09/11/2024
এইমাত্র খবর পেলাম (খবরটি দেওয়ার জন্য স্কুলজীবনের শিক্ষক জনাব ইউসুফ মল্লিকের পুত্র আমার সহপাঠী শহীদকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা) কিছুক্ষণ আগে আমার ছোটফুপা নিঃস্বার্থ সমাজ-সেবক, মুক্তমনা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আবদুল হক মল্লিক (জামাই) মাটি ও মানুষের আপনারজন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজেউন। মহান আল্লাহ্ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন। অনেকদিন ধরেই তিনি শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন।
ঝাটিবুনিয়া স্কুল থেকে একাত্তরের এসএসসি পাশ আমার এই ফুপা ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি করতেন। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ এবং পরবর্তী জীবনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখে তিনি সবসময় নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। এলাকার মানুষের ঝগড়া-বিবাদ মেটাতে সালিশি ব্যবস্থায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা সবসময় ছিল। নিজেকে লাভবান করে কোনো কাজ করতে কেউ দেখেছে বলে বলতে পারবে না।
ঘরে তাঁর অভাব-অনটন থাকলেও বাইরে কেউ কখনো দেখেনি। সবসময় ফিটফাট হয়ে চলতেন তিনি। ধার করে হলেও তিনি এলাকার মানুষের জন্য কাজ করতেন। এমন একটা উদাহরণ দিই। তিনি যখন যুবক ছিলেন, আমার তখন শৈশবকাল। মনে আছে, উপজেলা কলেজ মাঠে সিরিজ ফুটবল খেলা আয়োজন করেন। ওই সময়ে ওই খেলার ট্রফি নিজের টাকায় কিনেছিলেন তিনি। প্রয়োজনে তখন ধার করেও এসব কাজ করে তিনি এলাকার যুব সমাজকে ইতিবাচক বিনোদনে রাখতেন। ওই সময়ে আমার মনে আছে, ওইসব বাউন্ডুলেপনার কারণে মা ও আব্বা মাঝে-মাঝে তাঁর ওপর রাগ করতেন।
তিনি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। উত্তর ছৈলাবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় তাঁর হাতেই তৈরি। এই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। কিন্তু এই পেশাটি ছিল মূলত অধিকাংশ বেসরকারি আমলে স্কুল প্রতিষ্ঠার স্বার্থে। সফলভাবে তিনি এটি করেছিলেন। নিজে আর্থিক সংকটে থেকেও এসব কাজে তিনি আনন্দ পেতেন। শুনতাম, তাঁর বাবা ইয়াছিন মল্লিক তাঁর সময়ের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আর্থিকভাবেও যথেষ্ট সচ্ছল মানুষ ছিলেন। পিতৃসূত্রে তাঁরও তাই থাকার কথা কিন্তু না অর্থের প্রতি তাঁর কোনোদিন মোহ ছিল না। বরং, মানুষের জন্য নানারকম কাজে তিনি নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন।
উপজেলার অন্যতম নামকরা স্কুল ঝাটিবুনিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়। ওইস্কুলের আমিও ছাত্র ছিলাম। এটি গ্রামে হলেও এক সময় জেলার মধ্যেও স্কুলটির খ্যাতি ছিল। এই স্কুলের সুখ-দুঃখে তাঁকে এক সময়ে ব্যস্ত থাকতে দেখেছি। স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ মুজাফ্ফর হোসেন হাওলাদার মৃত্যুর পরে বহুদিন তিনি সহ-সভাপতি স্কুলটি পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
আমার ফুপু এবং এই ফুপার যখন বিয়ে হয় তখন আমি কোলে। বাড়ি খুব কাছাকাছি। এই বিয়ের পরে আরেক ফুপু কুলসুম নাম তাঁর। বহুদিন হলো তিনি ক্যান্সারে মারা যান। আল্লাহ্ তাঁকেও বেহেস্তবাসী করুন। তাঁর কোলে করেই বেশিরভাগ সময় এই বাড়িতে আমার কাটে। শৈশবে-কৈশোরে তিনি বা তাঁরাই আমার দেখাশোনা করেন। তখনকার স্মৃতি অনেককিছুই আমার মনে থাকার কথা নয়। তবে কিছু কিছু মনে আছে। গ্রামের মধ্যে কাঠের তৈরি বাড়ি হলেও হক মল্লিক জামাইদের ঘরটি ছিল স্টাইলিশ ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে। মনে আছে ওই বাড়ির দোতলায় ও ঝুল বারান্দায় আমি অনেকরাত কাটিয়েছি।
একটা ঘটনা খুব মনে পড়ে। সেটি অবশ্যই শৈশবের। একইসঙ্গে ব্যক্তিত্ববান ও একজন আমুদে মানুষ হিসেবে হক মল্লিক জামাইয়ের জুড়ি মেলা ভার। যখন প্রযুক্তির ছোঁয়া এলাকায় পড়ে নি। টেলিভিশন দেখাও পাওয়া অসম্ভব ছিল। শুধু বাংলাদেশ বেতারই গ্রামে-গঞ্জে প্রচলিত। ওই সময়ে জামাই বাড়িতে বায়োস্কোপের ব্যবস্থা করেন। উঠানে পর্দা টানিয়ে আশেপাশের বাড়িসহ সকলের জন্য এই প্রথম তিনি ভিডিওচিত্র/টেলিভিশন দেখার ব্যবস্থা করেন। আমার মনে পড়ে, তখন স্ক্রিনে পাটগাছই হবে পাটগাছ কাটতে কাটতে একজন গান গাইছিলেন, 'যে-জন প্রেমের ভাব জানে না, যার সাথে নাই লেনাদেনা,,,খাঁটি সোনা ছাড়িয়ে যে নেয় নকল সোনা, সে-জন সোনা চেনে না।' ভিডিও পর্দায় সেটা ছিল আমার জীবনে প্রথম দেখা ও শোনা গান।
জনাব আবদুল হক মল্লিক ছিলেন জনদরদি মানুষ। তিনি ছোটবড়ো সবার সাথে হাসিমুখে, আদর করে কথা বলতেন। সবার সুখ-দুঃখের কথা শুনতেন। মীমাংসার প্রয়োজন হলে নিজের সময় খরচ করে সেটি করতেন। নিজের বলে তাঁর কোনো সময় ছিল। জীবনের শেষদিকে কিছুটা বিষয়- আশয়ে মনোযোগী হয়েছিলেন। কিন্তু সারাজীবনের অভ্যেস কখনো পাল্টায় নি।
তিনি ছিলেন মুক্তচিন্তার মানুষ। তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস ছিল। রাজনীতি নিয়ে যে-কেউ তাঁর সাথে আলাপ করতে পারত। আমার মনে আছে, জামাইয়ের সাথে রাজনীতির নানাদিক নিয়ে তাঁর সাথে আমার মতো শিশুও তাঁর সাথে তর্ক করেছি কিন্তু কখনো তিনি ধমকের সুরে কথা বলেননি। কথা শুনেছেন, পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন। সেই অর্থে তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন সহনশীল মানুষ।
এলাকার রাস্তাঘাট উন্নত হয়েছে। গ্রামে-গঞ্জের মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের হাওয়া আছে। তাঁর বাড়ির পাশ দিয়েই চলে গেছে বিকল্প হাইওয়ে সড়ক। বাড়ির দরোজায় যেখানে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়; সেখানেই অনেক দোকানপাটসহ একটি বাজারের মতো গড়ে উঠেছে। প্রতি সন্ধ্যায় সেখানে এলাকার মানুষের মিলনমেলা তৈরি হয়। চায়ের সাথে রাজনীতিসহ নানান আলাপ-আলোচনা সেখানে হয়। মানুষের মুখে-মুখে জায়গাটির নামকরণই হয়েছে "হক মল্লিক" নামে। এটা স্বতঃস্ফূর্ত। মানুষের ওপর একটা নামে স্বয়ংক্রিয় প্রভাব। কেউ কাউকে বলে দেয়নি। ওই এলাকায় আপনি যাবেন। রিকশাঅলা, অটোগাড়ি, মোটর সাইকেল, অথবা অন্য যেকোনো যানবাহনকে জিজ্ঞেস করবেন, তাঁরা জায়গার নাম বলবে 'হক মল্লিক' বলে। যাত্রীরাও বলবে, 'এই হক মল্লিক যাবেন'। ইত্যাদি। এটি আমাকে ভাবায়। একটা মানুষের এই গুণটি অতি মানবিক গুণ। না-হয় মানুষ এমন করে নির্দ্বিধায় একটা মানুষকে কেন গ্রহণ করবে! তাঁর নামকে স্থায়িত্ব দেবে! তিনি তো কাউকে বলে দেননি যে এইটা তোমার বলতে হবে। এটাই জনমনের ওপর ব্যক্তিমানুষের ইতিবাচক প্রভাব।
তাঁর দোষ থাকলেও সেটিকে কেন যেন ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হত। মাকে তিনি অনেক শ্রদ্ধা করতেন। আমার আব্বা এবং মা দেখেছি, হক মল্লিককে সবসময় ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতেন। তাঁর ব্যক্তিত্বই এমন ছিল যে, তাঁর ওপর কেউ রাগ করে থাকতে পারত না। অনেক স্মৃতি। একটি মানুষের অন্যকে আকৃষ্ট করার এমন সম্মোহনী ক্ষমতা। পৃথিবীতে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। আল্লাহ্ জামাইকে বেহেস্তনসিব করুন। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি। ওপারে ভালো থাকুন প্রিয় জামাই।