সেটা, যেটা আমরা দেখতেই পাই না।
তথ্যসূত্র: রেডিও ফ্রি ইউরোপ এবং ফাইন্যানশিয়াল টাইমস।
@ মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা